• ২০২৬ অক্টোবর ০৮, বৃহস্পতিবার, ১৪৩৩ আশ্বিন ২৩
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৭:১০ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

এক ধাক্কাতেই দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে দেশের সোয়া ৬ কোটি মানুষ , প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক

  • প্রকাশিত ০৭:১০ অপরাহ্ন বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ০৮, ২০২৬
এক ধাক্কাতেই দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে দেশের সোয়া ৬ কোটি মানুষ , প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক
Time Bangla news
মোঃ মিজানুর রহমান | কুমিল্লা বুরো চিফ প্রতিনিধি | টাইম বাংলা নিউজ


বড়সড় একটি অর্থনৈতিক ধাক্কাতেই দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে দেশের প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ।

এরই মধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আয় কমে যাওয়া ও জ্বালানি সংকটের বাড়তি চাপে মানুষ। এতে গত কয়েক দশকে দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হয়েছিল, তা এখন উল্টো পথে যাচ্ছে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক।

গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে এসব চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতির গতি ধীর হয়ে আছে। এর প্রভাব পড়েছে মানুষের কাজের সুযোগ ও আয়ে। একই সময়ে নিত্যপণ্যের দামও বেশি থাকায় মানুষের জীবনযাত্রার মানে চাপ তৈরি হয়েছে।


বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২২ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা বেড়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশে উঠতে পারে।

দেশে চরম দারিদ্র্যের হারও বেড়েছে। দিনে ৩ ডলারের আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমা বিবেচনায় ২০২২ সালে চরম দারিদ্র্যের হার ছিল ৫ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়াতে পারে।

দারিদ্র্য বাড়ার পেছনে বড় কারণ গত চার বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতি। ফলে কমেছে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট। এর কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাজের সময় কমেছে, কোনো কোনো কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে। এতে নতুন কর্মসংস্থানেরও সুযোগও তৈরি হচ্ছে না। সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে শিল্প খাত।

এই দুই চাপেই গত কয়েক দশকে দারিদ্র্য কমানোর যে অগ্রগতি হয়েছিল, তা এখন আবার হুমকির মুখে।

শুধু ২০২৬ অর্থবছরেই দেশে দারিদ্র্যের হার ১ দশমিক ১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছে বলে ধারণা করছে বিশ্বব্যাংক। ২০২৫ অর্থবছরের পর নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে।

এর সঙ্গে থমকে গেছে কর্মসংস্থানও। কাজের সুযোগ কমায় সাম্প্রতিক সময়ে নারীরাই তুলনামূলক বেশি চাকরি হারিয়েছেন।

তবে শ্রমবাজারের পুরো চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়। কারণ ২০২৫ সালের পর থেকে শ্রমশক্তি জরিপের নতুন তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে কত মানুষ কাজ হারিয়েছেন বা কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি কতটা খারাপ হয়েছে, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

এ পরিস্থিতিতে এমন জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে, যাদের অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা খুবই কম।রাজস্ব ব্যবস্থার সংকট

অর্থনীতির বর্তমান সংকটের পাশাপাশি বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতার কথাও তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির মতে, সরকারি কর ও সহায়তার ব্যবস্থা দরিদ্র মানুষকে যতটা সুরক্ষা দেওয়ার কথা, বাস্তবে তা হচ্ছে না।

বিশ্বব্যাংক বলেছে, ভর্তুকি ও বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচি দরিদ্র পরিবারগুলোকে সহায়তা করে। তবে সামগ্রিক রাজস্ব ব্যবস্থা তাদের যথেষ্ট সুরক্ষা দিতে পারছে না।

২০২২ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশ্বব্যাংক দেখেছে, প্রত্যক্ষ কর ও বিভিন্ন সহায়তা বৈষম্য ও দারিদ্র্য কমায়। এতে আয়-বৈষম্য মাপার সূচক জিনি সহগ ৫২ দশমিক ৪ থেকে কমে ৫০ দশমিক ৭ হয়। দারিদ্র্যের হারও ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে নেমে আসে ১৮ দশমিক ৮ শতাংশে।

কিন্তু পরোক্ষ করের চাপ সেই সুফল অনেকটাই কমিয়ে দেয়। এতে জিনি সহগ আবার বেড়ে ৫১ দশমিক ৪ হয়। দারিদ্র্যের হারও বেড়ে দাঁড়ায় ২০ দশমিক ৬ শতাংশে।

অর্থাৎ একদিকে সরকার দরিদ্র মানুষকে সহায়তা দিচ্ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন পরোক্ষ করের মাধ্যমে তাদের কাছ থেকে সেই সহায়তার চেয়েও বেশি অর্থ তুলে নিচ্ছে। ফলে দরিদ্র পরিবারগুলো সরকারের কাছ থেকে যতটা পায়, তার চেয়ে বেশি অর্থ কর হিসেবে পরিশোধ করছে।

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রভাবের কথাও তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাংক।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আর্থিক খাত, রাজস্ব, জ্বালানি ও সরকারি বিনিয়োগে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা দেশের প্রবৃদ্ধি ও সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা কমিয়েছে।

বিশ্বব্যাংক বলেছে, ‘মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং বিশ্বজুড়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এতে এসব দুর্বলতা আরও তীব্র হয়েছে এবং অর্থনীতির ভঙ্গুরতা প্রকাশ পেয়েছে।’

যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক পণ্যের দাম, বিশেষ করে জ্বালানি ও সারের দাম বেড়েছে। এতে আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি তেল আমদানির বিল বেড়েছে ১০৭ শতাংশ। সারের আমদানি বেড়েছে ৪২ শতাংশ।

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিশেষ করে জ্বালানির আমদানি ব্যয় আরও বাড়তে পারে। এতে সরকারের ভর্তুকির ব্যয়ও বাড়বে এবং রাজস্বের ওপর চাপ তৈরি হবে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক।

জ্বালানি সংকটও দীর্ঘ হলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্প খাতের ঘুরে দাঁড়ানো বিলম্বিত হতে পারে। এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ দেশে মূল্যস্ফীতি এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে বা তার নিচে রয়েছে।

দুর্বল সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা

অর্থনৈতিক সংকটে পরিবারগুলোকে সহায়তা দিতে বাংলাদেশ জ্বালানি ও সার ভর্তুকির পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালায়। সব মিলিয়ে এগুলোই দরিদ্র মানুষের জন্য এক ধরনের সহায়তার ব্যবস্থা তৈরি করেছে।

তবে প্রতিটি ব্যবস্থারই কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার সমস্যা এখন মোট অর্থের পরিমাণ নয়। বরং বড় সমস্যা হলো প্রশাসনিক অদক্ষতা।


২০২৬ সালে ২৫টি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ৯০টি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি পরিচালনা করছে সরকার।বিশ্বব্যাংক বলেছে, এত বিস্তৃত কর্মসূচির কারণে সহায়তার গভীরতা কমেছে। সহায়তার পরিমাণ খুবই কম এবং সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের কাছে এর আওতা পৌঁছানোও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। 


সর্বশেষ