ভালুকায় রাম্বুটানের আকাশছোঁয়া দাম, দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ
বিদেশি ফল রাম্বুটানের প্রতি মানুষের আগ্রহ দিন দিন বাড়লেও ময়মনসিংহের ভালুকায় এর আকাশছোঁয়া দাম সাধারণ ক্রেতাদের হতাশ করছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় যেখানে প্রতি কেজি রাম্বুটান ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, সেখানে ভালুকায় একই ফল কিনতে গুনতে হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ দাম পরিশোধ করতে হচ্ছে ক্রেতাদের।
স্থানীয় বাজার ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় ভালুকায় রাম্বুটানের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। ফলে ফলটির প্রতি ব্যাপক আগ্রহ থাকলেও উচ্চমূল্যের কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকের জন্য এটি এখন প্রায় বিলাসপণ্যে পরিণত হয়েছে।
ভালুকা উপজেলার গোয়ারী এলাকায় ‘তায়েফ এগ্রো’ নামে একটি বাণিজ্যিক বাগানে বর্তমানে থোকায় থোকায় ঝুলছে আকর্ষণীয় লাল রঙের রাম্বুটান। প্রায় ২০ বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা বাগানটিতে রয়েছে তিন শতাধিক পরিণত গাছ। থাইল্যান্ডপ্রবাসী উদ্যোক্তা আশরাফ শুভ তার চাচা মামুনকে সঙ্গে নিয়ে বাগানটির পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনা করছেন। বাগান কর্তৃপক্ষ বর্তমানে প্রতি কেজি রাম্বুটান ১ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি করছেন।
তবে বাজার ঘুরে জানা গেছে, ঢাকা, গাজীপুর, টাঙ্গাইলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় একই ফল প্রতি কেজি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে ভালুকার ক্রেতাদের একই ফল কিনতে গুনতে হচ্ছে প্রায় দ্বিগুণ মূল্য। এই মূল্য পার্থক্য নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
এ বিষয়ে তায়েফ এগ্রোর উদ্যোক্তা আশরাফ শুভ বলেন, “রাম্বুটান একটি বিদেশি ও উচ্চমূল্যের ফল। বাগান প্রতিষ্ঠা, চারা সংগ্রহ, সার প্রয়োগ, সেচ ব্যবস্থা, পরিচর্যা ও শ্রমিক ব্যয়সহ উৎপাদন খরচ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। বর্তমানে ফলটির উৎপাদন সীমিত হলেও চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। সে কারণেই বাজারে এর দাম বেশি রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “রাম্বুটান চাষে দীর্ঘ সময়, নিবিড় পরিচর্যা ও বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। আমরা মানসম্পন্ন ফল উৎপাদনের মাধ্যমে ক্রেতাদের কাছে ভালো পণ্য পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি। ভবিষ্যতে দেশে বাণিজ্যিকভাবে রাম্বুটান চাষ সম্প্রসারিত হলে উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়বে, ফলে বাজারমূল্যও সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে বলে আশা করছি।”
আশরাফ শুভ জানান, দেশের আবহাওয়া ও মাটিতে সফলভাবে রাম্বুটান চাষ সম্ভব হওয়ায় নতুন উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বাড়ছে। পরিকল্পিতভাবে চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে এটি ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
উচ্চমূল্যের কারণে রাম্বুটান নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে স্থানীয় ক্রেতাদের মধ্যে। অনেকেই ফলটির স্বাদ ও পুষ্টিগুণের প্রশংসা করলেও অতিরিক্ত দামকে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
মুক্তাগাছা থেকে আসা রিপন মিয়া জানান, “রাম্বুটান দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, খেতেও তেমনি সুস্বাদু। কিন্তু প্রতি কেজি ১ হাজার ৫০০ টাকা দাম হওয়ায় পরিবারের জন্য নিয়মিত কেনা সম্ভব নয়।”
আরেক ক্রেতা জানান, “দেশের অন্য জেলায় যেখানে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় রাম্বুটান পাওয়া যায়, সেখানে ভালুকায় প্রায় দ্বিগুণ দাম দিতে হচ্ছে। সরবরাহ বাড়লে দাম কমবে এবং সাধারণ মানুষও সহজে এই ফল কিনতে পারবে।”
