• ২০২৬ অক্টোবর ২৪, শনিবার, ১৪৩৩ কার্তিক ৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৫:১০ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

আদালতের নিষেধাজ্ঞাও থামাতে পারেনি লালমাই পাহাড় কাটা।

  • প্রকাশিত ০৬:১০ অপরাহ্ন শনিবার, অক্টোবর ২৪, ২০২৬
আদালতের নিষেধাজ্ঞাও থামাতে পারেনি লালমাই পাহাড় কাটা।
Time Bangla news
ফজলে এলাহী সুমন | সাভার প্রতিনিধি | টাইম বাংলা নিউজ।

**আদালতের নিষেধাজ্ঞাও থামাতে পারেনি লালমাই পাহাড় কাটা।* 


 *উপশিরোনাম:* পাহাড় কেটে রিসোর্ট, পার্ক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান; হুমকিতে প্রত্নঐতিহ্য ও জীববৈচিত্র্য

কুমিল্লার লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই চলছে পাহাড় কাটা ও স্থাপনা নির্মাণ। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পাহাড় কেটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রিসোর্ট, বিনোদনকেন্দ্র ও আবাসিক স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। সড়ক সম্প্রসারণ, ইটভাটার মাটি সংগ্রহ এবং বাণিজ্যিক প্রকল্পের কারণেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ। এতে বিপন্ন হচ্ছে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, বনভূমি ও জীববৈচিত্র্য।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের প্রকাশনা অনুযায়ী, কুমিল্লা শহরের প্রায় ৯ কিলোমিটার পশ্চিমে বিস্তৃত লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ের আয়তন প্রায় ৩৪ বর্গকিলোমিটার। এর সর্বোচ্চ উচ্চতা প্রায় ৫৫ মিটার। ঐতিহাসিক এই পাহাড়ে প্রাচীন স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ ছাড়াও রয়েছে অর্ধশতাধিক টিলা।

সদর দক্ষিণ উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ এস এম নুরুল আখতার নিলয়ের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় পাহাড় ও টিলাশ্রেণির ২ হাজার ১২১ একর ৫০ শতাংশ জমি ব্যক্তিমালিকানায় রয়েছে। সরকারি খাস খতিয়ানে রয়েছে ১০৩ একর ২৫ শতাংশ এবং বন বিভাগের নামে ১৮৩ একর ১২ শতাংশ।

 *পাহাড়জুড়ে সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা* 

লালমাই পাহাড়ে কুমিল্লা সেনানিবাস, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড), বিজিবির সেক্টর সদরদপ্তর, কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজ ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ২০০৬ সালে ৫০ একর পাহাড়ি জমিতে প্রতিষ্ঠিত কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারণের জন্য ২০২১ সালে আরও ২০০ একরের বেশি জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে ১৩১ একর পাহাড় ও টিলাশ্রেণির জমি। সেখানে কয়েকটি ভবন নির্মাণের কাজ চলছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কুমিল্লার উপপরিচালক সালমান চৌধুরী শাওনের ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি ভবন পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ সমীক্ষা (ইআইএ) প্রতিবেদন ছাড়াই নির্মাণ করা হচ্ছে বলে তাঁর মনে হয়েছে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো আবেদন এখনো অনুমোদন পায়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এস এম শহিদুল হাসান জানান, পরিবেশ অধিদপ্তরে আবেদন করা হয়েছে এবং অনুমোদনের বিষয়টি মন্ত্রণালয় দেখছে। উপাচার্য অধ্যাপক এম এম শরীফুল করীম বলেন, তিনি চলতি বছরের মে মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তখন অধিকাংশ ভবনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকায় নির্মাণের শুরুতে পাহাড় কাটা হয়েছিল কি না, তা তাঁর জানা নেই।

এদিকে পাহাড়ের প্রায় চার একর জমিতে সিসিএন বিশ্ববিদ্যালয়, সিসিএন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও সিসিএন মডেল কলেজ পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান তারিকুল ইসলাম চৌধুরীর দাবি, পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি নিয়েই এগুলো গড়ে তোলা হয়েছে এবং ভবন নির্মাণে পাহাড়ের ক্ষতি হচ্ছে না।

 *রিসোর্ট, পার্ক ও হাসপাতাল নির্মাণ* 

সদর দক্ষিণ উপজেলার বড় ধর্মপুর, সালমানপুর ও জামমুড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় কেটে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। ময়নামতি জাদুঘরের পশ্চিমে ‘নীলকুঞ্জ’ ও ‘কাশবন’ নামে দুটি রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। কাশবন রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী আবুল কাসেমের দাবি, প্রায় এক একর পাহাড়ি জমি কিনে তিনি রিসোর্ট ও পার্টি সেন্টার করেছেন, তবে এতে পাহাড়ের ক্ষতি হয়নি।

