ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচার শেষ হয়েছে। ভোট গ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগে আজ মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টার সঙ্গে সঙ্গে প্রচার-প্রচারণার সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এ সময়ের পর থেকে ভোটের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখতে নির্বাচনী এলাকায় শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেল পর্যন্ত মিছিল, জনসভা কিংবা মাইকিং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
গত ২২ জানুয়ারি থেকে টানা ২০ দিন ধরে চলা নির্বাচনী প্রচার শেষ করে প্রার্থীরা এখন ভোটের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। একই সঙ্গে নির্বাচন আয়োজনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সারা দেশে ভোট গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যালট বাক্স, ব্যালট পেপারসহ অন্যান্য সরঞ্জাম ইতোমধ্যে পৌঁছে গেছে।
সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
এক নজরে সিলেট জেলার ৬টি আসনে শেষমুহূর্ত :
সিলেট-১
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-১ আসনে যে দলের প্রার্থী জয়লাভ করে সে দলই সরকার গঠন করে-এমন একটি কথা প্রচলিত তবে ভোটার ও জনতার আকর্ষণ মূলত বিএনপি ও জামায়াত জোটের প্রার্থীদের দিকে মর্যাদাপূর্ণ এই এই আসনে এখন পর্যন্ত বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বিএনপি। অন্যদিকে অতিতে দলের বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকান্ডে অনেকটা পিছিয়ে আছেন দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান।
স্বাধীনতার পর থেকে অনুষ্ঠিত প্রতিটি নির্বাচনে সত্যও হয়েছে এটি। সেই সূত্র ধরে ঐতিহ্যবাহী আসনে পরিণত হওয়া এই আসনে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জয়ী হতে মরিয়া বিএনপি ও জামায়াত।সিলেট সিটি ও সদর নিয়ে গঠিত এ আসনে ধানের শীষ নিয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়াও জামায়াতে ইসলামীর প্রতীক দাঁড়িপাল্লা নিয়ে এগারো দলীয় জোটের প্রার্থী জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন কাস্তে, বাসদের প্রণব জ্যোতি পাল মই, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের শামীম মিয়া আপেল, গণঅধিকার পরিষদের আকমল হোসেন ট্রাক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাহমুদুল হাসান হাতপাখা এবং বাসদ (মার্কসবাদী) সঞ্জয় কান্তি দাস কাঁচি প্রতীক নিয়ে এই আসনে নির্বাচন করছেন।
আসনটিতে এবার ভিন্ন মেজাজে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়েছেন বিএনপি, জামায়াতসহ অন্য দলের প্রার্থীরা। প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আসনটিতে জয়লাভ করতে নানা কৌশল অবলম্বন করছে প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও জামায়াত। তাদের জয়-পরাজয় দলের আত্মমর্যাদার বিষয় বলে বিবেচনা করছেন তারা।
সিলেট-২
বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর নিয়ে গঠিত এ আসন নিখোঁজ বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর ঘাঁটি হিসেবে তার প্রতি মানুষের আলাদা দুর্বলতা আছে। এই আসনে ধানের শীষের প্রার্থী দেওয়া হয়েছে ইলিয়াস পত্নী তাহসিনা রুশদী লুনা। ইলিয়াস আলীর প্রতি মানুষের আলাদা দুর্বলতা রয়েছে, তাই তিনি এখন পর্যন্ত বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। এখন ধানের শীষের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে জামায়াত জোটের প্রার্থী দেওয়াল ঘড়ি মার্কায় খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ মুনতাসির আলীর মধ্যে।
বিএনপি জামায়াত জোট ছাড়াও এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন গণফোরামের মুজিবুল হক উদীয়মান সূর্য, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির উদ্দিন হাতপাখা এবং লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে জাতীয় পার্টির মাহবুবুর রহমান চৌধুরী।
সিলেট-৩
দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ নিয়ে গঠিত এই আসনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের মনোনয়ন নিয়ে মাঠে রয়েছেন বর্ষিয়ান আলেমে দ্বীন মরহুম নুরুদ্দিন আহমদ গহরপুরী র. এর ছেলে খেলাফত মজলিসে রিক্সা প্রতিকের প্রার্থী মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজু। এই আসনে বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী প্রবাসী বিএনপি নেতা আব্দুল মালিক। লোকমান আহমদ সরে যাওয়ায় কোনঠাসা আব্দুল মালিকের পালে লাগে উত্তরীও হাওয়া। তবে শেষদিকে এসে জামায়াত নেতা লোকমানসহ জোটের কর্মী সমর্থকরা রিকশা মার্কার ব্যাপক প্রচারণায় নামায় ভোটের সুর ঘুরতে শুরু করে। শেষমুর্হূতে এসে ধানের শীষের প্রার্থী আব্দুল মালিক কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় থাকলেও মাওলানা রাজুর দিকে ভোটারের পাল্লা ক্রমশ ভারী হচ্ছে। এতে ভোটে এখানে লড়াইয়ের ইংগিত দেখছেন ভোটাররা।
এই আসনে অন্যান্য প্রার্থীর মধ্যে আছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আনওয়ারুল হক হাতপাখা, জাতীয় পার্টির আতিকুর রহমান লাঙ্গল, স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার মোস্তাকিম রাজা চৌধুরী ফুটবল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মাইনুল বাকর কম্পিউটার।
সিলেট-৪
সীমান্ত জনপদ জৈন্তা, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ নিয়ে গঠিত এই আসনে ভোটের লড়াইয়ে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছেন বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র 'ম্যাজিকম্যান' খ্যাত আরিফুল হক চৌধুরী। তার সাথে মুল প্রতিদ্বন্ধিতা হবে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীনের।
এখানে জাতীয় পার্টির মুজিবুর রহমান লাঙ্গল, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা সাঈদ আহমদ হাতপাখা এবং গণঅধিকার পরিষদের জহিরুল ইসলাম ট্রাক প্রতীক নিয়ে লড়লেও তাদের প্রতি তেমন সাড়া দেখা যায়নি ভোটারদের মধ্যে। শুধু কোম্পানীগঞ্জে প্রত্যান্ত কিছু জনপদে হাতপাখার নিজস্ব কিছু ভোটার আছে বলে জানান স্থানীয়রা।
স্থানীয় প্রার্থীতা ইস্যু নিয়ে কথা তুললেও এখন পর্যন্ত ভোটের মাঠে সুবিধা করতে পারছেন না জামায়াতের প্রার্থী জয়নাল আবেদিন।তবে ঐক্যবদ্ধ বিএনপি এবং সিসিকে উন্নয়ন কাজের ফিরিস্তির কারনে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন আরিফুল হক চৌধুরী। এর বাইরে কওমী ঘরনা বেশ ভোট আরিফ তার দিকে টানতে পেরেছেন। তাই শেষ দিকে এসে স্থানীয় ছেলে নাকি বিএনপি প্রার্থী আরিফকে ভোটাররা বেছে নেন তা এখন দেখার বিষয়।
সিলেট-৫
আলেম-উলামা আধ্যুসিত এই আসনে বিএনপি জোটের মনোনয়ন দেয়া হয়েছে জমিয়তের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুককে। তিনি খেজুর গাছ প্রতিক নিয়ে নির্বাচনে লড়ছেন। জামায়াতের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে এগারো দলীয় জোট থেকে মনোনয় দেওয়া হয়েছে জনপ্রিয় ইসলামী বক্তা মুফতি মাওলানা আবুল হাসান ও সদস্য বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী মামুনুর রশীদ (চাকসু মামুন) ফুটবল প্রতিক নিয়ে তার সাথে প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন। গাছে সমর্থন দেওয়ায় এখানে ধানে শীষের কোনো প্রার্থী নেই। ফলে ধানের শীষ সমর্থকদের ভোট কোন দিকে যাবে তার উপর নির্ভর করে মামুন না ফারুক কে বিজয়ী হবেন। তবে একটি নির্দিষ্ট গোষ্টির ভোটব্যাংক নিয়ে ভোটের মাঠে বেশ শক্ত অবস্থানও রয়েছে মুফতি আবুল হাসানের।
এছাড়া বাংলাদেশ মুসলিম লীগের বিলাল হোসেন হারিকেন প্রতীক নিয়ে লড়ছেন এখানে।
সিলেট-৬
সিলেটের সবচেয়ে ভিআইপি আসনের মধ্যে একটি গোলাপগঞ্জ বিয়ানীবাজারের এই আসন। এখানে বিএনপি থেকে ধানের শীষ প্রতিক নিয়ে ভোটে লড়ছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও আন্দোলন সংগ্রামে পরিক্ষিত মুখ এডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী। তার সাথে মুল প্রতিদ্বন্ধিতায় রয়েছেন জামায়াত জোট থেকে দাঁড়িপাল্লা নিয়ে লড়ছেন জামায়াতের ঢাকা মহানগরীর আমীর মু. সেলিম উদ্দিন।
মতামত দিন