*উৎপাদনে নতুন রেকর্ড, পেঁয়াজের বাজারে স্বস্তির সম্ভাবনা।*
*উপশিরোনাম:* উৎপাদন বৃদ্ধি ও আমদানি নির্ভরতা কমায় বদলাচ্ছে বাজারের চিত্র; স্থানীয় চাহিদা পূরণে স্বস্তির পথে পেঁয়াজ খাত।
একসময় বছরের শেষ তিন মাসে পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতা ছিল প্রায় নিয়মিত ঘটনা। দেশীয় উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দেওয়ায় অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আমদানির ওপর নির্ভর করতে হতো বাংলাদেশকে। বিশেষ করে ভারত থেকে সরবরাহ বন্ধ বা সীমিত হলেই লাফিয়ে বাড়ত দাম। তবে এবার সেই চিত্রে পরিবর্তনের আভাস মিলছে। উৎপাদনে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি, আমদানি হ্রাস এবং সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগে পেঁয়াজের বাজারে তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, গত পাঁচ বছরে দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন বেড়েছে ৫১ দশমিক ৩১ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরে যেখানে উৎপাদন ছিল ২৫ লাখ ১৭ হাজার টন, সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৩৮ লাখ ১৯ হাজার ৫৩০ টনে। শুধু এক অর্থবছরেই উৎপাদন বেড়েছে ১৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
উৎপাদনের এই অগ্রগতির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে আমদানির পরিসংখ্যানেও। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ আমদানি হয়েছিল ৬ লাখ ২ হাজার ২৯ টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় প্রায় ৪ লাখ ৭৪ হাজার টনে। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানি নেমে আসে মাত্র ৮৬ হাজার ৩৯৮ টনে। চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত আমদানির প্রয়োজন হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
কৃষক ও কৃষিবিদদের মতে, অনুকূল আবহাওয়া, রোগবালাইয়ের প্রকোপ কম থাকা, কৃষি বিভাগের তদারকি এবং সংরক্ষণব্যবস্থার উন্নয়নে এবার পেঁয়াজের উৎপাদন ভালো হয়েছে। পাশাপাশি কৃষকেরা তুলনামূলক লাভজনক দাম পাওয়ায় চাষাবাদেও আগ্রহ বেড়েছে।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নাসির-উদ-দৌলা বলেন, এবার পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে রয়েছে দেশ। বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় দামও স্থিতিশীল রয়েছে।
তবে উৎপাদন বাড়লেই পেঁয়াজে পুরোপুরি স্বয়ংসম্পূর্ণতা নিশ্চিত হবে, এমনটি মনে করছেন না কৃষি খাতের বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, দেশের প্রকৃত চাহিদা, বীজ হিসেবে ব্যবহার, সংরক্ষণ ও পরিবহনজনিত অপচয় এবং মৌসুমভিত্তিক সরবরাহের হিসাবও বিবেচনায় নিতে হবে।
খাতসংশ্লিষ্টদের ধারণা, দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা প্রায় ৩০ লাখ টন। তবে সংরক্ষণ ও পরিবহনে অপচয় যুক্ত হলে প্রয়োজন দাঁড়ায় ৩৫ থেকে ৩৬ লাখ টনে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে সংগ্রহ-পরবর্তী পেঁয়াজের অপচয়ের হার ২৫ শতাংশের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ উৎপাদিত পেঁয়াজের বড় একটি অংশ সংরক্ষণের দুর্বলতার কারণে ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হচ্ছে।
এ সমস্যা কাটাতে সংরক্ষণ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কৃষক পর্যায়ে পেঁয়াজের পচন ও ওজন কমে যাওয়ার হার নিয়ন্ত্রণে এয়ার ফ্লো মেশিন বিতরণ করা হচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চার হাজার মেশিন বিতরণ করা হয়। পরবর্তী অর্থবছরে দুই কিস্তিতে আরও ১৯ হাজার এবং অন্যান্য কর্মসূচির আওতায় ৩ হাজার ৭০০টি মেশিন সরবরাহ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে বিতরণ করা হয়েছে ২৭ হাজার ৭০০টি মেশিন। এতে পেঁয়াজ সংরক্ষণের সক্ষমতা বেড়েছে প্রায় তিন লাখ টন।
এ ছাড়া সরকারি উদ্যোগে পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য ৯ শতাধিক স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। চলতি বছর দেশে সংরক্ষিত পেঁয়াজের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৭৮ হাজার ২৭৪ টনে।
সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে না পারায় দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। নতুন এয়ার ফ্লো প্রযুক্তিতে আট থেকে নয় মাস পর্যন্ত পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা সম্ভব হলে দেশ পুরোপুরি স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে বাজার স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে উৎপাদনের পাশাপাশি আমদানি নীতির ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদন মৌসুমে অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে দাম উৎপাদন খরচের নিচে নেমে গেলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন। অন্যদিকে মৌসুমের শেষ দিকে দেশীয় সরবরাহ কমে গেলে ভোক্তাকে বাড়তি দামে পেঁয়াজ কিনতে হয়। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী আমদানি এবং দেশীয় উৎপাদন সুরক্ষার মধ্যে সমন্বয় জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পেঁয়াজ উৎপাদনে বাংলাদেশের অগ্রগতি আমদানিনির্ভরতা কমানোর বড় সুযোগ তৈরি করেছে। এখন উৎপাদনের সঠিক পরিসংখ্যান প্রকাশ, আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা সম্প্রসারণ, অপচয় রোধ এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাই প্রধান চ্যালেঞ্জ। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে পেঁয়াজের বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আসবে। একই সঙ্গে কৃষক ও ভোক্তা উভয়ই উৎপাদন বৃদ্ধির সুফল পাবেন।
মতামত দিন