• ২০২৬ অক্টোবর ২৩, শুক্রবার, ১৪৩৩ কার্তিক ৮
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:১০ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

বক দিয়ে বক শিকার, চলনবিলে।

  • প্রকাশিত ১১:১০ অপরাহ্ন শুক্রবার, অক্টোবর ২৩, ২০২৬
বক দিয়ে বক শিকার, চলনবিলে।
Time Bangla news
ফজলে এলাহী সুমন | সাভার প্রতিনিধি | টাইম বাংলা নিউজ।

*বক দিয়ে বক শিকার, চলনবিলে।* 


 *উপশিরোনাম:* শীতের আগমনে চলনবিলে অতিথি পাখির কলরব, সক্রিয় শিকারিচক্র। 

শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে সঙ্গে অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠছে উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ চলনবিল। বর্ষার পানি নামতে শুরু করায় খাল-বিল ও জলাশয়ে মাছের প্রাচুর্য দেখা দিয়েছে। খাবারের সন্ধানে এসব জলাভূমিতে ছুটে আসছে বক, বালিহাঁস, মাছরাঙা, সারস, পানকৌড়িসহ নানা প্রজাতির পাখি। কিন্তু প্রকৃতির এই প্রাণচাঞ্চল্যের আড়ালেই সক্রিয় হয়ে উঠেছে পাখি শিকারিরা। বাঁশের খুঁটি, কলাপাতা, খেজুরের ডাল, বিষটোপ ও জাল ব্যবহার করে নির্বিচারে ধরা হচ্ছে পাখি। আইন ও প্রশাসনিক অভিযান সত্ত্বেও শিকার বন্ধ না হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে পরিবেশবাদীদের মধ্যে।

পরিবেশকর্মীদের ভাষ্য, বর্ষার পানি কমে যাওয়ার পর চলনবিলের বিভিন্ন জলাশয় ও ফসলের মাঠে পুঁটি, খলসে, দারকিনাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ সহজলভ্য হয়। এসব মাছের টানে দেশি পাখির পাশাপাশি পরিযায়ী পাখিও এখানে আসে। এক বিল থেকে অন্য বিলে খাবারের সন্ধানে উড়ে বেড়ানো পাখিগুলোই শিকারিদের পাতা ফাঁদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে।

 *পোষা বক দিয়ে ফাঁদে ফেলা হয় পাখি* 

চলনবিলের বিভিন্ন এলাকায় পাখি শিকারের প্রচলিত কৌশলগুলোর একটি হলো ‘কিল্লা ঘর’। বাঁশের খুঁটির সঙ্গে কলাপাতা ও খেজুরের ডাল ব্যবহার করে তৈরি করা হয় বিশেষ ধরনের আড়াল বা ফাঁদ। এর সামনে বাঁশের মগডালে বসিয়ে রাখা হয় একটি পোষা বক।

শিকারিদের কৌশল অনুযায়ী, আকাশে বকের ঝাঁক দেখা গেলে পোষা বকটিকে নড়াচড়া করানো হয়, যাতে তার ডাক ও উপস্থিতিতে অন্য বকগুলো আকৃষ্ট হয়ে ফাঁদের কাছে আসে। পাখির দল ফাঁদের ওপর বসলে আড়ালে থাকা শিকারিরা সেগুলো ধরে খাঁচায় বন্দি করেন।

এ ছাড়া মাছ গেঁথে বড়শি পেতে, বিষটোপ ব্যবহার করে এবং ধানখেতে আড়াআড়িভাবে জাল বসিয়েও পাখি ধরা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কিছু শিকারি রাতের অন্ধকারে বন্দুক ব্যবহার করেও পাখি শিকার করেন। পরে শিকার করা পাখি নিজেদের খাওয়ার পাশাপাশি বাজারে বিক্রি করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় রাতের আঁধারেই।

 *হাটে বিক্রির জন্য নেওয়া হচ্ছিল প্রায় ২০০ কোয়েল* 

প্রতিবেদকের সরেজমিন পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গত ২০ অক্টোবর সোমবার বেলা ১১টার দিকে শিকারিদের জালে আটকা পড়া প্রায় ২০০টি কোয়েল পাখি বিক্রির জন্য হাটে নেওয়া হচ্ছিল। আগের রাতের শেষ প্রহর থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত এসব পাখি শিকার করা হয়েছে বলে জানা যায়।

