দুধের বাজারে নতুন হিসাব: দাম বাড়ল, চাহিদাও ছাড়িয়ে যাচ্ছে উৎপাদন
উৎপাদন বাড়লেও পূরণ হচ্ছে না পুরো চাহিদা, মান নিয়ন্ত্রণে জোর দিচ্ছে সরকার
নিজস্ব প্রতিবেদক: ব্যুরো চিপ দিনাজপুর রুহুল আমিন
বাংলাদেশে দুধের উৎপাদন গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও দেশের মোট চাহিদা পুরোপুরি মেটানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও বাজারে দুধের দাম বাড়ার বিষয়টি। ফলে একদিকে খামারির উৎপাদন খরচ, অন্যদিকে ভোক্তার ব্যয়—দুই দিকেই চাপ তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ১৬ দশমিক ২০ মিলিয়ন টন দুধ উৎপাদন হচ্ছে। বিপরীতে বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১৬ দশমিক ২৩ মিলিয়ন টন। অর্থাৎ উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে সামান্য ঘাটতি রয়েছে।
এদিকে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাংলাদেশ মিল্ক প্রডিউসার্স কো-অপারেটিভ ইউনিয়ন লিমিটেড—মিল্ক ভিটা—সম্প্রতি তরল দুধের দাম বাড়িয়েছে। নতুন দামে এক লিটার পাস্তুরিত দুধের প্যাকেট ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১১০ টাকা হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষকদের কাছ থেকে সংগৃহীত প্রতি লিটার দুধের দামও বাড়িয়ে ৫৩ টাকা করা হয়েছে, যেখানে ন্যূনতম ৪ শতাংশ ফ্যাট থাকার শর্ত রয়েছে।
মিল্ক ভিটার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দুধ সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণসহ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণেই দাম সমন্বয় করা হয়েছে। তবে বাজারে দুধের দাম বাড়ায় সাধারণ ভোক্তাদের ওপরও অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ পড়ছে।
দুধের মান নিয়ে নজরদারি
শুধু উৎপাদন ও দাম নয়, দুধের নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণ নিয়েও সরকার নতুন করে গুরুত্ব দিচ্ছে। খাদ্যে ভেজাল শনাক্ত করতে দেশের ৬৪ জেলায় মোবাইল ল্যাবরেটরি ভ্যান চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব ভ্যানে বাজার, জেলা, উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়েই বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের নমুনা দ্রুত পরীক্ষা করার ব্যবস্থা থাকবে।
বর্তমানে দেশের আট বিভাগীয় শহরে আটটি মোবাইল ল্যাবরেটরি ভ্যান দুধ, ঘি, সবজি ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের তাৎক্ষণিক পরীক্ষা করছে। সরকার প্রতিটি জেলার জন্য একটি করে আরও ৬৪টি মোবাইল ল্যাবরেটরি ভ্যান সংগ্রহের পরিকল্পনা জানিয়েছে।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ উৎপাদন বাড়ানো
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের সঙ্গে দুধের চাহিদাও বাড়ছে। তাই শুধু বর্তমান ঘাটতি পূরণ নয়, ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে গবাদিপশুর খাদ্য, উন্নত জাত, পশু চিকিৎসা, দুধ সংগ্রহ ও সংরক্ষণব্যবস্থা এবং বাজারজাতকরণ অবকাঠামোর উন্নয়ন প্রয়োজন।
দুগ্ধ খাতের সাম্প্রতিক গবেষণাতেও উৎপাদন বাড়াতে খামারিদের প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সম্পদ, বাজার অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং পরিবহন ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের দুধের বাজার এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে উৎপাদন বাড়ানো, খামারির ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা, ভোক্তার জন্য সহনীয় মূল্য রাখা এবং দুধের মান নিশ্চিত করা—চারটি বিষয়কেই একই সঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে।
মতামত দিন