**পাটের পর এবার পিইটিতে ভারতের শুল্কের খড়্গ।*
*উপশিরোনাম:* বাংলাদেশি পিইটি ফিল্মে টনপ্রতি সর্বোচ্চ ২১৮ ডলার অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কের সুপারিশ।
পাটজাত পণ্যের পর এবার বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পলিইথিলিন টেরেফথালেট (পিইটি) ফিল্মের ওপর অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপের পথে এগোচ্ছে ভারত। দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ট্রেড রেমেডিজ (ডিজিটিআর) পাঁচ বছরের জন্য বাংলাদেশি পিইটি ফিল্মে টনপ্রতি সর্বোচ্চ ২১৮ ডলার শুল্ক আরোপের সুপারিশ করেছে।
ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করলে সুপারিশকৃত শুল্ক কার্যকর হবে।
খাদ্য, ওষুধ ও বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের নমনীয় প্যাকেজিংয়ে পিইটি ফিল্মের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক ও শিল্প খাতেও এ ধরনের প্লাস্টিক শিট ব্যবহৃত হয়।
ডিজিটিআরের তথ্য বলছে, ভারতে বাংলাদেশের পিইটি ফিল্ম রপ্তানি গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে যেখানে রপ্তানির পরিমাণ ছিল মাত্র ১২ টন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৭৬৩ টনে। ভারতের মোট পিইটি ফিল্ম আমদানির প্রায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ এসেছে বাংলাদেশ থেকে।
এই বাজারে বাংলাদেশের পাশাপাশি চীন ও থাইল্যান্ডও বড় সরবরাহকারী। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চীন থেকে ভারত ২৬ হাজার ৮৬ টন এবং থাইল্যান্ড থেকে ১২ হাজার ৮৭০ টন পিইটি ফিল্ম আমদানি করেছে।
২৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনে ডিজিটিআর বাংলাদেশ, চীন ও থাইল্যান্ডের পিইটি ফিল্ম আমদানিতে ডাম্পিংয়ের অভিযোগের বিষয়ে শুল্ক আরোপের সুপারিশ করেছে। বেশিরভাগ বাংলাদেশি রপ্তানিকারকের ক্ষেত্রে টনপ্রতি ২১৮ ডলার হারে শুল্ক নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তবে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানভেদে শুল্কের হার ভিন্ন হতে পারে। আকিজ বায়াক্স ফিল্মস লিমিটেডের ক্ষেত্রে টনপ্রতি ৫৮ ডলার শুল্কের সুপারিশ করা হয়েছে। তদন্তে সহযোগিতা করা বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে আকিজ এ সুবিধা পেয়েছে।
অন্যদিকে চীনা রপ্তানিকারকদের ক্ষেত্রে টনপ্রতি ৫৪ থেকে ৩৬১ ডলার এবং থাইল্যান্ডের রপ্তানিকারকদের ক্ষেত্রে ১৯৮ থেকে ৩৬৬ ডলার পর্যন্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
ডিজিটিআরের দাবি, বাংলাদেশ, চীন ও থাইল্যান্ড থেকে আমদানি করা পণ্য ডাম্পিংয়ের মাধ্যমে ভারতীয় উৎপাদকদের তুলনায় কম দামে বাজারে প্রবেশ করায় দেশটির স্থানীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ অভিযোগের ভিত্তিতেই শুল্ক আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে।
তদন্তে আকিজের উৎপাদন ব্যয়ের ভিত্তিতে পণ্যের একটি ‘স্বাভাবিক মূল্য’ নির্ধারণ করেছে ডিজিটিআর। সংস্থাটির মতে, ভারতীয় বাজারে আকিজের পণ্যের বিক্রয়মূল্য উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় কম ছিল। তবে রপ্তানি প্রণোদনার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আকিজের রপ্তানি মূল্য সমন্বয়ের আবেদন গ্রহণ করেনি সংস্থাটি। তাদের যুক্তি, ওই দাবি ভারতের বাজারে সরবরাহ করা পণ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়।
ভারতীয় তিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান—চেরিপাল পলি ফিল্মস, ইস্টার ইন্ডাস্ট্রিজ ও ভ্যাকমেট ইন্ডিয়ার আবেদনের পর ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে তদন্ত শুরু করে ডিজিটিআর। প্রথমদিকে বাংলাদেশ, চীন, থাইল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রকে তদন্তের আওতায় রাখা হলেও স্থানীয় শিল্পের অভিযোগ প্রত্যাহারের পর যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দেওয়া হয়।
তদন্তে ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত আমদানির তথ্য পর্যালোচনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত সময়কে ক্ষতির প্রভাব মূল্যায়নের জন্য বিবেচনা করা হয়েছে।
পিইটি ফিল্মে প্রস্তাবিত শুল্ক কার্যকর হলে ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে ভারতীয় আমদানিকারকদের জন্য বাংলাদেশ, চীন, থাইল্যান্ড কিংবা বিকল্প উৎস থেকে পণ্য কেনার সিদ্ধান্তেও নতুন করে হিসাব-নিকাশ করতে হতে পারে।
এর আগে বাংলাদেশি পাটজাত পণ্যে টনপ্রতি সর্বোচ্চ ৪৪৫ ডলার অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক এবং পাটে টনপ্রতি সর্বোচ্চ ১৪০ দশমিক ০৪ ডলার কাউন্টারভেইলিং শুল্ক আরোপ করেছে ভারত। এর পরপরই পিইটি ফিল্মে নতুন শুল্কের সুপারিশ দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কে নতুন করে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
মতামত দিন