পরনে সাদা পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি। হাতে সাদা লাঠি, গলায় ঝোলানো লোহার রিংয়ে সাজানো বাদাম, ভাজা ছোলা ও চানাচুরের ছোট ছোট প্যাকেট। বিরামপুর উপজেলা পরিষদ চত্বরে হাঁটতে হাঁটতেই তাঁর পরিচিত ডাক— "লাগবে বাদাম, বুট?"। এভাবেই দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে জীবিকার সন্ধানে পথে পথে ঘুরছেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী রাজু আহমেদ (৩৮)।
দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার পশ্চিম জয়দেবপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা রাজু আহমেদের ব্যবসার সবচেয়ে বড় পুঁজি মূলধন নয়, মানুষের প্রতি অগাধ বিশ্বাস। তিনি বলেন, "আজ পর্যন্ত কেউ আমার বাদামের টাকা মেরে খায়নি। বরং ১০ টাকার বাদাম কিনে অনেকেই ২০ টাকা দিয়ে যান। মানুষের সততাই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি।"
চোখে দেখতে না পেলেও সাদা লাঠি আর পরিচিত পথের স্মৃতিকে সঙ্গী করে প্রতিদিন উপজেলা পরিষদ চত্বরসহ আশপাশের এলাকায় বাদাম, ভাজা ছোলা ও চানাচুর বিক্রি করেন তিনি। ভিক্ষাবৃত্তিকে কখনোই জীবিকার পথ হিসেবে বেছে নেননি। এই ছোট ব্যবসার আয়েই চলছে তাঁর চার সদস্যের সংসার।
রাজু জানান, ছোটবেলায় স্থানীয় একটি হাফেজিয়া মাদ্রাসায় পড়াশোনা করতেন। কিন্তু পারিবারিক অভাব-অনটনের কারণে পড়াশোনা মাঝপথেই বন্ধ হয়ে যায়। হাফেজ হওয়ার স্বপ্নও অপূর্ণ থেকে যায়। এরপর জীবিকার তাগিদে নানা চিন্তার পর বাদাম বিক্রিকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন।
প্রতিদিন বিকেলে বিরামপুর শহর থেকে কাঁচা বাদাম ও ছোলা কিনে বাড়ি ফেরেন তিনি। তাঁর স্ত্রী সেগুলো ভেজে ১০ টাকার ছোট ছোট প্যাকেট তৈরি করেন। পরদিন সকালে সেই প্যাকেটগুলো লোহার রিংয়ে সাজিয়ে বিক্রির উদ্দেশ্যে বের হন রাজু।
তিনি বলেন, শুরুতে অনেকেই তাঁকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন। অনেকে বলেছিলেন, চোখে দেখতে না পাওয়ায় মানুষ বাদাম নিয়ে টাকা না দিয়েই চলে যাবে। কিন্তু মানুষের সততার ওপর বিশ্বাস রেখে তিনি ব্যবসা শুরু করেন। দীর্ঘ ১৮ বছরের অভিজ্ঞতায় সেই বিশ্বাস আজও অটুট।
বর্তমানে বাদামের পাশাপাশি ভাজা ছোলা ও চানাচুরও বিক্রি করেন রাজু। প্রতিদিন তাঁর ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত লাভ হয়, যা দিয়েই সংসারের খরচ চালানোর চেষ্টা করেন।
ভিক্ষাবৃত্তি থেকে দূরে থাকার কারণ জানতে চাইলে রাজু বলেন, "ভিক্ষা করলে মানুষের কাছে হাত পাততে হয়। তার চেয়ে পরিশ্রম করে অল্প আয় হলেও সেটাই অনেক সম্মানের। আমার পরিবারের কেউ ভিক্ষা করেন না, আমিও কখনো সেই পথ বেছে নিইনি।"
অন্যান্য দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, "ভিক্ষা নয়, যার যে সামর্থ্য আছে, তা দিয়েই হালালভাবে জীবিকা নির্বাহ করা উচিত। আমরা সব কাজ করতে না পারলেও যে কাজ পারি, সেটি করেই সম্মানের সঙ্গে বাঁচা সম্ভব।"
দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও আত্মসম্মান, পরিশ্রম এবং মানুষের প্রতি অটুট বিশ্বাসকে পুঁজি করে রাজু আহমেদ আজ বিরামপুরের অনেক মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
মতামত দিন