পুলিশ জানতে পারে, শার্ট-পেন্ট পরা যাকে এতক্ষণ একজন পুরুষ অটোচালক হিসেবে দেখা হচ্ছিল, তিনি আসলে একজন নারী—।
সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে বদলে ফেললেন নিজের পরিচয়—বগুড়ার লিমার হৃদয়বিদারক জীবনসংগ্রাম
সবাই যখন বেঁচে থাকার সহজ পথ খোঁজে, তখন কিছু মানুষকে বেঁচে থাকার জন্য প্রতিদিন লড়তে হয় নিজের ভাগ্যের সঙ্গে। আর সেই লড়াইটা যখন একজন মায়ের—তখন তার প্রতিটি পদক্ষেপ হয়ে ওঠে ত্যাগ, কষ্ট আর আত্মসম্মান রক্ষার এক নীরব যুদ্ধ।
বগুড়ার মেয়ে লিমার জীবন যেন সেই নির্মম বাস্তবতারই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। সন্তানের মুখে দু'মুঠো খাবার তুলে দিতে, নিজের সম্মানটুকু বাঁচিয়ে রাখতে এবং কারও কাছে হাত না পেতে শেষ পর্যন্ত নিজের নারী পরিচয়টুকুও আড়াল করতে হয়েছে তাঁকে।
ভালোবাসার মানুষটির ওপর বিশ্বাস রেখেই একদিন সংসার গড়েছিলেন লিমা। স্বপ্ন ছিল—স্বামী-সন্তানকে নিয়ে ছোট্ট একটি সুখের সংসার হবে। কিন্তু সন্তান পৃথিবীর আলো দেখার পরপরই সেই স্বপ্ন যেন হঠাৎ করেই ভেঙে যায়। স্বামী আত্মগোপনে চলে গেলে একা হয়ে পড়েন সন্তানসম্ভবা থেকে সদ্য মা হওয়া লিমা।
কোলের শিশুকে বুকে জড়িয়ে তখন তিনি ফিরে গিয়েছিলেন মা-বাবার কাছে। ভেবেছিলেন, অন্তত আপনজনদের কাছে হয়তো একটু আশ্রয় মিলবে। কিন্তু সেখানেও তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল কঠিন বাস্তবতা। বাবা নিজের জীবনে অন্য সংসার গড়েছেন, মা-ও নতুন সংসারে ব্যস্ত। ফলে আপনজনের ঘরেও লিমার জন্য তৈরি হয়নি স্থায়ী কোনো আশ্রয়।
একদিকে ছোট্ট সন্তান, অন্যদিকে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ—সব মিলিয়ে চারপাশটা যখন অন্ধকার হয়ে এসেছিল, তখনও হার মানেননি এই তরুণী মা।
কিন্তু একজন একা নারী হিসেবে কাজের সন্ধানে বের হওয়াটাও তাঁর জন্য সহজ ছিল না। পথে পথে শুনতে হয়েছে কটু কথা, সহ্য করতে হয়েছে নানা ধরনের হয়রানি। কাজ করতে গিয়ে নারী পরিচয়ই যেন তাঁর জন্য হয়ে উঠেছিল বাড়তি এক বোঝা।
তাই বাধ্য হয়ে একসময় নিজের পরিচয়ই আড়াল করার সিদ্ধান্ত নেন লিমা।
প্যান্ট-শার্ট পরতে শুরু করেন। ছোট করে ফেলেন চুল। পুরুষের বেশে শুরু করেন ফুড ডেলিভারি ও রাইড শেয়ারিংয়ের কাজ। উদ্দেশ্য একটাই—কোনোভাবে নিজের সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেওয়া।
পরবর্তীতে জীবিকার প্রধান অবলম্বন হিসেবে বেছে নেন অটোরিকশা চালানো। ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় প্রতিদিন পুরুষের বেশে ছুটে বেড়াতে থাকেন তিনি। যানজট, রোদ, বৃষ্টি কিংবা ক্লান্তি—কিছুই যেন থামাতে পারেনি তাঁর পথচলা।
কারণ তাঁর পেছনে ছিল একটি ছোট্ট মুখ।
একটি সন্তান, যার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা তাঁর মা।
সম্প্রতি রাজধানীর শ্যামলী প্রধান সড়কে অটোরিকশা চালানোর সময় নিয়মিত দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে ট্রাফিক পুলিশ তাঁর গাড়িটি জব্দ করে থানায় নিয়ে যায়। কিন্তু এরপরই ঘটে এমন এক ঘটনা, যা বদলে দেয় পুরো পরিস্থিতি।
পুলিশ জানতে পারে, যাকে এতক্ষণ একজন পুরুষ অটোচালক হিসেবে দেখা হচ্ছিল, তিনি আসলে একজন নারী—লিমা। আর সেই ছদ্মবেশের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক মায়ের দীর্ঘদিনের কান্না, সংগ্রাম আর বেঁচে থাকার গল্প।
লিমার পরিচয় প্রকাশ্যে আসার পর তাঁর জীবনসংগ্রামের কথা ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন, একজন মা কীভাবে এত প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখতে দিনের পর দিন লড়াই করে যাচ্ছেন।
সমাজে যেখানে অনেক সহজ পথের হাতছানি থাকে, সেখানে লিমা বেছে নিয়েছেন ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের পথ। কারও কাছে হাত পাতেননি, নিজের সন্তানের আহারের জন্য নিজের শ্রমকেই করেছেন একমাত্র সম্বল।
তাঁর গল্প শুধু একজন অটোচালকের গল্প নয়।
এটি একজন মায়ের গল্প।
এটি একজন নারীর আত্মসম্মান রক্ষার গল্প।
এটি প্রতিকূলতার কাছে হার না মানা এক মানুষের গল্প।
হয়তো লিমার পোশাক বদলে গেছে, চুল ছোট হয়েছে, পরিচয়ও আড়াল করতে হয়েছে—কিন্তু একজন মায়ের হৃদয় তো বদলায়নি।
সন্তানের মুখে একমুঠো খাবার তুলে দেওয়ার জন্য যে মা নিজের পরিচয় পর্যন্ত বিসর্জন দিতে পারেন, তাঁর কাছে এই লড়াই কোনো অভিনয় নয়—এটাই তাঁর বেঁচে থাকার যুদ্ধ।
নেটিজেনদের অনেকেই এখন দাবি জানাচ্ছেন, আইনের প্রয়োজনীয়তা ও নিয়মকানুনের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই যেন লিমার পরিস্থিতির প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি দেখানো হয়। কারণ তাঁর অটোরিকশাটি শুধু একটি যানবাহন নয়—এটাই হয়তো তাঁর সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার একমাত্র অবলম্বন।
একজন মা যখন সন্তানের জন্য নিজের পরিচয় পর্যন্ত লুকিয়ে রাস্তায় নামতে বাধ্য হন, তখন প্রশ্নটা শুধু লিমাকে নিয়ে নয়—প্রশ্নটা আমাদের সমাজকে নিয়েও।
যে সমাজ একজন অসহায় নারীকে নিরাপদে কাজ করার সুযোগ দিতে পারেনি, সেই সমাজ কি অন্তত তাঁর সংগ্রামের পাশে দাঁড়াবে?
লিমার গল্প তাই শুধু আবেগের নয়—এটি আমাদের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়া এক নির্মম বাস্তবতা।
মতামত দিন