দারিদ্র্য জয় করে বিশ্বমঞ্চে বগুড়ার অনন্যা: ফুল ফ্রি স্কলারশিপে অস্ট্রেলিয়ায় পিএইচডির সুযোগ
অভাব ছিল যার নিত্যসঙ্গী, স্বপ্ন ছিল তার আকাশছোঁয়া। চরম প্রতিকূলতা আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে সম্বল করে সেই স্বপ্নকে জয় করেছেন বগুড়ার মেয়ে মোছা. অনন্যা খাতুন। গ্রামের মেঠোপথ থেকে উঠে এসে তিনি আজ পৌঁছে গেছেন বিশ্বের অন্যতম সেরা গবেষণাভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডে (UQ)। অর্জন করে নিয়েছেন পূর্ণ অর্থায়নে (ফুলি ফান্ডেড) সম্মানজনক পিএইচডি গবেষণার সুযোগ।
বগুড়ার গাবতলী উপজেলার উজগ্রাম দক্ষিণপাড়া ইউনিয়নের মণ্ডলপাড়ার এক সাধারণ পরিবারে বেড়ে ওঠেন অনন্যা। বাবা একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং মা গৃহিণী। সীমিত আয়ের সংসারে আর্থিক সংকট লেগেই থাকত। কিন্তু শত অভাব-অনটনের মাঝেও অনন্যার পড়ালেখার গতি থমকে যায়নি। প্রাথমিক ও জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়ে নিজের পড়ালেখার খরচ নিজেই জোগানোর চেষ্টা করেছেন। পাশাপাশি শিক্ষকদের স্নেহ ও সহযোগিতাকে শক্তি বানিয়ে এগিয়ে গেছেন স্বপ্নের পানে।
মেধার স্বাক্ষর রেখে ২০১১ সালে এসএসসি ও ২০১৩ সালে এইচএসসি উভয় পরীক্ষাতেই জিপিএ-৫ অর্জন করেন তিনি। এরপর ভর্তি হন দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) কৃষি অনুষদে। একাডেমিক পড়াশোনায় অসাধারণ সাফল্য দেখিয়ে স্নাতকে সিজিপিএ ৩.৯৬ এবং স্নাতকোত্তরে ৩.৮০ পেয়ে উভয় শ্রেণিতেই প্রথম স্থান অধিকার করেন। এ অসাধারণ কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০১৯ সালের সম্মানজনক ‘প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক’-এর জন্য মনোনীত হন।
পড়াশোনা শেষ করে ২০২২ সালে অনন্যা নিজের প্রিয় বিদ্যাপীঠ হাবিপ্রবির উদ্যানতত্ত্ব বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। বর্তমানে তিনি সেখানে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। শিক্ষকতার পাশাপাশি গবেষণা ক্ষেত্রেও তিনি অবদান রেখে চলেছেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় (MoST) এবং হাবিপ্রবির ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (IRT)-এর অধীনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রকল্প সাফল্যের সাথে পরিচালনা করেছেন। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মানের স্কোপাস (Scopus) ইনডেক্সড জার্নালে তার ১৩টি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
সাফল্যের ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি তিনি অস্ট্রেলিয়ার ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয় ‘ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ড’-এ পূর্ণ অর্থায়নে পিএইচডি গবেষণার সুযোগ লাভ করেন। উচ্চশিক্ষার এই স্বপ্নযাত্রায় অংশ নিতে আগামী সেপ্টেম্বরে তার অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার কথা রয়েছে।
নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে অনন্যা খাতুন বলেন,
"আমি স্বপ্ন দেখতে কখনো ভয় পাইনি। কঠোর পরিশ্রম, অসীম ধৈর্য, পরিবারের নিরবচ্ছিন্ন অনুপ্রেরণা আর মহান আল্লাহর অশেষ রহমতেই আজকের এই অবস্থান। ভবিষ্যতে কৃষি গবেষণায় নতুন জ্ঞান সৃষ্টির মাধ্যমে আমার দেশ ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করে যেতে চাই।"
গ্রামের সাধারণ পরিবেশ থেকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অনন্যা খাতুনের এই অভূতপূর্ব অর্জন শুধু বগুড়াবাসীর নয়, পুরো দেশের জন্য এক বিশাল গৌরব। তার এ সাফল্য প্রমাণ করে—দৃঢ় সংকল্প, নিরলস অধ্যবসায় আর কাজের প্রতি সততা থাকলে দারিদ্র্য কিংবা প্রতিকূলতা কোনোটাই সফলতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।
মতামত দিন