শিরোনাম:-
রৌমারীতে প্রশাসনের অনুমোদিত যাত্রাপালা মঞ্চায়নে বাধা:
সাংস্কৃতিক অস্বস্তি থেকে রাজনৈতিক ঝুঁকির শঙ্কা।
বিশেষ প্রতিনিধি কুড়িগ্রাম।
কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলায় প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে আয়োজিত দুই দিনের দুইটি যাত্রাপালাকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত বিতর্ক এখন আর কেবল একটি স্থানীয় সাংস্কৃতিক ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নেই..!
বরং এটি জাতীয় রাজনীতিতে একটি আদর্শভিত্তিক দলের জন্য দূরপ্রসারী রাজনৈতিক ক্ষতির ইঙ্গিত হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।
স্থানীয় প্রশাসনের অনুমোদন সাপেক্ষে যাত্রাপালার মঞ্চ নির্মাণ, শিল্পী নির্বাচন, আলোকসজ্জা, নিরাপত্তা ও প্রচারণায় আয়োজকরা প্রায় ২০০০০০' পরিমাণ অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেন। এলাকায় কয়েক হাজার দর্শকের সমাগমের প্রস্তুতি চলাকালে রৌমারী উপজেলার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নেতাকর্মী থানায় লিখিত দরখাস্ত দিয়ে অনুষ্ঠানটি বন্ধের দাবি জানান।
এ ঘটনায় যাত্রাশিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, প্রশাসনের অনুমোদিত একটি লোকজ সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধের প্রচেষ্টা একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মনে ভীতি, ক্ষোভ ও বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি তৈরি করতে পারে, যা কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য দীর্ঘমেয়াদে শুভ লক্ষণ নয়।
কুরআনের আলোকে সংস্কৃতি ও ভারসাম্য
ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, কুরআন শরীফ কখনোই মানুষের স্বাভাবিক আনন্দ, সংস্কৃতি ও সামাজিক বন্ধনকে অস্বীকার করেনি। বরং ভারসাম্য, শালীনতা ও কল্যাণের ওপর জোর দিয়েছে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন—
“হে আদম সন্তানেরা! তোমরা প্রতিটি ইবাদতের সময় তোমাদের সৌন্দর্য গ্রহণ করো; খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না।”
(সূরা আল-আ‘রাফ: ৩১)
এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়, ইসলাম সৌন্দর্য, শালীনতা ও সামাজিক জীবনের স্বাভাবিক প্রকাশকে নাকচ করে না; বরং সীমা ও নৈতিকতার মধ্যে রেখে তা গ্রহণ করে।
আরেক স্থানে বলা হয়েছে—
“আল্লাহ যে সম্পদ তোমাকে দিয়েছেন, তা দ্বারা আখিরাতের ঘর অন্বেষণ করো, আর দুনিয়াতে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না।”
(সূরা আল-কাসাস: ৭৭)
ইসলামী গবেষকদের মতে, যাত্রাপালার মতো লোকজ শিল্প যদি অশালীনতা ও অনৈতিকতা মুক্ত থাকে, তবে তা দুনিয়ার ‘অংশ’ হিসেবেই গণ্য হয়—যেখানে শিক্ষা, ইতিহাস ও নৈতিক বার্তা উপস্থাপিত হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সতর্কতা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গ্রামীণ বাংলাদেশের যাত্রাশিল্পের সঙ্গে কয়েক লাখ শিল্পী, কলাকুশলী ও তাদের পরিবার সরাসরি যুক্ত। পাশাপাশি, গ্রামীণ জনপদের একটি বড় অংশ এই শিল্পকে বিনোদন ও সামাজিক মিলনের মাধ্যম হিসেবে দেখে।
একজন বিশ্লেষকের ভাষায়,
“যদি কোনো রাজনৈতিক দল সাংস্কৃতিক পরিসরে অসহিষ্ণুতার বার্তা দেয়—তা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে—তাহলে সেই দলকে ভবিষ্যতে গণভিত্তির সংকটে পড়তে হতে পারে। বিশেষ করে সরকার গঠনের স্বপ্ন দেখলে এই ঝুঁকি আরও বড়।”
ইতিহাস ও বাস্তবতার প্রশ্ন
বাংলাদেশের ইতিহাসে যাত্রাপালা কেবল বিনোদন নয়; ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, সামাজিক ন্যায় ও ধর্মীয় নৈতিকতার বার্তা বহন করেছে। বহু যাত্রাপালায় নবী-রাসুল, সত্য ও মিথ্যার লড়াই, জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ—এই বিষয়গুলোই প্রধান উপজীব্য ছিল।
সাংস্কৃতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, যাত্রাশিল্পের সঙ্গে সংঘাত নয়, বরং নৈতিক সংস্কারের হাতিয়ার হিসেবে এটিকে গ্রহণ করলে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে ইতিবাচক ফল আসতে পারে।
সম্ভাব্য ক্ষতির আশঙ্কা
সচেতন মহলের আশঙ্কা, রৌমারীর মতো ঘটনা যদি পুনরাবৃত্তি হয়, তবে—
যাত্রাশিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে স্থায়ী আস্থার সংকট তৈরি হবে
গ্রামীণ ভোটব্যাংকের একটি বড় অংশ ক্ষুব্ধ হতে পারে
আদর্শিক রাজনীতির প্রতি সাধারণ মানুষের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে
প্রত্যাশা
সুশীল সমাজ ও ধর্মপ্রাণ জনগণ আশা করছেন, জামায়াতে ইসলামী এই ঘটনাকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচনা করবে এবং কুরআনের নির্দেশিত ভারসাম্য, সহনশীলতা ও মানবিকতার আলোকে ভবিষ্যতে প্রশাসনের অনুমোদিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতামূলক ভূমিকা নেবে।
কারণ, রাজনীতি যখন সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তখন ক্ষতি হয় উভয়েরই—আর তার মাশুল দিতে হয় পুরো সমাজকে।
এই নিউজটা কি আপনার পত্রিকায় প্রকাশিত করা যাবে ভাইজান।
মতামত দিন