বড় ধর্মপুর এলাকায় ‘প্রবাসী পর্যটন ও বোটানিক্যাল গার্ডেন’ নির্মাণের জন্য পাহাড় ঘিরে রাখা হয়েছে। ব্যবসায়ী মো. মহসিন কবির ভূঁইয়া জানান, তিনি সেখানে ১২৮ শতক পাহাড়ি জমি কিনেছেন এবং কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে নির্মাণকাজ শুরু করবেন। কাছেই সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গাছপালা কেটে ‘লায়ন্স ইন্টারন্যাশনাল চক্ষু হাসপাতাল’ নির্মাণের উদ্যোগ দেখা গেছে।

সালমানপুরে সংরক্ষিত বনাঞ্চল কেটে ‘ম্যাজিক প্যারাডাইস’ বিনোদন পার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এতে প্রায় ৫০ একর পাহাড়ি ও বনাঞ্চলের ক্ষতি হয়েছে। পার্কটির মার্কেটিং কর্মকর্তা মো. রাফি বলেন, তিনি সম্প্রতি কাজে যোগ দিয়েছেন বলে পাহাড় কাটার বিষয়ে জানেন না। জামমুড়ায় ‘ডাইনোসর পার্ক’ এবং লালমাইয়ের দক্ষিণাংশে ‘লালমাই লেকল্যান্ড’ বিনোদন পার্কও গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় কেটে জমি সমতল করার চিহ্ন রয়েছে।

২০২১ সালে বড় ধর্মপুর এলাকায় সড়ক উন্নয়নের সময় অনুমতি ছাড়া ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৩০ ঘনফুট পাহাড়ি মাটি কাটার অভিযোগে সওজের সংশ্লিষ্ট দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করে পরিবেশ অধিদপ্তর।

 *হুমকিতে প্রত্নঐতিহ্য ও জীববৈচিত্র্য* 

লালমাই-ময়নামতি পাহাড় প্রাচীন বাংলার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চল। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫৫ সাল থেকে এখানে নিয়মিত খননকাজ চলছে। এ পর্যন্ত ৫০টির বেশি প্রত্নস্থল শনাক্ত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে শালবন বিহার, রূপবান মুড়া, ইটাখোলা মুড়া, আনন্দ বিহার, কোটিলা মুড়া ও রানী ময়নামতির প্রাসাদ।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম ও সিলেটের বিভাগীয় আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতা বলেন, পাহাড়ে প্রতিবছর খননকাজে নতুন নিদর্শন উন্মোচিত হচ্ছে। কিন্তু অবাধে পাহাড় কাটা ও স্থাপনা নির্মাণের কারণে অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন অনাবিষ্কৃত থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

একসময় পাহাড়ের বনাঞ্চলে বন্য শূকর, মেছোবাঘ, বুনো বিড়াল, শিয়াল, হনুমান, সজারু ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখির বিচরণ ছিল। বন বিভাগের মতে, গাছপালা উজাড়, পাহাড় কাটা ও বসতি সম্প্রসারণের কারণে প্রাকৃতিক সম্পদ এবং বন্য প্রাণীর আবাসস্থল কমে যাচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কুমিল্লার উপপরিচালক মো. মিজানুর রহমান বলেন, পাহাড় কাটায় ফল ও ফসলের আবাদ ব্যাহত হচ্ছে। পাহাড়টি ফল ও সবজি উৎপাদনের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হওয়ায় এর সংরক্ষণ কৃষি অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

 *নিষেধাজ্ঞা ও জরিমানার পরও বন্ধ হয়নি পাহাড় কাটা* 

২০২৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি লালমাই পাহাড় কাটা ও ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। ওই আদেশে সওজ অধিদপ্তর, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্কের নাম উল্লেখ করা হয়।

এর আগে ২০২০ সালের মার্চে পাহাড় কাটার অভিযোগে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও চারটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করে পরিবেশ অধিদপ্তর।

 বিশ্ববিদ্যালয়কে তিন লাখ পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকেও পৃথক অঙ্কের জরিমানা করা হয়।

চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি বড় ধর্মপুরে পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে অভিযানে তাজুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে আট লাখ টাকা জরিমানা এবং একটি খননযন্ত্র জব্দ করা হয়।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কুমিল্লা জেলা শাখার সভাপতি চিকিৎসক মো. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও প্রশাসনের অভিযান সত্ত্বেও পাহাড় কাটা বন্ধ না হওয়া উদ্বেগজনক।

কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এ বি এম মশিউজ্জামান বলেন, অধিকাংশ পাহাড়ি জমি ব্যক্তিমালিকানাধীন হলেও আইন অনুযায়ী পাহাড় কাটা নিষিদ্ধ। প্রশাসনের অভিযানে পাহাড় কাটা অনেকটা কমেছে বলে দাবি করেন তিনি।

লালমাই পাহাড় রক্ষায় জমির মালিকানা যাচাই, সংরক্ষিত বনভূমি উদ্ধার, পরিবেশগত অনুমোদন নিশ্চিত করা এবং আদালতের নির্দেশনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন জরুরি। অন্যথায় অব্যাহত পাহাড় কাটায় এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

সর্বশেষ