*চরে মহিষের বিপুল সম্ভাবনা,নজর নেই সরকারের।*
*উপশিরোনাম:* চুরি-জলোচ্ছ্বাসে বছরে কোটি কোটি টাকার ক্ষতি।
নদীবেষ্টিত ভোলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল মহিষ পালনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। মেঘনা, তেঁতুলিয়া ও বঙ্গোপসাগরঘেঁষা এসব চরে যুগের পর যুগ ধরে বংশপরম্পরায় মহিষ পালন করে আসছেন স্থানীয় কৃষক ও খামারিরা। মহিষের দুধ, মাংস ও দুধের তৈরি পণ্য স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও নিরাপত্তার অভাবে সম্ভাবনাময় এ খাতটি নানা সংকটে পড়েছে।
খামারিদের অভিযোগ, চরাঞ্চলে মহিষ পালনের জন্য নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নেই। নেই পর্যাপ্ত সরকারি নজরদারিও। ফলে একদিকে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে মহিষ হারিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে চুরির ঘটনা। গত দুই বছরে চরাঞ্চলের বিভিন্ন বাথান থেকে চার শতাধিক গরু-মহিষ চুরি হয়েছে বলে দাবি করেছেন মালিকরা।
ভোলা জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলার বিচ্ছিন্ন ৮৫টি চরে ১৭৮টি ছোট-বড় বাথানে প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার মহিষ রয়েছে। এসব মহিষ থেকে প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০ মেট্রিক টন দুধ উৎপাদিত হয়। প্রতিটি মহিষের গড় বাজারমূল্য প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
ভোলার মহিষের দুধের তৈরি ‘টক দই’ ইতোমধ্যে জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। ফলে মহিষ পালন ও দুধভিত্তিক পণ্য উৎপাদন সম্প্রসারণ করা গেলে স্থানীয় অর্থনীতির পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয়েও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। চরাঞ্চলে মহিষের জন্য স্থায়ী ও নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি বছরই বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছেন খামারিরা। ২০২৪ সালে ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে জলোচ্ছ্বাসে ভোলার বিভিন্ন চর থেকে ৯ হাজার ৯৩১টি মহিষ ভেসে যায়। পরে অধিকাংশের সন্ধান পাওয়া গেলেও ২৬৯টি মহিষ মারা যায়। ওই ঘটনায় ক্ষতির পরিমাণ প্রায় চার কোটি টাকা বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
চরাঞ্চলে মানুষের জন্য ২২টি কিল্লা থাকলেও মহিষের জন্য সরকারি উদ্যোগে আলাদা কোনো স্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র নেই। বেসরকারি উদ্যোগে গবাদিপশুর জন্য চারটি কিল্লা নির্মিত হয়েছে। জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের হিসাবে, ৫০০ মহিষ ধারণক্ষমতার প্রায় ২৫০টি কিল্লা প্রয়োজন।
মহিষ মালিকদের দাবি, দুর্যোগের পাশাপাশি চুরিও তাদের বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর মহিষ চুরি বন্ধসহ পাঁচ দফা দাবিতে ভোলা প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে ভোলা সদর উপজেলা মহিষ মালিক সমবায় সমিতি।
সমিতির নেতারা বলেন, মদনপুর, নেয়ামতপুর, চর কালুপুর, চর গাজীপুর, চর বৈরাগী, চরকালী, চর কাঁকড়া, মধুপুরসহ বিভিন্ন চরাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে মহিষ পালন হয়ে আসছে। চরের জমি ইজারা বা লগ্নি নিয়ে ঘাস ও খাবারের ব্যবস্থা করতে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। কিন্তু চুরি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতি হলে সরকারি সহায়তা পাওয়া যায় না।
দৌলতখান উপজেলার মদনপুরে প্রায় পাঁচ দশক ধরে মহিষ পালন করছেন মো. আব্দুল হাই। বর্তমানে তার বাথানে প্রায় ৫০টি মহিষ রয়েছে। তার ভাষ্য, পরিবারের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে এই পেশায় থাকলেও সরকারি কোনো উল্লেখযোগ্য সহায়তা পাননি।
দৌলতখানের নেয়ামতপুর চরের মহিষ পালনকারী জাকির হোসেন বাবুলের বাথানে শতাধিক মহিষ রয়েছে। তিনি বলেন, জলোচ্ছ্বাসে মহিষ হারানোর পাশাপাশি বিভিন্ন সময় চুরির ঘটনাও ঘটে। নিজেদের উদ্যোগে মাটি উঁচু করে অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করলেও তা দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়।
ভোলা সদর উপজেলার বিভিন্ন চরে দীর্ঘদিন ধরে মহিষ পালন করছেন মহিষ মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি আলহাজ আবুল কাশেম। তার তিনটি বাথানে মহিষ রয়েছে। তিনি জানান, মহিষের খাবারের জন্য চর লগ্নি করতেই বছরে প্রায় ৭০ লাখ টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু গত দুই বছরে তার বাথান থেকেই প্রায় ৫০টি মহিষ চুরি হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশনের সভাপতি শাহাবুদ্দিন ফরাজি বলেন, চুরি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মহিষ পালনকারীরা নিয়মিত ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এই খাতকে টিকিয়ে রাখতে চরাঞ্চলে প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাথান মালিকদের বিমার আওতায় আনা প্রয়োজন।
ভোলা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম খান বলেন, জনবল সংকটের কারণে চরাঞ্চলের বাথানগুলোতে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে স্বল্প জনবল নিয়েই বিভাগ কাজ করছে। মহিষ চুরি ও দুর্যোগজনিত ক্ষতি কমাতে আধুনিক ডাটাবেজ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। ডাটাবেজ চালু হলে মহিষ শনাক্ত ও চলাচল পর্যবেক্ষণ সহজ হবে।
তিনি আরও বলেন, শীত মৌসুমে চরাঞ্চলে তরমুজ চাষ বেড়ে যাওয়ায় মহিষের চারণভূমি সংকুচিত হয়। পাশাপাশি নদীর পানিতে লবণাক্ততা থাকায় খাবার ও পানির সংকট দেখা দেয়। এতে মহিষ দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি দুধ উৎপাদনও কমে যায়। এ সমস্যা মোকাবিলায় মহিষের জন্য স্থায়ী চারণভূমি গড়ে তোলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, চারণভূমি, চিকিৎসাসেবা, বীমা ও কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে ভোলার চরাঞ্চলের মহিষ পালন আরও সম্প্রসারিত হতে পারে। এতে একদিকে হাজার হাজার মানুষের জীবিকা সুরক্ষিত হবে, অন্যদিকে দুধ ও মাংস উৎপাদন বাড়িয়ে জাতীয় অর্থনীতিতেও বড় অবদান রাখা সম্ভব।
মতামত দিন