• ২০২৬ অগাস্ট ২৮, শুক্রবার, ১৪৩৩ ভাদ্র ১৩
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৭:০৮ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

“কাগজের টাকা থেকে ডিজিটাল টাকায় বাংলাদেশ: অর্থনীতির নতুন দিগন্ত, নাকি নতুন ঝুঁকি?”

  • প্রকাশিত ১১:০৮ অপরাহ্ন শুক্রবার, অগাস্ট ২৮, ২০২৬
“কাগজের টাকা থেকে ডিজিটাল টাকায় বাংলাদেশ: অর্থনীতির নতুন দিগন্ত, নাকি নতুন ঝুঁকি?”
“ডিজিটাল টাকা এলে বদলাবে অর্থনীতির হিসাব—বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনা ও বড় চ্যালেঞ্জ”.
মোহাম্মাাদ শফিউল্লাহ : জেলা প্রতিনিধি ঢাকা

হাতে টাকা নয়, মুঠোফোনেই ‘ডিজিটাল টাকা’—সঠিক পরিকল্পনায় বদলে যেতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতির চিত্র

ঢাকা:
বাংলাদেশ যখন নগদনির্ভর অর্থনীতি থেকে দ্রুত ডিজিটাল লেনদেনের দিকে এগোচ্ছে, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা বা CBDC (Central Bank Digital Currency) চালুর প্রশ্নটি নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল কারেন্সি চালু হলে শুধু লেনদেনের পদ্ধতিই বদলাবে না; কর আদায়, সরকারি ভাতা, রেমিট্যান্স, ব্যবসা-বাণিজ্য, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং অর্থপাচার প্রতিরোধেও এর বড় প্রভাব পড়তে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের একটি গবেষণাপত্রে বাংলাদেশে CBDC-এর ধারণা ও সম্ভাবনা নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ বিষয়টি এখন কেবল ভবিষ্যৎ কল্পনা নয়—বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও এটি গবেষণার বিষয় হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনা কোথায়?

বাংলাদেশে ডিজিটাল লেনদেন ইতোমধ্যেই বড় আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে মাসিক লেনদেনের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে প্রায় ১ লাখ ৭১ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা এবং ১ লাখ ৬৪ হাজার ৭২৬ কোটি টাকা

এটি দেখায়—মানুষ ডিজিটাল অর্থ ব্যবস্থার জন্য প্রস্তুত। CBDC চালু হলে বিদ্যমান ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও পেমেন্ট ব্যবস্থার ওপর একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

১. লেনদেনের খরচ ও সময় কমতে পারে

ডিজিটাল টাকা সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল অবকাঠামোর মাধ্যমে স্থানান্তরযোগ্য হলে মধ্যবর্তী কিছু প্রক্রিয়া কমানো সম্ভব হতে পারে। বিশেষ করে সরকারি অর্থ প্রদান, আন্তঃব্যাংক লেনদেন এবং নির্দিষ্ট ধরনের বাণিজ্যিক পেমেন্টে গতি ও দক্ষতা বাড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও বলছে, CBDC দক্ষ পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং নিরাপদ ডিজিটাল মূল্য সংরক্ষণের মাধ্যম হতে পারে; তবে এর সুফল নির্ভর করবে দেশের বিদ্যমান পেমেন্ট ব্যবস্থা কতটা কার্যকর তার ওপর।

২. রেমিট্যান্সে নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি প্রবাসী আয়। আন্তর্জাতিকভাবে CBDC-এর অন্যতম বড় সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হচ্ছে cross-border payment বা সীমান্তপারের লেনদেনকে।

IMF-এর গবেষণায় বলা হয়েছে, ডিজিটাল মুদ্রা ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি সীমান্তপারের লেনদেনকে দ্রুত, সস্তা ও স্বচ্ছ করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশ যদি ভবিষ্যতে ভারত, মধ্যপ্রাচ্য, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রেমিট্যান্স-করিডরের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে পারে, তাহলে বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানো আরও সহজ ও দ্রুত করার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

৩. কর ফাঁকি ও অর্থপাচার নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে

নগদ অর্থের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো—লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রেকর্ড থাকে না। ডিজিটাল মুদ্রার ক্ষেত্রে যথাযথ আইন ও গোপনীয়তা কাঠামোর মধ্যে লেনদেনের অডিট ট্রেইল তৈরি করা সম্ভব।

ফলে কালো টাকা, ভুয়া লেনদেন, কর ফাঁকি এবং অর্থপাচার শনাক্তকরণে রাষ্ট্রের সক্ষমতা বাড়তে পারে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে—ডিজিটাল টাকা যেন নাগরিকের ব্যক্তিগত আর্থিক গোপনীয়তা ধ্বংসের হাতিয়ার না হয়। IMF-ও CBDC নকশায় privacy, cybersecurity এবং financial stability-কে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করছে।

৪. সরকারি ভাতা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা

সরকারের ভাতা, কৃষি সহায়তা, শিক্ষাবৃত্তি কিংবা দুর্যোগকালীন আর্থিক সহায়তা সরাসরি নির্দিষ্ট ব্যক্তির ডিজিটাল ওয়ালেটে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা গেলে মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ কমতে পারে।

তবে শুধু ভাতা দেওয়ার জন্য CBDC চালু করলেই বিপ্লব ঘটবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। IMF-এর সাম্প্রতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে CBDC-এর সুবিধা বিদ্যমান দ্রুত পেমেন্ট ব্যবস্থার তুলনায় কতটা বাড়তি হবে, তা নকশা ও বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করে।

তাহলে বাংলাদেশ কেন এখনও পিছিয়ে?