এদিকে, রাম্বুটান বাগানকে ঘিরে দর্শনার্থীদের ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাগানের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ বিদেশি এই ফলের বাগান দেখতে ভিড় করছেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকেই বাগানে ঘুরতে আসছেন, ছবি তুলছেন এবং রাম্বুটান সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছেন। তবে বাগানের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হলেও ফলের দাম শুনে অনেক দর্শনার্থী হতাশ হচ্ছেন। আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও উচ্চমূল্যের কারণে অনেকে রাম্বুটান না কিনেই ফিরে যাচ্ছেন।
স্থানীয়দের মতে, বাগানটি ইতোমধ্যে ভালুকার একটি নতুন আকর্ষণ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। তবে ফলটির বর্তমান মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় অধিকাংশ দর্শনার্থীর আগ্রহ কেবল দেখা ও ছবি তোলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনো কৃষিপণ্যের দাম যখন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খাদ্য ব্যয়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি হয়ে যায়, তখন সেটি ধীরে ধীরে সাধারণ ভোগ্যপণ্য থেকে বিলাসপণ্যে রূপ নেয়। বর্তমানে ভালুকায় প্রতি কেজি রাম্বুটানের দাম ১ হাজার ৫০০ টাকা হওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য ফলটি কার্যত নাগালের বাইরে চলে গেছে।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় যেখানে প্রতি কেজি রাম্বুটান ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, সেখানে ভালুকার ক্রেতাদের প্রায় দ্বিগুণ মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে স্থানীয় বাজারে মূল্য বৈষম্যের একটি চিত্রও ফুটে উঠেছে। সচেতন ভোক্তাদের মতে, উৎপাদন বৃদ্ধি ও বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে এই অস্বাভাবিক মূল্য পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে।
শুধু ফল নয়, ভালুকায় রাম্বুটানের চারার বাজারেও দেখা গেছে আকাশছোঁয়া দাম। স্থানীয়ভাবে প্রতিটি চারা প্রায় ২ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, যা সাধারণ ফলগাছের চারার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। ফলে অনেক শৌখিন বাগানপ্রেমী ও নতুন উদ্যোক্তা আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও চারা কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভবিষ্যতে লাভজনক ফল হিসেবে রাম্বুটানের সম্ভাবনা থাকায় চারার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু সীমিত সরবরাহের কারণে চারার দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। অনেকের মতে, ফলের পাশাপাশি চারার বাজারেও কৃত্রিম সংকট ও উচ্চ চাহিদার প্রভাব পড়েছে।
ভালুকা উপজেলা কৃষি বিভাগের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নূর জাহান বলেন, “বিদেশি ফল হলেও রাম্বুটান বাংলাদেশের আবহাওয়া ও মাটির সঙ্গে বেশ ভালোভাবেই খাপ খাইয়ে নিয়েছে। ফলে দেশে বাণিজ্যিকভাবে এ ফলের চাষের সম্ভাবনা দিন দিন উজ্জ্বল হয়ে উঠছে।”
তিনি আরও বলেন, “রাম্বুটান একটি উচ্চমূল্যের ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ফল। এর ব্যতিক্রমধর্মী স্বাদ, আকর্ষণীয় রঙ এবং বাজারমূল্যের কারণে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের মধ্যেও আগ্রহ বাড়ছে। ফলটিতে প্রচুর ভিটামিন-সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।”
নূর জাহান জানান, রাম্বুটানের মোটা ও শক্ত খোসা থাকায় এটি তুলনামূলক দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা সম্ভব। ফলে স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও সহজে পরিবহন ও বাজারজাত করা যায়। পরিকল্পিতভাবে চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে ভবিষ্যতে রাম্বুটান দেশের একটি সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
স্থানীয়দের দাবি, ফল ও চারার উভয় ক্ষেত্রেই উৎপাদন এবং সরবরাহ বৃদ্ধি করা গেলে বাজারে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে, দাম কমবে এবং বিদেশি এই সুস্বাদু ফলটি ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে চলে আসবে। বর্তমানে রাম্বুটান যতটা তার স্বাদ ও সৌন্দর্যের জন্য আলোচিত, তার চেয়েও বেশি আলোচনায় রয়েছে এর আকাশছোঁয়া মূল্য।
মতামত দিন