*৫০ টাকার গাছ ৪০০ টাকায়, এক মাসেই মরে যায়।*
*উপশিরোনাম:* বৃক্ষরোপণে ব্যয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন, টেকসই পরিচর্যার অভাবে নষ্ট হচ্ছে চারাগাছ ।
সিরাজগঞ্জে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে একদিকে বাজারদরের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি ব্যয়ের হিসাব, অন্যদিকে রোপণের পরই চারার মৃত্যু। উধুনিয়া ইউনিয়নে ৪৬৯টি গাছ লাগাতে বরাদ্দ দেখানো হয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। এতে গাছপ্রতি ব্যয় প্রায় ৪০০ টাকা। অথচ স্থানীয় নার্সারিতে একই ধরনের চারা মিলছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। শুধু তাই নয়, যে ব্যয়ের মধ্যে পরিচর্যা ও সুরক্ষার খরচ থাকার কথা, মাঠে তারও দৃশ্যমান চিত্র নেই।
সরকারি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল পরিবেশ রক্ষা ও সড়কের পাশে সবুজায়ন। কিন্তু সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার কয়েকটি এলাকায় কর্মসূচির বাস্তবায়ন নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। রোপণের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শুকিয়ে যাচ্ছে চারা। কোথাও বাঁশের খুঁটি নেই, কোথাও নেই বেড়া। নিয়মিত পানি দেওয়ার ব্যবস্থারও দেখা মিলছে না।
উধুনিয়া ইউনিয়নের বাংলাপাড়া সড়কে সরেজমিনে দেখা যায়, কর্মসূচির আওতায় লাগানো প্রায় ২০০ চারার মধ্যে অন্তত ৫০টি ইতোমধ্যে মারা গেছে। আরও কয়েকটি রয়েছে মুমূর্ষু অবস্থায়। অনেক চারা শুকিয়ে গেছে; কিছু আবার হেলে পড়েছে বা মাটিতে পড়ে আছে।
চারাগুলোর আশপাশে নিয়মিত পানি দেওয়ার কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা পাওয়া যায়নি। গবাদিপশু কিংবা মানুষের চলাচল থেকে সুরক্ষার জন্য অধিকাংশ চারার পাশে বাঁশের খুঁটি বা বেড়াও নেই।
বাজারে ৫০ টাকা, সরকারি হিসাবে প্রায় ৪০০
উধুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের নথি অনুযায়ী, ৪৬৯টি গাছ রোপণের জন্য বরাদ্দ ১ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি গাছের পেছনে ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৩৯৯ টাকা।
স্থানীয় একাধিক নার্সারি মালিকের ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট প্রজাতির চারা ৫০ থেকে ৬০ টাকার মধ্যেই বিক্রি হয়। ফলে শুধু চারার মূল্য বিবেচনায় নিলেও সরকারি হিসাব ও বাজারদরের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়।
অবশ্য ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা শামসুল আলমের বক্তব্য, ওই অর্থ শুধু চারা কেনার জন্য নয়। রোপণ, বাঁশের খুঁটি ও পরিচর্যাসহ বিভিন্ন ব্যয় হিসাবের মধ্যে রয়েছে।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উপজেলা এলজিইডি কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী আলমগীর হোসেন প্রকল্পের ব্যয়ের প্রাক্কলন তৈরি করেছেন।
তবে পাশের একটি ইউনিয়নের হিসাব আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন। রায়গঞ্জ উপজেলার ঘুড়কা ইউনিয়নে ১ হাজার ৮০০টি গাছ লাগানো হয়েছে। সেখানে গাছপ্রতি ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ টাকা বলে জানিয়েছেন ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মিজানুর রহমান।
একই কর্মসূচিতে দুই ইউনিয়নে গাছপ্রতি ব্যয়ের এমন বড় পার্থক্যই প্রশ্ন তুলছে বরাদ্দ নির্ধারণ ও ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে।
*কাগজে পরিচর্যা, মাঠে নেই*
এলজিইডির উল্লাপাড়া উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ জানান, বৃক্ষরোপণের প্রাক্কলনে চারা, রোপণ, বেড়া এবং পরিচর্যার খরচ রাখা হয়েছে।
কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা প্রশাসক ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল কাদের বিশ্বাসের বক্তব্য ভিন্ন। তার দাবি, গাছ লাগানোর জন্য অর্থ থাকলেও পরিচর্যা ও আনুষঙ্গিক ব্যয়ের জন্য কোনো বরাদ্দ নেই। ফলে রোপণের পর চারাগুলোর নিয়মিত পরিচর্যা করা হয়নি।
দুই পক্ষের বক্তব্যের এই পার্থক্যই প্রকল্পের ব্যয় কাঠামো ও বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
*প্রকল্পের সভাপতি জানেন না ব্যয়ের তথ্য*
উধুনিয়া ইউনিয়নের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সভাপতি করা হয়েছে ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য বিউটি খাতুনকে। তিনি অসুস্থ থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তার স্বামী মঈনুল হোসেন জানান, স্ত্রীকে প্রকল্পের সভাপতি করা হলেও কোথা থেকে চারা কেনা হয়েছে কিংবা কত টাকা ব্যয় হয়েছে—এসব বিষয়ে তাদের জানানো হয়নি।
এদিকে প্রকল্পের ব্যয় প্রাক্কলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপসহকারী প্রকৌশলী আলমগীর হোসেনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
*দায় কার, প্রশ্ন মাঠপর্যায়ে*
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রোপণের পর চারাগুলোর পরিচর্যা ও সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে সরকারি অর্থ ব্যয় করে লাগানো গাছের একটি অংশ অল্প সময়ের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
উল্লাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রায়হানুল ইসলাম বলেন, চারাগুলোর পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং প্রশাসক বা চেয়ারম্যানের। দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সাধারণ) গণপতি রায় বলেন, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি এখনও চলমান। জেলার বিভিন্ন স্থানে সরকারি দফতর ও ইউনিয়ন পর্যায়ে গাছ লাগানো হচ্ছে। সব জায়গায় গাছ মারা যাচ্ছে—এমন নয়। তবে ইউনিয়ন পর্যায়ে নজরদারি আরও বাড়ানো হবে।
*প্রশ্ন এখন তিনটি*
বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির এই চিত্রে মূল প্রশ্ন উঠছে—বাজারে ৫০-৬০ টাকার চারা কিনতে গাছপ্রতি প্রায় ৪০০ টাকা কেন ব্যয় দেখানো হলো? হিসাবের মধ্যে পরিচর্যার অর্থ থাকলে মাঠে তার বাস্তব প্রয়োগ কোথায়? আর রোপণের এক মাসের মধ্যেই মারা যাওয়া চারাগুলোর দায় নেবে কে?
সরকারি অর্থে শুধু চারা রোপণ করাই যদি কর্মসূচির সাফল্যের মাপকাঠি হয়, তাহলে বরাদ্দের অর্থ ব্যয় হলেও কাঙ্ক্ষিত সবুজায়ন কতটা টেকসই হবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
মতামত দিন