• ২০২২ অক্টোবর ০৩, সোমবার, ১৪২৯ আশ্বিন ১৮
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৭:১০ পূর্বাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

অন্তিম শয়ানে রানী

  • প্রকাশিত ০৯:১০ পূর্বাহ্ন সোমবার, অক্টোবর ০৩, ২০২২
অন্তিম শয়ানে রানী
ছবি সংগ্রহীত
এ,কে,সুমন- নিজস্ব প্রতিবেদক

শ্রদ্ধা এবং ভালবাসায় চির বিদায় নিয়ে অন্তিম শয়ানে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ। পারিবারিক আনুষ্ঠানিকতা শেষে উইন্ডসর ক্যাসেলে সমাহিত করা হয় রানীকে।

ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে রানির শেষকৃত্যে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানসহ প্রায় দুই হাজার অতিথি। ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে রাজকীয় শোক।

স্কটল্যান্ড থেকে যে অন্তিম যাত্রার শুরু হয়েছিল, মাইলের পর মাইল পাড়ি দিয়ে তা শেষ হল। উইন্ডসর প্রাসাদে ষষ্ঠ জর্জ মেমোরিয়াল চ্যাপেলে স্বামি প্রিন্স ফিলিপের পাশে চিরশয়ানে গেলেন রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ। এর মধ্য দিয়ে ৭০ বছরের এক অধ্যায়ের বর্ণাঢ্য যবনিকাপাত হল।

গত ৭০ বছরে বিশ্ব অনেক পাল্টেছে, ক্ষমতার পালাবদলও হয়েছে অনেক, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অস্তিত্বের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে উঠেছিল প্রশ্ন। রাজপরিবারের অন্দরমহলের সঙ্কটও আঘাত হেনেছে বারবার।

তবে সব ঝড়ঝাপটা এক হাতে সামলে বিশ্বজুড়ে স্বসম্মানে নিজেকে এবং ব্রিটিশ রাজপরিবারের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছিলেন দ্বিতীয় এলিজাবেথ।

গত ৮ সেপ্টেম্বর ৯৬ বছর বয়সে মারা যান রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ। তখন তিনি ছিলেন স্কটল্যান্ডের বালমোরাল প্রাসাদে।

নানা আনুষ্ঠানিকতার পর কয়েকদিন আগে রানীর মরদেহ আনা হয় লন্ডনে, রাখা হয় ওয়েস্টমিনস্টার হলে। সেখানে চার দিন ধরে চলে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর্ব।

সোমবার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় চিরবিদায়ের ঘোষণা আগেই দেওয়া হয়েছিল, সেই অনুযায়ী সারাবিশ্ব থেকে রাষ্ট্রনেতারা এতে যোগ দিয়েছিলেন রাজকীয় সেই শোকের অনুষ্ঠানে। টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে দিয়েছে এই অনুষ্ঠানের বিশদ বর্ণনা।

রানী বলতেন, লন্ডন তার কার্যালয় আর উইন্ডসর তার বাসা। সেখানেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী শাসক রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ। শেষ হল ৭০ বছরের শাসনামল।

উইন্ডসরে ৮শ অতিথির অংশগ্রহণে স্বামি প্রয়াত ডিউক অব এডিনবরার পাশে রাজকীয় ভল্টে সমাহিত করা হয় ৭ দশক ধরে যুক্তরাজ্যকে শাসন করা রানী এলিজাবেথকে। তার সমাধির ওপর লেখা রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ১৯২৬-২০২২

সোমবার স্থানীয় সময় ১০টা ৪৪ মিনিটে ওয়েস্টমিনস্টার হল থেকে রানীর কফিন ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে নেওয়ার মধ্য দিয়ে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবের আনুষ্ঠানিকতা শেষে রানির মরদেহ বহনকারী কফিন নিয়ে শুরু হয় রাজকীয় শোকযাত্রা। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা প্রদক্ষিণ করে রানির কফিন পৌঁছায় উইন্ডসর ক্যাসেলের সেইন্ট জর্জেস চ্যাপেলে।

রানীর শবমিছিলে সামিল হন বড় ছেলে রাজা তৃতীয় চার্লস, তার বোন প্রিন্সেস অ্যান, দুই ভাই প্রিন্স অ্যান্ড্রু ও প্রিন্স এডওয়ার্ড, যুবরাজ প্রিন্স অব ওয়েলস উইলিয়াম, প্রিন্স হ্যারিসহ ব্রিটিশ রাজ পরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্যরা। পথের দুই পাশে রানীকে শেষবার শ্রদ্ধা জানায় লাখ লাখ মানুষ।

বিভিন্ন গানে তার সারাজীবনের নানা কীর্তিকে স্মরণ করা হয়। ১৯৫৩ সালের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের অভিষেক অনুষ্ঠানের যে গানটি গাওয়া হয়েছিল তার শেষযাত্রাও সেই গানটি গাওয়া হয়। জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার মধ্য দিয়ে ওয়েস্টমিনস্টার গির্জার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়।

ওয়েস্টমিনস্টার গির্জায় প্রার্থনা শেষে রানির শবমিছিল ৪৫ মিনিট যাত্রা করে ওয়েলিংটন আর্চে পৌঁছায়। সেই পথে মিছিলটি প্রথমে পার্লামেন্ট স্কয়ার অতিক্রম করে। সে সময় যুক্তরাজ্যের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে গঠিত একটি যৌথ দল রানীর কফিনে সম্মান (গার্ড অব অনার) জানান।

