• ২০২৬ এপ্রিল ১৯, রবিবার, ১৪৩৩ বৈশাখ ৬
  • সর্বশেষ আপডেট : ১২:০৪ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

অস্ট্রিয়ার ভিক্টোরি থেকে বেইলি রোডের :ভিকারুন নিসা:এক বিস্ময়কর রুপান্তর ।

  • প্রকাশিত ০১:০৪ অপরাহ্ন রবিবার, এপ্রিল ১৯, ২০২৬
অস্ট্রিয়ার ভিক্টোরি থেকে বেইলি রোডের :ভিকারুন নিসা:এক বিস্ময়কর রুপান্তর ।
File
রেজাউল ইসলাম আশিক (বিশেষ প্রতিনিধি)

অস্ট্রিয়ার মেয়ে থেকে বেইলি রোডের কিংবদন্তি: কে এই ভিকারুণ নিসা নুন?


বাংলাদেশের শিক্ষা মানচিত্রে 'ভিকারুণ নিসা নুন স্কুল অ্যান্ড কলেজ' কেবল একটি নাম নয়, এটি একটি আস্থার প্রতীক। কিন্তু আমরা কজন জানি, বেইলি রোডের এই প্রাঙ্গণটি যাঁর নামে, তিনি জন্মসূত্রে কোনো বাঙালি ছিলেন না? এমনকি এশীয়ও ছিলেন না! তিনি ছিলেন সুদূর ইউরোপের অস্ট্রিয়ার এক অকুতোভয় নারী।

আজ বলব সেই মহীয়সী নারী ভিকার-উন-নিসা নুন (লেডি নুন)-এর গল্প, যা কোনো সিনেমার চিত্রনাট্যের চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়।

১. ভিক্টোরিয়া থেকে ভিকার-উন-নিসা

১৯২০ সালে অস্ট্রিয়ায় জন্ম নেওয়া মেয়েটির নাম ছিল ভিক্টোরিয়া। বড় হয়েছেন ইংল্যান্ডের মুক্ত বাতাসে। শিক্ষায়-দীক্ষায় আধুনিক এই তরুণী কখনও ভাবেননি তাঁর জীবনের গন্তব্য হবে সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারের এক জনপদ। ১৯৪৫ সালে লন্ডনে তাঁর পরিচয় হয় প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ স্যার ফিরোজ খান নুন-এর সাথে। বয়সের বিশাল ব্যবধান তুচ্ছ করে গড়ে ওঠে ভালোবাসা। বিয়ের পর ভিক্টোরিয়া ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁর নতুন নাম হয় ‘ভিকার-উন-নিসা’, যার অর্থ 'নারীদের শ্রেষ্ঠত্ব'।

২. রাজনীতির ময়দানে এক লড়াকু সৈনিক

স্বামীর হাত ধরে তিনি চলে আসেন এই উপমহাদেশে। তিনি কেবল গৃহবধূ হয়ে থাকেননি; মুসলিম লীগের নারী শাখার নেতৃত্বে দিয়ে পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে রাজপথে নেমেছেন, ১৪৪ ধারা ভেঙেছেন, এমনকি তিনবার কারাবরণও করেছেন। দেশভাগের সময় যখন লাখ লাখ রিফিউজি নিঃস্ব হয়ে আসছিল, তখন তিনি রেড ক্রসের হয়ে আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেন।

৩. বেইলি রোডের সেই স্বপ্নগাথা

১৯৫০ সালে ফিরোজ খান নুন যখন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হয়ে ঢাকায় আসেন, তখন লেডি নুন লক্ষ্য করেন এখানকার মেয়েদের শিক্ষার করুণ দশা। ১৯৫২ সালের ১৪ জানুয়ারি তাঁরই ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বেইলি রোডে যাত্রা শুরু করে একটি ছোট প্রিপারেটরি স্কুল। আজ সেই স্কুলটিই বাংলাদেশের নারী শিক্ষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ।

জানলে অবাক হবেন: কেবল ঢাকা নয়, পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতেও তিনি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং "ভিকি নুন এডুকেশনাল ফাউন্ডেশন"-এর মাধ্যমে মেধাবী শিক্ষার্থীদের অক্সফোর্ড-ক্যামব্রিজে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছেন।

৪. কূটনীতিতেও তিনি অনন্য

লেডি নুন কতটা দূরদর্শী ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় গোয়াদুর বন্দর প্রাপ্তিতে। ওমানের সুলতানের কাছ থেকে এই কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকাটি পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার পেছনে লন্ডনে তাঁর লবিং ছিল অবিস্মরণীয়। ১৯৫৭ সালে তাঁর স্বামী প্রধানমন্ত্রী হলে তিনি হন পাকিস্তানের ফার্স্ট লেডি।

৫. শেষ অধ্যায় ও উত্তরাধিকার

২০০০ সালের ১৬ জানুয়ারি ইসলামাবাদে এই মহীয়সী নারীর জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু তিনি অমর হয়ে আছেন আমাদের হৃদয়ে। আজ ভিকারুণ নিসা স্কুলের হাজার হাজার ছাত্রী যখন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা দেশের কর্ণধার হয়ে গড়ে ওঠে, তখন আড়ালে হাসেন সেই অস্ট্রিয়ান নারী।

উপসংহার:

ইতিহাস সবসময় তলোয়ার চালানো যোদ্ধাদের মনে রাখে না, কখনও কখনও কলম আর শিক্ষার মশাল হাতে ধরা মানুষগুলোকেও শ্রেষ্ঠ আসনে বসায়। ভিকার-উন-নিসা নুন আমাদের সেই অদেখা নায়িকা। বেইলি রোডের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আজ থেকে হয়তো এই নামটির প্রতি সম্মান আরও বেড়ে যাবে।

শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাক প্রতিটি ঘরে। ❤️


সর্বশেষ