সবজির বাজারে কিছুটা স্বস্তি, তেল-চিনি-আটা ও ডিমের দামে অস্বস্তি
রাজধানীর বাজারে কয়েক ধরনের সবজির দাম কমায় ক্রেতাদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে ভোজ্যতেল, চিনি, আটা-ময়দা ও ডিমের বাড়তি দামে সেই স্বস্তি খুব একটা টেকসই হচ্ছে না। বিশেষ করে চিনি ও বোতলজাত ভোজ্যতেলের সরবরাহে ঘাটতির অভিযোগ থাকায় বাজারে তৈরি হয়েছে নতুন করে অস্থিরতা।
গতকাল রাজধানীর মিরপুর-৬, দুয়ারীপাড়া, পল্লবী ও মিরপুর-১ এলাকার কয়েকটি বাজার ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। বাজারভেদে একই পণ্যের দামে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত পার্থক্য দেখা গেছে। সবজির সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও বেশ কিছু সবজি এখনো তুলনামূলক চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে।
বাড়ছে চিনি ও ময়দার দাম
খুচরা বাজারে বর্তমানে প্যাকেটজাত ময়দা প্রতি কেজি ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। দুই থেকে তিন সপ্তাহ আগেও এর দাম ছিল প্রায় ৭০ টাকা। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছে। দুই কেজির প্যাকেটের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যও ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা হয়েছে।
চিনির বাজারেও একই ধরনের চাপ দেখা গেছে। বাজারে প্রতি কেজি চিনি ১২০ থেকে ১২৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে প্রায় ১০ টাকা বেড়েছে। প্যাকেটজাত চিনির সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১১০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২০ টাকা করা হয়েছে।
দুয়ারীপাড়া বাজারের এক বিক্রেতা বলেন, কয়েক দিনের মধ্যে ৫০ কেজির এক বস্তা চিনির দাম ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। দাম বাড়ার পাশাপাশি সরবরাহও কমেছে। ফলে অনেক দোকানে চাহিদা অনুযায়ী চিনি পাওয়া যাচ্ছে না। ক্রেতাদের একাধিক দোকান ঘুরে পণ্য সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, মিলগেট ও পাইকারি বাজারে চিনির দাম বাড়ায় তার প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে। একই সঙ্গে মিল পর্যায় থেকে আগের তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে চাপ আরও বেড়েছে।
বোতলজাত তেল নিয়ে সরবরাহ সংকট
ভোজ্যতেলের বাজারেও অস্থিরতা রয়েছে। খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকা এবং পাম তেল ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটার ২০০ টাকা।
তবে নির্ধারিত দামে বোতলজাত তেল কিনতে গিয়ে অনেক ক্রেতাকে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ, বাজারে বোতলজাত তেলের সরবরাহ আগের তুলনায় কমেছে। তাদের ধারণা, দাম বাড়ানোর প্রস্তুতি হিসেবে কোম্পানিগুলো সরবরাহ কমিয়ে থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে কোম্পানিগুলোর বক্তব্য জানা যায়নি।
কমেছে কিছু সবজির দাম
অন্যদিকে কয়েক সপ্তাহ আগের তুলনায় সবজির বাজারে কিছুটা স্বস্তি দেখা গেছে। সরবরাহ বাড়ায় বেশ কিছু সবজির দাম কমেছে। তবে সব ধরনের সবজি সস্তা হয়নি।
বর্তমানে সাধারণ বেগুন, করলা, বরবটি, ঢেঁড়স, পটোল ও কাঁকরোলের মতো সবজি ৮০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। শসা ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি হলেও দেশি শসার দাম ৮০ থেকে ১০০ টাকা।
আগাম শীতকালীন সবজি শিম এখনো চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি শিমের দাম ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। পেঁপে তুলনামূলক কম, প্রায় ৩০ টাকা কেজি। লম্বা বেগুন ১০০, গোল বেগুন ১২০ এবং টমেটো ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া বরবটি, ঝিঙে ও করলা ৮০ টাকা, লাউ প্রতি পিস ৫০ থেকে ৭০ টাকা এবং কচুরমুখি ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
