• ২০২৬ অগাস্ট ১৮, মঙ্গলবার, ১৪৩৩ ভাদ্র ৩
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:০৮ পূর্বাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

নবাব এস্টেটের বিপুল সম্পত্তি: অব্যবস্থাপনা, মামলা ও দখল জটিলতায় পড়ে আছে সম্ভাবনার বিশাল ক্ষেত্র

  • প্রকাশিত ১১:০৮ পূর্বাহ্ন মঙ্গলবার, অগাস্ট ১৮, ২০২৬
নবাব এস্টেটের বিপুল সম্পত্তি: অব্যবস্থাপনা, মামলা ও দখল জটিলতায় পড়ে আছে সম্ভাবনার বিশাল ক্ষেত্র
নওয়াব এস্টেট বর্তমান মোতাওয়াল্লী নওয়াব ড. খাজা ইকবাল আহসান উল্লাহ
সাইদুজ্জামান সেলিমঃ চিফ রিপোর্টার

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

বাংলার ইতিহাস, শিক্ষা, সমাজসেবা ও নগর উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে ঢাকার নবাব পরিবারের নাম। একসময় যে পরিবার এ অঞ্চলের শিক্ষা, সংস্কৃতি, অবকাঠামো ও জনকল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, সময়ের পরিক্রমায় সেই পরিবারের বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির একটি অংশ আজ অব্যবস্থাপনা, মামলা-মোকদ্দমা, মালিকানা জটিলতা এবং দখলসংক্রান্ত বিরোধে আটকে থাকার অভিযোগ রয়েছে।


নবাব সলিমুল্লাহ পরিবারের সম্পত্তির প্রকৃত পরিমাণ, কোন কোন এলাকায় কী পরিমাণ জমি রয়েছে, কোন সম্পত্তি বৈধভাবে উত্তরাধিকারসূত্রে/ওয়াকফ সূত্রে বিদ্যমান এবং কোনগুলো সরকারি খাস, অর্পিত, পরিত্যক্ত কিংবা ব্যক্তিমালিকানাধীন হিসেবে রেকর্ডভুক্ত হয়েছে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন রয়েছে।


এই সম্পত্তিগুলোর একটি বড় অংশ যদি বৈধ মালিকানা ও আদালতের নিষ্পত্তির ভিত্তিতে পুনর্বিন্যাস করে উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করা যায়, তাহলে তা কেবল একটি পরিবারের সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার বিষয় থাকবে না, বরং কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন, শিক্ষা, আবাসন এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


‘লক্ষ লক্ষ বিঘা’ জমির দাবি কতটা সত্য?


বর্তমান নওয়াব এস্টেট মোতাওয়াল্লী নওয়াব ড. খাজা ইকবাল আহসান উল্লাহ দাবি করেন, নবাব সলিমুল্লাহ পরিবারের সারা দেশে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি রয়েছে, যার বড় একটি অংশ বিভিন্ন ধরনের জটিলতায় পড়ে আছে।


তবে অনুসন্ধানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, এই জমির প্রকৃত পরিমাণ কত?


শুধু উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া পুরোনো দলিল কিংবা মৌখিক দাবির ভিত্তিতে কোনো সম্পত্তিকে নবাব এস্টেটের সম্পত্তি হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি দীর্ঘদিন দখলে থাকার কারণে প্রকৃত মালিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তিত হয় কি না, সেটিও আইনগত নথির মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।তবে ১৮৫৪-৭৪ ওয়াকফ দলিলের তথ্য মতে এবং ১৯৩০-৬০ দশকে নওয়াব এস্টেট গ্যাজেট মুলে ১৯ লক্ষ ৩৩০০০ বিঘা কিন্তু ভূমি রেকর্ড মুলে বিশ হাজার বিঘার ও কম।


মামলা জটিলতায় আটকে থাকা সম্পত্তি


নবাব পরিবারের সম্পত্তি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে মালিকানা, উত্তরাধিকার, ইজারা, দখল, বন্দোবস্ত ও ভূমি রেকর্ডকে কেন্দ্র করে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য।


এসব মামলার কোনোটি দেওয়ানি আদালতে, কোনোটি উচ্চ আদালতে এবং কোনোটি ভূমি প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকতে পারে।


একটি সম্পত্তি যদি বছরের পর বছর আদালতের নিষেধাজ্ঞা বা মালিকানা বিরোধের মধ্যে থাকে, তাহলে সেটি অর্থনৈতিকভাবে উৎপাদনশীল ব্যবহারের বাইরে চলে যায়। ফলে জমির সম্ভাব্য মূল্য ও সামাজিক ব্যবহার দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।


এখানেই অনুসন্ধানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন:


মামলায় থাকা সম্পত্তির কত অংশ প্রকৃতপক্ষে ব্যবহারযোগ্য এবং কত অংশ আইনগতভাবে অবমুক্ত করা সম্ভব?


