• ২০২৬ অক্টোবর ১৬, শুক্রবার, ১৪৩৩ আশ্বিন ৩০
  • সর্বশেষ আপডেট : ০২:১০ পূর্বাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

ওকালতি পেশায় প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫: ক্ষোভ, হতাশা ও কাঠামোগত সংকটে তরুণ আইনজীবীরা

  • প্রকাশিত ০২:১০ পূর্বাহ্ন শুক্রবার, অক্টোবর ১৬, ২০২৬
ওকালতি পেশায় প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫: ক্ষোভ, হতাশা ও কাঠামোগত সংকটে তরুণ আইনজীবীরা
Time Bangla news
তানিয়া আক্তার রানু (নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি ঢাকা):

ওকালতি পেশায় প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫: ক্ষোভ, হতাশা ও কাঠামোগত সংকটে তরুণ আইনজীবীরা

​বিশেষ প্রতিবেদক | ঢাকা

​বাংলাদেশের আইন পেশায় প্রবেশ ও টেকসই ক্যারিয়ার গড়া নিয়ে তরুণ ও শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের মাঝে দিন দিন ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়ছে। সম্প্রতি বার কাউন্সিল অ্যাডভোকেটশিপ পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩৫ বছর নির্ধারণের সিদ্ধান্তের পর এই ক্ষোভ নতুন মাত্রা রূপ নিয়েছে। সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা ২০৩০ সাল থেকে নির্ধারিত হলেও, দেশের সার্বিক বেকারত্ব ও আইন পেশার কাঠামোগত বাস্তবতায় এই নিয়ম কতটা যৌক্তিক—তা নিয়ে আইনজীবীদের ভেতরেই তৈরি হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক।

​বয়সসীমার সিদ্ধান্ত ও বিশ্ব প্রেক্ষাপট

​একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির আইনজীবীদের 'লিভ টু আপিল'-এর ভিত্তিতে উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তের আলোকে ওকালতিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়স ৩৫ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই স্বাধীন পেশা হিসেবে ওকালতিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে এমন কোনো নির্দিষ্ট বয়সসীমা দেখা যায় না।

​যে পেশায় কোনো সরকার নির্ধারিত বেতন-ভাতা বা নির্দিষ্ট সামাজিক নিরাপত্তা নেই, সেখানে প্রবেশাধিকার সীমিত করাকে দেশের বহু তরুণ আইনগ্র্যাজুয়েট "অযৌক্তিক ও আত্মঘাতী" সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন। যেখানে সরকারি চাকরির বয়সসীমা নিয়ে দেশজুড়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে, সেখানে একটি স্বাধীন প্রফেশনে প্রবেশের পথ রুদ্ধ করা তরুণদের ভবিষ্যৎকে চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

​অ্যাডভোকেটশিপের দীর্ঘ ও জটিল পথ

​একজন শিক্ষার্থী আইন পাস করার পর আইনজীবী সনদ পাওয়া পর্যন্ত যে দীর্ঘ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যান, তা অত্যন্ত ধাপে ধাপে ও ব্যয়বহুল:

​শিক্ষানবিশ ও অপেক্ষা: এলএলবি ডিগ্রি অর্জনের পর বার কাউন্সিলে ইন্টিমেশন জমা দিয়ে অন্তত ৬ মাস জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর অধীনে শিক্ষানবিশ হিসেবে আদালত অঙ্গনে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়। এরপর প্রিলিমিনারি পরীক্ষার জন্য মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়।

​৩ ধাপের কঠোর পরীক্ষা: বিসিএস পরীক্ষার মতো এমসিকিউ, লিখিত ও ভাইভা—এই তিন ধাপে পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হতে হয়। পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ফি প্রদান এবং বারবার জেলা শহর থেকে ঢাকায় আসা-যাওয়ার অর্থনৈতিক চাপ বহন করতে হয় শিক্ষার্থীকেই।

​লাইসেন্স ও সদস্যপদ ফি: চূড়ান্তভাবে পাস করার পরও নিজের খরচে বার কাউন্সিলের লাইসেন্স নেওয়া এবং স্থানীয় বার অ্যাসোসিয়েশনের মোটা অংকের মেম্বারশিপ ফি প্রদান করতে হয়।

​বার্ষিক ডিউস: নিয়মিত আয় থাকুক বা না থাকুক, প্রতি বছর বার অ্যাসোসিয়েশনের নির্দিষ্ট অংকের ফি বা ডিউস পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক।

​পেশাগত অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও দৃষ্টিভঙ্গির সংকট

​প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আইন অঙ্গনের ভেতরের কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের চিত্র। জ্যেষ্ঠ বা প্রতিষ্ঠিত আইনজীবীদের একটি অংশের মধ্যে নতুনদের আগমন ঠেকাতে চাওয়ার এক ধরনের অপ্রকাশিত মানসিকতা কাজ করে। অনেকেই মনে করেন, নতুন আইনজীবী বাড়লে আয়ের সুযোগ বা 'রিজিক' কমে যাবে—যদিও আইনজীবীদের বড় একটি অংশ মনে করেন রিজিক আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত এবং এটি দক্ষতা নির্ভর।

​পাশাপাশি, বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক এক ধরনের পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়িও এই পেশার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে:

​জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বনাম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়:

একদল মনে করেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পড়ালেখায় এগিয়ে, অন্যদিকে জাতীয় বিশ্ববিদালয়ের শিক্ষার্থীরা অনার্স বা ডিগ্রি শেষ করে ২ বছরের এলএলবি পড়ার কারণে তুলনামূলকভাবে বয়সে পরিণত ও অভিজ্ঞ। কিন্তু পারস্পরিক এই শ্রদ্ধাবোধের অভাব ও দৃষ্টিভঙ্গির সংকটে মূল পেশাগত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

​আসল সমস্যা বাদ দিয়ে গৌণ বিষয়ে মনোযোগ?

​আইন অঙ্গনের বিশিষ্টজন ও ক্ষুব্ধ তরুণদের মতে, বার কাউন্সিলের বিদ্যমান রুলস অ্যান্ড রেগুলেশন সঠিকভাবে প্রয়োগ না করে কিংবা নবীন আইনজীবীদের প্রাথমিক আর্থিক ও পেশাগত সুরক্ষার কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা না করে, বয়সের মতো গৌণ বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে।

​যে পেশায় টিকে থাকার মূল শর্তই হলো ধৈর্য, নিয়মিত অনুশীলন, নিষ্ঠা ও কঠোর পরিশ্রম—সেখানে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থকেন্দ্রিক টানাফোড়েন না করে কাঠামোগত সংস্কার জোরদার করা উচিত। হাজার হাজার এলএলবি ডিগ্রিধারীর বেকারত্ব নিরসন এবং আইন শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করাই এই মুহূর্তের প্রধান দাবি।

সর্বশেষ