বাংলাদেশে CBDC চালুর পথে কয়েকটি বড় বাধা রয়েছে।

প্রথমত—সাইবার নিরাপত্তা।
একটি জাতীয় ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবস্থায় সাইবার হামলা হলে এর প্রভাব কোনো একটি ব্যাংকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; পুরো আর্থিক ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।

দ্বিতীয়ত—ব্যক্তিগত গোপনীয়তা।
কে কোথায় কত টাকা খরচ করছে—রাষ্ট্র কতটুকু দেখতে পারবে, আর নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে—এ বিষয়ে স্পষ্ট আইন প্রয়োজন।

তৃতীয়ত—ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর সম্ভাব্য চাপ।
মানুষ যদি ব্যাংক আমানত সরিয়ে বড় পরিমাণে CBDC ধরে রাখে, তাহলে ব্যাংকের আমানতভিত্তি ও ঋণ দেওয়ার সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। IMF-ও CBDC-এর কারণে ব্যাংক আমানতের ওপর প্রতিযোগিতা এবং ব্যাংকের মুনাফা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার সম্ভাব্য প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছে।

চতুর্থত—ডিজিটাল বৈষম্য।
শহর ও গ্রামের ইন্টারনেট সুবিধা, স্মার্টফোন ব্যবহার, ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পার্থক্য দূর না করলে CBDC নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি করতে পারে।

পঞ্চমত—আস্থা।
মানুষকে বোঝাতে হবে—ডিজিটাল টাকা আসলে কী, এর মূল্য কীভাবে নিশ্চিত হবে, টাকা হারালে কী হবে এবং প্রতারণার শিকার হলে প্রতিকার কোথায় পাওয়া যাবে।

ষষ্ঠত—বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট নির্ভরতা।
বাংলাদেশের মতো দেশে দুর্যোগ, বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা নেটওয়ার্ক সমস্যার সময় ডিজিটাল লেনদেন সচল রাখার জন্য offline payment ব্যবস্থা প্রয়োজন।

ডিজিটাল টাকা চালু করতে হলে কী করা উচিত?

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে হঠাৎ করে পুরো দেশে CBDC চালু না করে ধাপে ধাপে পরীক্ষামূলক বাস্তবায়ন।

প্রথম ধাপে সরকারি ভাতা ও নির্দিষ্ট সরকারি পেমেন্টে পরীক্ষামূলক ব্যবহার, দ্বিতীয় ধাপে ব্যাংক ও MFS-এর সঙ্গে আন্তঃসংযোগ, তৃতীয় ধাপে সীমিত পরিসরে সাধারণ মানুষের ব্যবহার এবং পরে সীমান্তপারের রেমিট্যান্স ও বাণিজ্যিক লেনদেনে সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।

একই সঙ্গে CBDC-তে লেনদেনের সীমা, privacy-by-design, শক্তিশালী cybersecurity, offline payment এবং ব্যাংকের আমানত সুরক্ষার ব্যবস্থা রাখা জরুরি।

উপসংহার

বাংলাদেশের জন্য ডিজিটাল কারেন্সি কোনো জাদুর কাঠি নয়। কিন্তু সঠিক নকশা, নিরাপত্তা, আইন এবং জনগণের আস্থা নিশ্চিত করা গেলে এটি বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, সরকারি ব্যয়ের স্বচ্ছতা, রেমিট্যান্স ও সীমান্তপারের পেমেন্ট ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে।

বিশ্বের অভিজ্ঞতা বলছে—CBDC চালু করলেই উন্নয়ন নিশ্চিত হয় না; বরং কীভাবে চালু করা হচ্ছে, কোন সমস্যার সমাধান করছে এবং নাগরিকের অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত হচ্ছে—সাফল্য নির্ভর করছে তার ওপর।

বাংলাদেশের সামনে তাই প্রশ্নটি শুধু “ডিজিটাল টাকা চালু হবে কি না” নয়; বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—“কীভাবে এমন ডিজিটাল টাকা তৈরি করা যায়, যা অর্থনীতিকে দ্রুত করবে কিন্তু নাগরিকের আস্থা, গোপনীয়তা ও আর্থিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকিতে ফেলবে না?”

সর্বশেষ