এই প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রতিটি সম্পত্তির জন্য আলাদা ‘ল্যান্ড অ্যাসেট ডাটাবেজ’ তৈরি করা প্রয়োজন।


ভূমিদস্যুদের দখলের অভিযোগ


নবাব এস্টেটের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সম্পত্তি দখল হয়ে যাওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।


তবে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ‘ভূমিদস্যু’ হিসেবে অভিযোগ প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট জমির রেকর্ড, দলিল, দখলের ইতিহাস এবং আদালতের সিদ্ধান্ত যাচাই করা জরুরি।


কারণ একই জমি নিয়ে একাধিক পক্ষের মালিকানা দাবি থাকতে পারে। আবার কোনো জমিতে দীর্ঘদিনের বৈধ ইজারা, বন্দোবস্ত কিংবা আদালতের আদেশও থাকতে পারে।


তাই একটি স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে প্রতিটি জমির ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় নির্ধারণ করা প্রয়োজন:


১. প্রকৃত মালিকানা কার?

২. বর্তমানে দখলে কে?

৩. দখল ও মালিকানার মধ্যে আইনগত কোনো বিরোধ রয়েছে কি না?


জমি পড়ে থাকবে, নাকি তৈরি হবে কর্মসংস্থান?


এই এস্টেটের বর্তমান মোতাওয়াল্লী নওয়াব ড. খাজা ইকবাল আহসান উল্লাহর মতে, বৈধভাবে উদ্ধার ও ব্যবস্থাপনায় আনা সম্ভব হলে এসব জমিতে ফ্যাক্টরি, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন কর্মমুখী প্রকল্প গড়ে তোলা যেতে পারে।


তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিশাল জমি শুধু পড়ে থাকার পরিবর্তে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা গেলে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।


বিশেষ করে কৃষিভিত্তিক শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কারিগরি শিক্ষা, প্রশিক্ষণকেন্দ্র, গুদাম, লজিস্টিকস এবং অন্যান্য উৎপাদনমুখী প্রকল্প গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।


আবাসন সংকট সমাধানে ভূমি ব্যবহারের প্রস্তাব


নওয়াব এস্টেটের মোতাওয়াল্লী আরও মনে করেন, কিছু উপযুক্ত জমিতে পরিকল্পিত বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণের মাধ্যমে ভূমিহীন ও আবাসন সংকটে থাকা মানুষের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব।


তার বক্তব্যে জুলাই যোদ্ধাদের আবাসন সংকট সমাধানের বিষয়টিও উঠে এসেছে।


তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আবাসন প্রকল্পটি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং কারা এর সুবিধাভোগী হবেন।


সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব, ট্রাস্টভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, দীর্ঘমেয়াদি লিজ অথবা সামাজিক আবাসন প্রকল্পের মাধ্যমে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে কি না, তা আইনগত ও আর্থিকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।


নবাব এস্টেট কি হতে পারে অর্থনৈতিক সম্পদ?


একটি বিষয় স্পষ্ট: কোনো বড় ভূসম্পত্তি যদি বছরের পর বছর নিষ্ক্রিয় পড়ে থাকে, তাহলে সেটি অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত অবদান রাখতে পারে না।


অন্যদিকে একই জমি যদি বৈধ মালিকানা নিশ্চিত করে পরিকল্পিতভাবে শিল্প, শিক্ষা, কৃষি, আবাসন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে ব্যবহার করা যায়, তাহলে তার অর্থনৈতিক মূল্য বহুগুণ বাড়তে পারে।


এতে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। বাড়তে পারে ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন ও সেবা খাতের কার্যক্রম। সরকারও পেতে পারে কর ও রাজস্বের সুযোগ।


অর্থাৎ নবাব এস্টেটের সম্পত্তিকে কেবল ঐতিহাসিক সম্পদ হিসেবে দেখলে হবে না। আইনগত মালিকানা নিশ্চিত করে এগুলোকে উৎপাদনশীল সম্পদে পরিণত করা সম্ভব কি না, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রশ্ন।


প্রয়োজন একটি পূর্ণাঙ্গ সম্পত্তি নিরীক্ষা


বিশাল এই সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি কাজ হতে পারে একটি স্বাধীন ও স্বচ্ছ সম্পত্তি নিরীক্ষা।


প্রথম ধাপে নবাব পরিবারের সম্পত্তির পূর্ণ তালিকা তৈরি করতে হবে।


প্রতিটি সম্পত্তির জন্য থাকতে হবে:


- জেলা, উপজেলা ও মৌজা

- দাগ নম্বর

- খতিয়ান নম্বর

- জমির পরিমাণ

- বর্তমান রেকর্ড

- মালিকানা ও উত্তরাধিকার সূত্র

- বর্তমান দখলদার

- মামলা নম্বর ও আদালতের অবস্থা

- জমির বর্তমান ব্যবহার

- সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ব্যবহার

- সরকারি বা বেসরকারি কোনো দাবি রয়েছে কি না

- ওয়াকফ দলিল, সরকারি গ্যাজেট।


এরপর প্রয়োজন একটি ডিজিটাল নবাব এস্টেট ল্যান্ড ডাটাবেজ।


এতে একই জমি নিয়ে একাধিক দাবি, ভুয়া দলিল, ভুল রেকর্ড কিংবা দীর্ঘদিনের দখলসংক্রান্ত সমস্যা শনাক্ত করা তুলনামূলক সহজ হবে।


অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন


নবাব এস্টেটের সম্পত্তি নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানে এখন কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর বের করা জরুরি:


প্রথমত, সারা দেশে নবাব সলিমুল্লাহ পরিবারের নামে বা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রকৃতপক্ষে কত জমি রয়েছে?


দ্বিতীয়ত, এর কত অংশ বর্তমানে বৈধ মালিকদের দখলে এবং কত অংশ অন্যের দখলে?


তৃতীয়ত, কতটি জমি নিয়ে আদালতে মামলা চলছে?


চতুর্থত, কতটি জমির রেকর্ড পরিবর্তন হয়েছে এবং কীভাবে হয়েছে?


পঞ্চমত, কোনো সম্পত্তি সরকারি খাস বা অন্য কোনো সরকারি শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি না?


ষষ্ঠত, দীর্ঘদিন ধরে মামলা চললেও কেন সম্পত্তিগুলোর একটি অংশ উৎপাদনশীল ব্যবহারের বাইরে রয়েছে?


সপ্তমত, বৈধভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হলে এসব সম্পত্তি থেকে কী পরিমাণ কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করা সম্ভব?


রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্টদের করণীয়


নবাব এস্টেটের সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ থাকলে তার সমাধান হতে হবে আইন ও আদালতের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে বেআইনিভাবে উচ্ছেদ কিংবা কোনো সম্পত্তি জোরপূর্বক দখলের সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।


একই সঙ্গে প্রকৃত মালিকানার সম্পত্তি যদি অবৈধ দখলে থাকে, তাহলে আইন অনুযায়ী তা উদ্ধারের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।


ভূমি মন্ত্রণালয়, ভূমি প্রশাসন, জেলা প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট আদালত এবং নবাব এস্টেট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে একটি তথ্যভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।


প্রয়োজনে সম্পত্তির শ্রেণিবিন্যাস করে কিছু জমি শিল্প, কিছু শিক্ষা, কিছু কৃষি, কিছু সামাজিক আবাসন এবং কিছু বাণিজ্যিক প্রকল্পে ব্যবহারের পরিকল্পনা তৈরি করা যেতে পারে।


ইতিহাসের সম্পদ থেকে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা


নবাব পরিবারের ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ থাকলেও একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই, বৃহৎ পরিমাণ ভূমি যদি আইনগত জটিলতা ও অব্যবস্থাপনায় নিষ্ক্রিয় পড়ে থাকে, তাহলে তার সম্ভাব্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য জনগণ পায় না।


নওয়াব ড. খাজা ইকবাল আহসান উল্লাহর বক্তব্যে সেই সম্পত্তিকে উৎপাদন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও আবাসনের কাজে ব্যবহারের একটি সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে।


এখন প্রয়োজন আবেগ বা ঐতিহাসিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে দলিল, খতিয়ান, আদালতের নথি ও মাঠপর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকৃত চিত্র বের করে আনা।


নবাব এস্টেটের জমির প্রকৃত পরিমাণ যদি নিরূপণ করা যায়, অবৈধ দখল ও মামলা জটিলতার প্রকৃত চিত্র প্রকাশ করা যায় এবং বৈধ সম্পত্তিগুলোকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনায় আনা যায়, তাহলে এই সম্পদ ভবিষ্যতে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও আবাসন খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।


প্রশ্ন তাই শুধু ‘নবাবদের কত জমি আছে?’ নয়।


আরও বড় প্রশ্ন হলো:


যে জমি আছে, তার কতটুকু আইনগতভাবে সুরক্ষিত, কতটুকু দখলে, কতটুকু মামলা জটিলতায় এবং কতটুকু দেশের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজে লাগানো সম্ভব?


এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে নবাব এস্টেটের ভবিষ্যৎ।


প্রতিবেদন: অনুসন্ধানী ডেস্ক

সর্বশেষ