স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আকার ও প্রজাতিভেদে পাখির দাম নির্ধারণ করা হয়। প্রতিটি বক ১২০ থেকে ১৫০ টাকা, একটি বালিহাঁস ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং এক জোড়া চাকলা পাখি প্রায় ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শিকারি জানান, তাঁরা ভোরে দলবদ্ধভাবে বিল ও ফসলের মাঠে গিয়ে পাখি শিকার করেন। কেউ অল্পসংখ্যক পাখি ধরলেও কোনো কোনো শিকারির জালে একসঙ্গে অনেক পাখি আটকা পড়ে। শিকার করা পাখি বিক্রির জন্য তাঁদের নিয়মিত ক্রেতা রয়েছে বলেও তাঁরা দাবি করেন।

শিকারিদের ভাষ্য, কিছু ক্রেতা পাখির জন্য ভালো দাম দিতে রাজি থাকেন। তবে পাখি শিকার আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ—এ বিষয়ে অনেক শিকারির পর্যাপ্ত সচেতনতা নেই বলে তাঁদের কেউ কেউ দাবি করেন। যদিও এ বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায়নি।

 *অভিযানে উদ্ধার পাখি, ধ্বংস ফাঁদ* 

পাখি শিকার বন্ধে চলনবিলের বিভিন্ন এলাকায় কাজ করছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। এর মধ্যে চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটি শিকারিদের ফাঁদ থেকে পাখি উদ্ধারের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।

নাটোরের সিংড়া উপজেলায় পাখি শিকারের বিরুদ্ধে গত ৩ অক্টোবর ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালানো হয়। ওই অভিযানে তিন শিকারিকে আটক করে প্রত্যেককে দুই হাজার টাকা জরিমানা ও এক দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

এর তিন দিন পর, ৬ অক্টোবর, আবারও অভিযান চালানো হয়। এ সময় ৫০টি জবাই করা পাখি উদ্ধার করা হয়। পাখি শিকারের সঙ্গে জড়িত পাঁচজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে তিনজনকে দুই মাস করে কারাদণ্ড এবং প্রত্যেককে দুই হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। বাকি দুজনের একজনকে সাত হাজার টাকা এবং অন্যজনকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

অভিযানকালে চলনবিলের আগমীরন, বামিহাল, মাকিয়ান ও পূর্বভেড়ী বিল থেকে বক শিকারে ব্যবহৃত অর্ধশতাধিক পোষা বক ও শিকার করা পাখি উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি ধানখেতে তৈরি করা ‘কিল্লা ঘর’ নামের ১০টি ফাঁদ ধ্বংস করা হয়। পরে সিংড়া উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) উপস্থিতিতে উদ্ধার করা পাখিগুলো মুক্ত আকাশে অবমুক্ত করা হয়। অভিযানে সহযোগিতা করেন চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সদস্যরা।

 *নজরদারি ও সচেতনতা বাড়ানোর দাবি* 

চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম জানান, চলনবিলের বিভিন্ন ধানখেতে ফাঁদ পেতে নিয়মিত পাখি শিকার করা হচ্ছে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে খবর পেয়ে তাঁরা প্রশাসনের সহযোগিতায় পাখি উদ্ধারের উদ্যোগ নেন।

তিনি জানান, পাখি শিকার বন্ধে অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা হচ্ছে। এ জন্য লিফলেট বিতরণ ও মাইকিংয়ের মাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারও চালানো হচ্ছে।


পরিবেশসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, চলনবিলের জলাভূমি শুধু মাছের প্রজননক্ষেত্র নয়, দেশি ও পরিযায়ী পাখিরও গুরুত্বপূর্ণ বিচরণস্থল। নির্বিচারে পাখি শিকার অব্যাহত থাকলে জলাভূমির প্রাকৃতিক ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই নিয়মিত নজরদারি, আইন প্রয়োগ এবং স্থানীয় মানুষের সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে পাখি শিকার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

সর্বশেষ