ফের যুদ্ধ ঘোষণা করল পাকিস্তান।
দীর্ঘদিনের মিত্রতা ভেঙে এবার প্রকাশ্য সংঘাতে জড়াল পাকিস্তান ও আফগানিস্তান। সীমান্তে হামলা-পাল্টা হামলার জেরে ইসলামাবাদ সরাসরি ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছে কাবুলের বিরুদ্ধে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে দিয়েছে—দুই দেশের সম্পর্ক এখন আর বন্ধুত্বের নয়, বরং গভীর অবিশ্বাস ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার।অতীতের মিত্রতা, বর্তমানের শত্রুতা।
১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তালেবান সরকারের প্রথম মেয়াদে পাকিস্তান ছিল তাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। সম্পর্কের শিকড় আরও পেছনে—১৯৭৯ সালে সোভিয়েত আগ্রাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা পাকিস্তানের মাধ্যমে আফগান মুজাহিদদের কাছে পৌঁছায়। সেই সূত্রেই গড়ে ওঠে দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক।
কিন্তু ২০২১ সালে তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর ইসলামাবাদ যে বন্ধুত্বপূর্ণ সরকারের প্রত্যাশা করেছিল, বাস্তবতা তার উল্টো চিত্র দেখাচ্ছে।
-সাম্প্রতিক সংঘাত:
গত বৃহস্পতিবার সীমান্তে পাকিস্তানি সামরিক অবস্থানের ওপর আফগান বাহিনীর হামলার পর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটে। এর জেরে কাবুলসহ বিভিন্ন শহরে বিমান হামলা চালায় পাকিস্তান। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা–র কাবুল প্রতিনিধি নাসের শাদিদের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় রাত ১টা ৫০ মিনিটে প্রথম দফা হামলা হয়, পরে দ্বিতীয় দফায় বোমা বর্ষণ করা হয়। আফগান বিমানবিধ্বংসী কামান থেকেও পাল্টা গুলি ছোড়া হয়।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কড়া বার্তা দিয়ে জানান, ‘ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে—এখন সরাসরি যুদ্ধ।
যদিও আপাতত হামলা থেমেছে, বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, তালেবান সরকার পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী নয়।
-টিটিপি ইস্যু: উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু:
দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েনের প্রধান কারণ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)। ইসলামাবাদের অভিযোগ, টিটিপি আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে এবং কাবুলের তালেবান সরকার তাদের প্রশ্রয় দিচ্ছে। আফগান তালেবান এই অভিযোগ অস্বীকার করলেও পাকিস্তান দাবি করছে, তাদের কাছে ‘চূড়ান্ত প্রমাণ’ রয়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পাকিস্তানে আত্মঘাতী হামলা বেড়েছে। ইসলামাবাদসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মসজিদ ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার পর পাকিস্তান একাধিকবার আফগানিস্তানের ভেতরে বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
-ডুরান্ড লাইন ও সীমান্ত বিরোধ:
দুই দেশের মধ্যে প্রায় ২,৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত—ডুরান্ড লাইন—নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। আফগানিস্তান এখনো এই সীমান্তকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। সীমান্তে পাকিস্তানের বেড়া নির্মাণ নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে কাবুল। বিশ্লেষকদের মতে, পশতুন জাতীয়তাবাদ প্রশ্নটিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
-আঞ্চলিক রাজনীতির প্রভাব:
সম্প্রতি কাবুল ও ভারত–এর মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের তৎপরতাও পাকিস্তানের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। যদিও ভারত এখনো তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি, কূটনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি ইসলামাবাদকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। অনেকের মতে, এই ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনও সংঘাতের মাত্রা বাড়িয়েছে।
-সম্পর্কের ভবিষ্যৎ:
দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, পাকিস্তান আশা করেছিল তালেবান ক্ষমতায় এলে তাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি কমবে। কিন্তু বাস্তবে টিটিপি ইস্যুতে কাবুলের অবস্থান ইসলামাবাদের প্রত্যাশা পূরণ করেনি। ফলে সম্পর্কের পুনরুদ্ধার এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।
সব মিলিয়ে, দুই দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এক অনিশ্চিত মোড়ে দাঁড়িয়ে। পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের সম্ভাবনা আপাতত কম মনে হলেও সীমান্তে উত্তেজনা যে কোনো সময় নতুন করে বিস্ফোরিত হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য এই সংকট কতটা গভীর প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে।
মতামত দিন