১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের প্রথম অমর একুশে ফেব্রুয়ারি। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমন্ত্রণে প্রথমবারের মতো মুক্ত বাংলাদেশে পা রাখেন বিশ্বচলচ্চিত্রের প্রবাদপুরুষ সত্যজিৎ রায়।
ফ্লাইট বিলম্বিত হওয়ায় সত্যজিৎ রায় যখন ঢাকায় পৌঁছান, তখন দুপুর গড়িয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রটোকল অনুযায়ী তাঁর থাকার ব্যবস্থা ছিল জমকালো হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। কিন্তু মাটির টানে আসা এই শিল্পী আভিজাত্যের চেয়ে মানুষের সান্নিধ্যকে বেছে নিলেন; আশ্রয় নিলেন দিলকুশার হোটেল পূর্বাণীতে। সেখানেই তাঁর সাথে দেখা করতে আসেন পল্লীকবি জসীমউদ্দীন, পুরনো বন্ধু আলোকচিত্রী আমানুল হক।
১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুই মহানায়কের দেখা হয়েছিল দুবার। প্রথমবার কলকাতার রাজভবনে, যেখানে বঙ্গবন্ধু কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন ভারতের সংস্কৃতিকর্মীদের। আর দ্বিতীয়বার ঢাকার মাটিতে। শিল্পের বরপুত্র আর রাজনীতির কবির সেই আলাপন ছিল বাংলা ও বাঙালির সোনালী ভবিষ্যতের এক রূপরেখা।
২১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় পল্টন ময়দানে লক্ষ মানুষের জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে সত্যজিৎ রায় তাঁর হৃদয়ের অর্ঘ্য ঢেলে দেন। নাট্যব্যক্তিত্ব তবিবুল ইসলামের ক্যাসেট বন্দি সেই ভাষণে সত্যজিৎ বলেছিলেন:
"আমার রক্তে যে ভাষা বইছে, সে হলো বাংলা ভাষা। এই ভাষাকে বাদ দিয়ে অন্য কিছু করতে গেলে আমি কূলকিনারা পাব না, শিল্পী হিসেবে মনের জোর হারাব।"
তাঁর এই স্বীকারোক্তি ছিল বাংলা চলচ্চিত্রের প্রতি তাঁর আজন্ম প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন।
সত্যজিৎ রায়ের আজীবন ইচ্ছা ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটি মহাকাব্যিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করা। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ড সেই স্বপ্নকে স্তব্ধ করে দেয়। বঙ্গবন্ধুর প্রয়াণে তিনি এতটাই শোকাহত হয়েছিলেন যে, সেই প্রজেক্টটি আর আলোর মুখ দেখেনি।
সত্যজিৎ ও বঙ্গবন্ধুর সেই সাক্ষাৎ কেবল দুই ব্যক্তির দেখা হওয়া ছিল না; তা ছিল দুই বাংলার শিল্প ও সংগ্রামের এক অবিচ্ছেদ্য আলিঙ্গন। কিশোরগঞ্জের মসূয়া গ্রাম থেকে কলকাতার বিশপ লেফ্রয় রোড—সত্যজিতের যাত্রাপথ ছিল বাঙালির আত্মপরিচয় খোঁজার এক দীর্ঘ পথচলা।
মতামত দিন