ওয়েলিংটন আর্চে পৌঁছানোর পথে শবমিছিল একে একে পার্লামেন্ট স্ট্রিট হয়ে ‘বিগ বেন’, লন্ডনের রাজকীয় দুইটি পার্ক গ্রিন পার্ক (রাজা দ্বিতীয় চার্লস ১৬৬৮ সালে এই পার্কটি উদ্বোধন করেন) ও সেন্ট জেমস পার্ক (সবথেকে পুরাতন রাজকীয় পার্ক) এবং বাকিংহাম প্যালেস অতিক্রম করে।

এরপর রানীকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে দেশজুড়ে পালন করা হয় দুই মিনিট নীরবতা। ওয়েলিংটন আর্চে রানির কফিন শকট থেকে নামিয়ে রাজকীয় শববাহী একটি গাড়িতে তোলা হয় এবং সেটি উইন্ডসর প্রাসাদের দিকে রওনা হয়। রাজা চার্লসসহ রাজপরিবারের সদস্যরা গাড়িতে রানীর কফিনকে অনুসরণ করেন। এই পথেরও দুই পাশে হাজার হাজার মানুষ দাঁড়িয়ে ছিলেন।

রানীকে শেষ বিদায় জানাতে তার প্রিয় দুই কুকুর মিউক ও স্যান্ডিকে উইন্ডসর প্রাসাদের সেন্ট জর্জ চ্যাপেলে আনা হয়। উইন্ডসর প্রাসাদে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতার এই অংশের নেতৃত্ব দেন উইন্ডসর ডিন।

ডিনের প্রার্থনা করা হলে রানীর কফিন থেকে রাজমুকুট, রাজদণ্ড ও রাজকীয় গোলক সরিয়ে নেওয়া হয়। সেগুলো পরে টাওয়ার অব লন্ডনে পাঠানো হবে। আপাতত সেগুলো উইন্ডসর ডিনের জিম্মায় রাখা হয়েছে।

রাজা তৃতীয় চার্লস ‘দ্য কুইন্স কোম্পানি ক্যাম্প কালার’ নামে একটি ছোট পতাকা গ্রহণ করেন এবং সেটি তার মায়ের কফিনের ওপর রাখেন।

তারপর লর্ড চেম্বারলিন ব্যারন পার্কার তার দাপ্তরিক লাঠি ‘ওয়ান্ড অব অফিস’ ভেঙে এলিজাবেথের কফিনের ওপর রাখেন। লর্ড চেম্বারলিন রাজকীয় কর্মীদের মধ্যে সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। নিজের ‘ওয়ান্ড অব অফিস’ ভেঙে ফেলার মাধ্যমে তিনি ওই রাজা বা রানীর প্রতি তার সেবার সমাপ্তি ঘোষণা করেন। তারপর রানীর কফিন রাজকীয় ভল্টে নামানো হয়।

সেন্ট জর্জ চ্যাপেল সমাধিতে রানীর কফিন নামানোর সময় শেষবারের মতো রানির সম্মানে ব্যাগপাইপার বাজান পাইপার। নতুন জাতীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে শেষ হয় আনুষ্ঠানিকতা।

এরপর রাজা তৃতীয় চার্লসসহ রাজপরিবারের সদস্যরা সেন্ট জর্জ চ্যাপেল থেকে উইন্ডসর প্রাসাদে যান। তবে স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে রাজাসহ রাজপরিবারের সদস্যরা সেন্ট জর্জ চ্যাপেলে ফিরে আসেন। রানীকে সমাহিত করতে তাদের ভেতরে ঢুকতে দেখা যায়।

রয়টার্স জানিয়েছে, জর্জ চ্যাপেলে স্বামি প্রিন্স ফিলিপের পাশে চিরশয়ানে থাকবেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ।

রানির অন্তিম যাত্রার শেষ মূহুর্তে ওয়েস্টমিনস্টারসহ লন্ডনজুড়ে ছিল লোকে লোকারণ্য। রানির বিদায়ে সমগ্র ব্রিটেনজুড়েই চলছে শোকের মাতম।

মানবসভ্যতার ইতিহাসে কারো মৃত্যুতে এতটা শোকের অনুভুতি খুব কমই দেখেছে এই বিশ্ব। ৭০ বছরের রাজত্ব কালে রানি বিশ্বের সকল মানুষের কল্যাণে ছিলেন সদা জাগ্রত। তাই রানীকে চিরবিদায় জানাতে ব্রিটেনসহ সমগ্র বিশ্বের নেতৃবৃন্দসহ সাধারণ মানুষরা জড় হন।

সমগ্র দেশ স্তব্ধ হয়ে গেছে মহারানীর মহাপ্রয়ানে। দেশব্যাপী নেমে এসেছে শোকের ছায়া। মানুষের ভালবাসায় সিক্ত রানি মৃত্যুর দুই দিন আগেও নতুন প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাসের হাতে তুলে দিয়েছিলেন দেশের কার্যভার । কমনওয়েলথসহ বিশ্বের সকল দেশেই রানির মৃত্যুতে সবাই শোকাবিভূত।

দেশের সেবায় নিজের জীবনের ৭০ বছর দিয়েছেন রানী। কীভাবে বেঁচে থাকতে এবং কীভাবে দেশ শাসন করতে হয় তার একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন রানী।

রানীকে বিদায় জানাতে হাজারো মানুষ জড় হয় ওয়েস্ট মিনিস্টারসহ লন্ডনের রাস্তায় রাস্তায়। রানিকে বহনকারী গাড়ি এবং কফিনটি এক নজর দেখেই আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন অনেকে। আলোচনা সমালোচনার সকল বেড়াজাল পেরিয়ে ব্রিটেনের রানি বহুকাল বেঁচে থাকবেন মানুষের অন্তরে, মানুষের ভালোবাসায়।

সর্বশেষ