কাঁচা মরিচে বড় স্বস্তি
সবজির মধ্যে সবচেয়ে বেশি কমেছে কাঁচা মরিচের দাম। কয়েক সপ্তাহ আগে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচের দাম ৪০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। বর্তমানে সরবরাহ বাড়ায় মানভেদে ৮০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। কাওরানবাজারে পাইকারি দাম ৬০ থেকে ৭০ টাকা।
ব্যবসায়ীরা জানান, ভারত থেকে কাঁচা মরিচ আমদানির সুযোগ দেওয়ার পর বাজারে সরবরাহ বেড়েছে। এর ফলে কয়েক দিনের মধ্যেই দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
পেঁয়াজের বাজার অবশ্য প্রায় স্থির রয়েছে। মানভেদে প্রতি কেজি ৫৫ থেকে ৬০ টাকা এবং আলু ২৫ থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কোথাও কোথাও ভ্যানে পাঁচ কেজি আলু ১০০ টাকাতেও বিক্রি করতে দেখা গেছে।
ডিমের দামে স্বস্তি নেই
সবজিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও ডিমের বাজারে পরিস্থিতি বদলায়নি। বর্তমানে প্রতি ডজন ডিম ১৫০ টাকা এবং চারটি ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কোনো কোনো এলাকার দোকানে ডজনপ্রতি ১৬০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।
বিক্রেতাদের দাবি, খামার পর্যায়ে ডিমের সরবরাহ ও বর্তমান বাজারদর বিবেচনায় ১৫০ টাকার নিচে ডজন বিক্রি করা কঠিন।
মুরগির দামও প্রায় অপরিবর্তিত। ব্রয়লার ১৮০ থেকে ২০০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
মাছের বাজারও চড়া
মাছের বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি। বাজার ও মাছের ধরনভেদে কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত দামের পার্থক্য রয়েছে।
তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৬০, পাঙাস ২৩০ থেকে ২৫০, রুই-কাতল ৩৮০ থেকে ৪২০ এবং চিংড়ি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০, বড় রুই ৪৫০ থেকে ৫০০, ট্যাংরা প্রায় ৭০০ এবং ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা কেজি।
এ ছাড়া মিগেল ২৫০ থেকে ৩০০, দেশি কই ৭০০ থেকে ৮০০, চাষের কই ৩০০, বাইন ৬০০ থেকে ৮০০ এবং পোয়া প্রায় ২৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। শোল, রূপচাঁদা ও নদীর বেলে মাছের দাম কেজিতে ১ হাজার টাকারও বেশি।
চাষের শিং আকারভেদে ৩০০ থেকে ৪৫০ এবং মাঝারি রুই ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সইল মাছের দাম প্রায় ৭০০ টাকা।
সবজির দাম কমলেও কমেনি বাজার খরচ
ক্রেতাদের মতে, কিছু সবজির দাম কমায় বাজারে সামান্য স্বস্তি এলেও সার্বিকভাবে সংসারের খরচ কমেনি। বরং তেল, চিনি, আটা-ময়দা ও ডিমের বাড়তি দামে মাসিক ব্যয় আরও বেড়েছে।
মিরপুর-৬ বাজারের ক্রেতা আনোয়ার হোসেন বলেন, বেগুন ১০০ টাকা, করলা ৮০ টাকা ও ছোট একটি লাউ ৬০ টাকা দিয়ে কিনেছেন। এক পোয়া কাঁচা মরিচ কিনেছেন ৩০ টাকায়। তার অভিযোগ, প্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দামই বেশি হওয়ায় পরিবারের চাহিদা অনুযায়ী বাজার করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিক্রেতারা বলছেন, সবজির দাম মূলত সরবরাহের ওপর নির্ভর করে। অতিবৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে কোথাও কোথাও উৎপাদন ও পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় কিছু সবজির দাম এখনো বেশি। সরবরাহ স্বাভাবিক হলে দাম আরও কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
মাছ ব্যবসায়ীদেরও দাবি, সরবরাহ ও চাহিদার ওপর ভিত্তি করেই মাছের দাম প্রতিনিয়ত ওঠানামা করে। সরবরাহ বাড়লে দাম কমে এবং ক্রেতার চাপ বাড়লে দামও বাড়ে। এমনকি একই দিনে সকাল ও বিকেলেও কোনো কোনো মাছের দামে পার্থক্য দেখা যায়।
মতামত দিন