*তেল-চিনিতে বাড়তি দাম, পেঁয়াজ-ডিমেও স্বস্তি নেই।*
*উপশিরোনাম:* সরবরাহ সংকটে এমআরপির চেয়ে বেশি দামে বিক্রি | খুচরা বিক্রেতাদের অনীহায় তেলের বাজারে সংকট আরও তীব্র।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে একের পর এক বাড়তি খরচের চাপে পড়ছেন সাধারণ ক্রেতারা। সয়াবিন তেল ও চিনির সরবরাহ ঘাটতির সুযোগে নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের (এমআরপি) চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে এসব পণ্য। একই সঙ্গে ডিমের উচ্চমূল্য বহাল রয়েছে, নতুন করে বেড়েছে পেঁয়াজের দাম। সবজি, আটা ও ময়দার বাজারেও প্রত্যাশিত স্বস্তি নেই। ফলে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর সংসার চালানোর ব্যয় আরও বাড়ছে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এক কেজি প্যাকেটজাত চিনির গায়ে দাম লেখা ১১০ টাকা হলেও বিক্রি হচ্ছে ১১৫ থেকে ১২০ টাকায়। এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের নির্ধারিত দাম ২০৪ টাকা, অথচ অনেক দোকানে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে ২১০ টাকা। কোথাও বোতলজাত তেল ও প্যাকেটজাত চিনি মিলছে না; আবার কোথাও প্যাকেট খুলে খোলা অবস্থায় চিনি বিক্রি করা হচ্ছে বেশি দামে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) রাজধানীর মিরপুর, মালিবাগ ও সাভারসহ কয়েকটি খুচরা বাজার ঘুরে নিত্যপণ্যের এমন চিত্র দেখা গেছে।
*নির্ধারিত দামের বাইরে তেল-চিনি*
বাজারে ভোজ্যতেল ও চিনির সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে ক্রেতাদের অভিযোগ দীর্ঘ হচ্ছে। দোকানভেদে পণ্যের প্রাপ্যতায় যেমন পার্থক্য রয়েছে, তেমনি দামের ক্ষেত্রেও মানা হচ্ছে না নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য।
খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, পাইকারি পর্যায়ে বেশি দামে পণ্য কিনতে হওয়ায় নির্ধারিত দামে বিক্রি করলে তাঁদের লোকসানের আশঙ্কা থাকে। এ কারণে কিছু দোকানি প্যাকেটজাত চিনি বিক্রি না করে প্যাকেট খুলে খোলা চিনি হিসেবে বিক্রি করছেন।
বোতলজাত সয়াবিন তেলের সংকটের মধ্যে খোলা তেলের দামও চড়া। বর্তমানে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকায়। পাম তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০০ টাকা। ফলে বোতলজাত সয়াবিন তেলের নির্ধারিত দামের তুলনায় খোলা সয়াবিন তেল কিনতে ক্রেতাদের বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
*কম মুনাফায় তেল বিক্রিতে অনীহা*
সয়াবিন তেলের বাজারে সংকটের পেছনে সরবরাহ ঘাটতির পাশাপাশি খুচরা বিক্রেতাদের কম মুনাফার বিষয়টিও সামনে এসেছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কোম্পানিগুলো পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ করছে না। অন্যদিকে বিক্রির বিপরীতে লাভ কমে যাওয়ায় অনেক দোকানি তেল বিক্রিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
খুচরা ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রিতে ৩ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত মুনাফা থাকলেও বর্তমানে তা কমে প্রায় এক টাকায় নেমেছে।
মাদারীপুর জেনারেল স্টোরের আলামিন বলেন, পাঁচ লিটার তেলের দাম ১ হাজার ২০ টাকা। এই তেল বিক্রি করে তাঁদের লাভ হয় মাত্র পাঁচ টাকা। তাঁর দাবি, একই পরিমাণ অর্থ অন্য পণ্যে বিনিয়োগ করলে তুলনামূলক বেশি মুনাফা পাওয়া যায়। এর সঙ্গে কোম্পানির অনিয়মিত সরবরাহ যুক্ত হওয়ায় তিনি তেল বিক্রি বন্ধ রেখেছেন।
সততা স্টোরের এক বিক্রেতাও কোম্পানিগুলোর সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, এসব কারণে তাঁরা দোকানে সয়াবিন তেল রাখছেন না।
ব্যবসায়ীদের বক্তব্য অনুযায়ী, পণ্যের বিক্রয়মূল্য ও ক্রয়মূল্যের ব্যবধান খুব কম হওয়ায় তেল বিক্রি করে দোকান পরিচালনার খরচ তোলা কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে সরবরাহ সংকটের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
*পেঁয়াজের দাম বেড়েছে কেজিতে পাঁচ টাকা*
তেল-চিনির বাড়তি দামের মধ্যে পেঁয়াজের বাজারও ক্রেতাদের নতুন করে চাপে ফেলেছে। গত সপ্তাহের তুলনায় প্রতি কেজিতে প্রায় পাঁচ টাকা বেড়ে ভালো মানের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকায়।
রান্নার প্রায় প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় এই পণ্যের দাম বাড়ায় পরিবারগুলোর দৈনন্দিন খরচে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। একসঙ্গে কয়েকটি নিত্যপণ্যের দাম ও ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে।
*ডজন ডিম ১৬০ টাকা, পাড়া-মহল্লায় আরও বেশি*
ডিমের বাজারেও স্বস্তি নেই। বিভিন্ন বাজারে ফার্মের মুরগির ডিম প্রতি ডজন বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকায়। পাড়া-মহল্লার দোকানে চারটি ডিম কিনতে প্রায় ৫৫ টাকা লাগছে। সে হিসাবে এক ডজন ডিমের দাম দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১৬৫ টাকা।
স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে ডিম তুলনামূলক সাশ্রয়ী প্রাণিজ আমিষের উৎস হিসেবে পরিচিত। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ ধরে দাম বেশি থাকায় তাঁদের খাদ্যব্যয় বেড়েছে। পরিবারের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে গিয়েও বাড়তি হিসাব করতে হচ্ছে ক্রেতাদের।
*সবজি, আটা-ময়দাতেও বাড়তি খরচ*
ব্রয়লার মুরগির দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও সবজির বাজারে পুরোপুরি স্বস্তি ফেরেনি। কয়েক ধরনের সবজির দাম কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা কমেছে। তবে সামগ্রিকভাবে সবজির দাম এখনো চড়া বলে জানিয়েছেন ক্রেতারা।
এদিকে প্রতি কেজি আটা বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৬৫ টাকায়। কোম্পানিভেদে ময়দার দাম ৭০ থেকে ৮০ টাকার বেশি। বাজারসংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুই থেকে তিন সপ্তাহ আগের তুলনায় এসব পণ্যের দামও বেড়েছে।
সব মিলিয়ে সয়াবিন তেল, চিনি, ডিম ও পেঁয়াজের বাড়তি দাম এবং আটা-ময়দা ও সবজির উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের সংসার খরচে বাড়তি চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জন্য একই আয়ে প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য কেনা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বাজার পরিস্থিতিতে স্বস্তি ফেরাতে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি নিশ্চিত করা এবং সরবরাহব্যবস্থায় অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ক্রেতারা।
মতামত দিন