• ২০২৬ অগাস্ট ৩০, রবিবার, ১৪৩৩ ভাদ্র ১৫
  • সর্বশেষ আপডেট : ০১:০৮ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

পাহাড়ি নদীতে বাঁধ: উন্নয়নের আড়ালে বাড়ছে বিপর্যয়ের শঙ্কা

  • প্রকাশিত ০১:০৮ অপরাহ্ন রবিবার, অগাস্ট ৩০, ২০২৬
পাহাড়ি নদীতে বাঁধ: উন্নয়নের আড়ালে বাড়ছে বিপর্যয়ের শঙ্কা
Time Bangla news
ফজলে এলাহী সুমন | সাভার প্রতিনিধি | টাইম বাংলা নিউজ

পাহাড়ি নদীতে বাঁধ: উন্নয়নের আড়ালে বাড়ছে বিপর্যয়ের শঙ্কা


হিমালয়কে বলা হয় দক্ষিণ এশিয়ার ‘পানির টাওয়ার’। এই পর্বতমালা থেকে নেমে আসা নদীগুলো কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, পানির সরবরাহ ও অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। একই সঙ্গে পাহাড়ি নদীর প্রবল স্রোতকে কাজে লাগিয়ে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনাও দীর্ঘদিন ধরে কাজে লাগিয়ে আসছে ভারত, নেপাল, ভুটান ও চীন।

কার্বন নিঃসরণ কমানোর বৈশ্বিক প্রচেষ্টায় জলবিদ্যুৎকে তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন জ্বালানি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেই যুক্তিতে হিমালয় অঞ্চলে গত কয়েক দশকে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বাঁধ, জলাধার, টানেল ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্র। কিন্তু প্রকৃতির ওপর মানুষের এই হস্তক্ষেপ কতটা নিরাপদ—সাম্প্রতিক একাধিক বিপর্যয় সেই প্রশ্নই সামনে নিয়ে এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ভূমিকম্পপ্রবণ ও ভূতাত্ত্বিকভাবে অস্থিতিশীল হিমালয়ে বড় বাঁধের বিস্তার শুধু পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়াচ্ছে না, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ধ্বংসক্ষমতাও বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।

পাহাড় কেটে টানেল, বদলে যাচ্ছে ভূপ্রকৃতি

জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে পাহাড়ের ভেতর দীর্ঘ টানেল খনন, বিস্ফোরক ব্যবহার, সড়ক নির্মাণ এবং ব্যাপক মাটি ও পাথর অপসারণ করতে হয়। এসব কর্মকাণ্ড পাহাড়ের স্বাভাবিক শিলাস্তর ও ঢালের স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় নদীর গতিপথ পরিবর্তনের বিষয়টি। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নদীর পানি অনেক সময় মূল প্রবাহ থেকে সরিয়ে টানেল বা নির্দিষ্ট চ্যানেলে প্রবাহিত করা হয়। ফলে নদীর স্বাভাবিক জলপ্রবাহ, পলি পরিবহন এবং স্থানীয় প্রতিবেশব্যবস্থায় পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

অন্যদিকে বড় জলাধারে বিপুল পরিমাণ পানি আটকে রাখার ফলে ভূগর্ভে চাপের পরিবর্তন তৈরি হতে পারে। ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় এ ধরনের মানবসৃষ্ট ভূকম্পনকে ‘ইনডিউসড সিসমিসিটি’ বলা হয়। হিমালয়ের মতো সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলে এ ঝুঁকি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ছোট ধস থেকে বড় বিপর্যয়

পাহাড়ি এলাকায় হিমবাহ ভেঙে পড়া, পাথর ধস কিংবা অতিবৃষ্টিতে আকস্মিক বন্যা নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু নদীর পথে বড় বাঁধ বা জলাধার থাকলে একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব অনেক বেশি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

পাহাড়ের বিশাল কোনো শিলাখণ্ড বা বরফের স্তর জলাধারে আছড়ে পড়লে মুহূর্তে বিপুল পরিমাণ পানি সরে যেতে পারে। এর সঙ্গে মিশে যায় পলি, পাথর ও কাদামাটি। বাঁধের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে আটকে থাকা বিপুল পানি নিচের দিকে নেমে গিয়ে তৈরি করতে পারে প্রবল ধ্বংসাত্মক স্রোত।

তখন শুধু একটি পাহাড়ি ঢাল ধসের ঘটনা থাকে না; উজানের ধস, নদীর স্রোত ও জলাধারের পানি একত্র হয়ে ভাটির বিস্তীর্ণ জনপদে আঘাত হানতে পারে। ধ্বংস হতে পারে সেতু, সড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র, টানেল এবং বসতবাড়ি।

উত্তরাখণ্ড ও নেপালের অভিজ্ঞতা

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের উত্তরাখণ্ডে নন্দাদেবী পর্বত এলাকায় হিমবাহ ভেঙে আকস্মিক প্রবল স্রোত নেমে আসে ঋষিগঙ্গা নদীতে। ওই স্রোতে ঋষিগঙ্গা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং তপোবন-বিষ্ণুগড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘটনায় দুই শতাধিক মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হন।

ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, হিমালয়ে একটি আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ কীভাবে বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপর আঘাত হেনে তার প্রভাবকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।

নেপালেও একই ধরনের ঝুঁকির নজির রয়েছে। ২০২১ সালে মেলামচি এলাকায় উজান থেকে নেমে আসা পাথর, কাদা ও পানির প্রবল স্রোতে পানি সরবরাহ ও জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর পাশাপাশি বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

