সিএনজির দাম বাড়ানোর প্রস্তাব পেট্রোবাংলার, বিদ্যুৎ উৎপাদনের গ্যাসেও বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির ভাবনা
দেশে চলমান গ্যাস সংকটের মধ্যেই যানবাহনে ব্যবহৃত সিএনজি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে পাঠিয়েছে পেট্রোবাংলা। প্রস্তাব অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ১৫ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২৫ টাকা এবং যানবাহনে ব্যবহৃত সিএনজির মূল্য প্রায় ৬৫ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
তবে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান জানিয়েছেন, মূলত সিএনজি স্টেশন মালিকদের দীর্ঘদিনের মার্জিন বৃদ্ধির দাবির বিষয়টি বিবেচনার জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, এটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয় এবং গ্যাসের দাম বাড়ানোর বিষয়ে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
বর্তমানে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামে সিএনজি গ্রাহকশ্রেণিতে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের মূল্য ৩৮ টাকা। স্টেশন মালিকদের কমিশনসহ পাম্পে বিক্রি হচ্ছে ৪৩ টাকায়। প্রস্তাব কার্যকর হলে এই মূল্য বেড়ে প্রায় ৬৫ টাকায় পৌঁছাতে পারে, যা বর্তমান দামের তুলনায় প্রায় ৫১ শতাংশ বেশি।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হলে বর্তমান মূল্যের তুলনায় প্রায় ৬১ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি সমস্যার কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সংকট তীব্র হয়েছে। এর প্রভাবে আবাসিক গ্রাহকদের রান্নার কাজে বিঘ্ন ঘটছে, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ যানজট ও অপেক্ষার সৃষ্টি হয়েছে।
পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া এবং আমদানি করা এলএনজির ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের গড় ক্রয়মূল্য ছিল ৩১ টাকা ৬৫ পয়সা, অথচ বিক্রি করা হয়েছে গড়ে ২৩ টাকা ৬৩ পয়সায়। ফলে প্রতি ঘনমিটারে ৮ টাকার বেশি লোকসান গুনতে হয়েছে সংস্থাটিকে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে এলএনজির আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য বেড়ে যাওয়ায় বছরের শেষ প্রান্তিকে গ্যাস আমদানির ব্যয় আরও বৃদ্ধি পায়। পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, গত অর্থবছরে তাদের মোট আর্থিক ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যার বিপরীতে সরকার প্রায় ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে।
এদিকে তিতাস, বাখরাবাদ, কর্ণফুলী, জালালাবাদ, পশ্চিমাঞ্চল ও সুন্দরবন গ্যাস বিতরণ কোম্পানিও বিতরণ মাশুল বাড়ানোর আবেদন করেছে। তাদের দাবি, বর্তমান মাশুলে পরিচালন ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
পেট্রোবাংলার তথ্য বলছে, একসময় দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক প্রায় ২৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হলেও বর্তমানে তা কমে প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে দেশে এলএনজিনির্ভরতা দ্রুত বাড়ছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৭০ শতাংশই আমদানিনির্ভর হতে পারে।
তবে পেট্রোবাংলার প্রস্তাব পাঠানো হলেও এটি এখনই কার্যকর হচ্ছে না। গ্যাসের দাম পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে আনুষ্ঠানিক আবেদন করতে হবে। কমিশন আর্থিক বিশ্লেষণ, গণশুনানি ও প্রয়োজনীয় যাচাই শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
মতামত দিন