২০২৬ সালে নেপাল-চীন সীমান্তসংলগ্ন ভোটেকোশি নদী অববাহিকায় হিমবাহ ও শিলাধসের ঘটনায়ও জলবিদ্যুৎ অবকাঠামোর ঝুঁকি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। রসুয়া এলাকায় নির্মাণাধীন ও বিদ্যমান প্রকল্পের বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রকল্পের টানেল ও নির্মাণস্থলে শ্রমিকদের হতাহতের ঘটনাও ঘটে।

পলিতে ভরছে জলাধার

শুধু আকস্মিক দুর্যোগ নয়, দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিও কম নয়। হিমালয়ের নদীগুলো বিপুল পরিমাণ পলি বহন করে। বাঁধ নির্মাণের পর সেই পলির বড় অংশ জলাধারে আটকে যায়। বছরের পর বছর পলি জমতে থাকলে জলাধারের ধারণক্ষমতা কমে যায়।

ফলে যে জলাধারকে কয়েক দশকের বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা প্রত্যাশিত সময়ের আগেই কার্যকারিতা হারাতে পারে। একই সঙ্গে নদীর স্বাভাবিক পলি পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় উজান ও ভাটির পরিবেশেও পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। একটি বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হয়। কিন্তু বড় ধরনের বন্যা, ভূমিধস বা হিমবাহজনিত দুর্যোগে যদি প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হয়, তাহলে শুধু নির্মাণ ব্যয় নয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ থাকা, পুনর্নির্মাণ এবং স্থানীয় অর্থনীতির ক্ষতিও যোগ হয়।

একই নদীতে একের পর এক বাঁধ

হিমালয় অঞ্চলে আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে একই নদীর ওপর ধারাবাহিকভাবে একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ। কোনো একটি প্রকল্পে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে তার প্রভাব নিচের দিকের প্রকল্পগুলোর ওপরও পড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এ ধরনের ধারাবাহিক অবকাঠামো একটি দুর্যোগকে ‘ডোমিনো ইফেক্ট’-এর মতো ছড়িয়ে দিতে পারে। একটি বাঁধ বা প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার পানি, পলি ও ধ্বংসাবশেষ নিচের প্রকল্পে আঘাত করতে পারে। এতে একটি নির্দিষ্ট এলাকার পরিবর্তে পুরো নদী অববাহিকা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে অনিশ্চয়তা

হিমালয়ের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। হিমবাহের দ্রুত পরিবর্তন, অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা এবং ভূমিধসের মতো ঘটনা ভবিষ্যতে আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। এমন বাস্তবতায় কয়েক দশক আগের আবহাওয়া ও জলপ্রবাহের তথ্যের ওপর নির্ভর করে নতুন প্রকল্পের নিরাপত্তা পরিকল্পনা করা কতটা কার্যকর হবে, সেটিও প্রশ্নের বিষয়।

পরিবেশ ও নদীবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘদিনের সতর্কতা হলো—হিমালয়কে অন্য যেকোনো পর্বত অঞ্চলের মতো বিবেচনা করলে চলবে না। এখানকার ভূপ্রকৃতি, নদীর চরিত্র ও জলবায়ুগত পরিবর্তন আলাদা। তাই প্রতিটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে স্থানীয় ভূতত্ত্ব, নদীর প্রবাহ, ভূমিধসের সম্ভাবনা, হিমবাহের আচরণ এবং সম্ভাব্য দুর্যোগের সম্মিলিত প্রভাব বিশ্লেষণ করা জরুরি।

উন্নয়ন, নাকি নতুন ঝুঁকি?

বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়ন ছাড়া আধুনিক অর্থনীতি এগিয়ে নেওয়া কঠিন। ফলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তাও অস্বীকার করা যায় না। প্রশ্ন হচ্ছে, কোথায় এবং কী ধরনের প্রকল্প নির্মাণ করা হবে।

প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য উপেক্ষা করে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের হিসাবকে অগ্রাধিকার দিলে ভবিষ্যতে তার মূল্য দিতে হতে পারে মানুষকেই। বিশেষ করে এমন একটি অঞ্চলে, যেখানে ভূমিকম্প, ভূমিধস, হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি আগে থেকেই প্রবল।

তাই হিমালয় অঞ্চলে নতুন বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প অনুমোদনের আগে আরও কঠোর ভূতাত্ত্বিক ও জলবায়ুগত ঝুঁকি মূল্যায়নের দাবি জোরালো হচ্ছে। পাশাপাশি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ যতটা সম্ভব অক্ষুণ্ন রেখে কম ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ উৎপাদন পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।

শেষ পর্যন্ত উন্নয়নের সাফল্য শুধু কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হলো, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। সেই উন্নয়ন কতটা নিরাপদ, কতটা টেকসই এবং দুর্যোগের সময় মানুষের জীবনকে কতটা সুরক্ষা দিতে পারে—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

হিমালয়ের নদীকে যদি শুধু বিদ্যুতের উৎস হিসেবে দেখা হয়, তাহলে প্রকৃতির হিসাব একদিন আরও বড় অঙ্কে দিতে হতে পারে। সেই হিসাবের খেসারত যেন মানুষের জীবন ও জনপদের ধ্বংস দিয়ে না দিতে হয়, এখনই সে বিষয়ে সতর্ক হওয়ার সময়।

সর্বশেষ