• ২০২৬ সেপ্টেম্বর ০২, বুধবার, ১৪৩৩ ভাদ্র ১৭
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৫:০৯ পূর্বাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

আজ ১ সেপ্টেম্বর তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে খুলেছে সুন্দরবন। মাছ-কাঁকড়া আহরণ ও পর্যটনে ফিরছে ব্যস্ততা। তবে ঋণের বোঝা ও দস্যুর ভয় নিয়ে নতুন মৌসুম শুরু করেছেন বনজীবীরা।

  • প্রকাশিত ০৫:০৯ পূর্বাহ্ন বুধবার, সেপ্টেম্বর ০২, ২০২৬
আজ ১ সেপ্টেম্বর তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে খুলেছে সুন্দরবন। মাছ-কাঁকড়া আহরণ ও পর্যটনে ফিরছে ব্যস্ততা। তবে ঋণের বোঝা ও দস্যুর ভয় নিয়ে নতুন মৌসুম শুরু করেছেন বনজীবীরা।
Time Bangla news
ফজলে এলাহী সুমন | সাভার প্রতিনিধি | টাইম বাংলা নিউজ

আজ ১ সেপ্টেম্বর তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে খুলেছে সুন্দরবন। মাছ-কাঁকড়া আহরণ ও পর্যটনে ফিরছে ব্যস্ততা। তবে ঋণের বোঝা ও দস্যুর ভয় নিয়ে নতুন মৌসুম শুরু করেছেন বনজীবীরা।


সুন্দরবনের দুয়ার খুলল, ঋণের বোঝা আর দস্যুর ভয় নিয়েই নদীতে বনজীবীরা

সাবহেড: তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে ১ সেপ্টেম্বর থেকে জেলে-বাওয়ালি ও পর্যটকদের জন্য সুন্দরবন উন্মুক্ত; বন রক্ষায় মিলেছে সুফল, তবে আয়হীন পরিবারগুলোর দাবি বাড়তি সহায়তা ও নিরাপত্তা

সতক্ষীরার শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সিগঞ্জ ও গাবুরার ঘাটগুলোতে আবারও শুরু হয়েছে কর্মচাঞ্চল্য। দীর্ঘ তিন মাস নোঙর করে থাকা নৌকাগুলো মেরামত করছেন জেলে-বাওয়ালিরা। কেউ জাল সেলাই করছেন, কেউ ইঞ্জিন পরীক্ষা করছেন, আবার কেউ নৌকার কাঠামো ঠিক করে প্রস্তুত করছেন দীর্ঘ লোনা পানির যাত্রার জন্য।

অবশেষে খুলেছে সুন্দরবনের দুয়ার। মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর থেকে বন বিভাগের বৈধ পাস ও পারমিট নিয়ে সুন্দরবনের নদী-খালে মাছ ও কাঁকড়া আহরণে যেতে পারবেন বনজীবীরা। একই সঙ্গে পর্যটকদের জন্যও খুলে দেওয়া হয়েছে সুন্দরবনের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র।

তিন মাস পর বনে ফিরতে পারা উপকূলের মানুষের কাছে শুধু একটি নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার খবর নয়। এটি তাদের কাছে আবারও আয়-রোজগারের সুযোগ, সংসারের খরচ চালানোর আশা এবং জমে থাকা ঋণ পরিশোধের নতুন সম্ভাবনা।

কিন্তু সেই আশার সঙ্গে রয়েছে দুশ্চিন্তাও। নৌকা ও জাল মেরামতের খরচ, মহাজনের দেনা, এনজিওর কিস্তি এবং সবচেয়ে বড় উদ্বেগ—সুন্দরবনের দুর্গম নদীপথে নিরাপত্তা।

কেন তিন মাস বন্ধ থাকে সুন্দরবন?

সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও মৎস্যসম্পদ রক্ষায় প্রতিবছর জুন, জুলাই ও আগস্ট—এই তিন মাস বনাঞ্চলে মাছ-কাঁকড়া আহরণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়।

বর্ষাকালে সুন্দরবনের নদী ও খালগুলোতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণীর প্রজনন ঘটে। একই সময়ে বন্যপ্রাণীর প্রজনন এবং নতুন উদ্ভিদের চারা গজানোর প্রক্রিয়াও চলে।

এই সময়ে মানুষের চলাচল, ইঞ্জিনচালিত নৌযানের শব্দ এবং আহরণের চাপ কমিয়ে সুন্দরবনকে কিছুটা স্বাভাবিক পরিবেশ দেওয়াই নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্য।

আগে জুলাই ও আগস্ট মাসে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকলেও ২০২২ সাল থেকে তা বাড়িয়ে ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত করা হয়।

নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও অবৈধ প্রবেশ

সুন্দরবনে তিন মাসের প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা থাকলেও অবৈধভাবে মাছ ধরা ও বন্যপ্রাণী শিকারের চেষ্টা পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৬৩টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ৩৯টি মামলা হয়েছে এবং আটক করা হয়েছে ৩৭ জনকে।

এ সময় ১২টি ট্রলার, ৫০টি নৌকা ও ৫৫টি মাছ ধরার জাল জব্দ করা হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে বিষের বোতল ও তরল বিষ এবং বন্যপ্রাণী শিকারে ব্যবহৃত ৬ হাজারের বেশি ফাঁদ।

বন বিভাগের দাবি, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার বন অপরাধ কমেছে।

তবে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনা বলছে, নিষেধাজ্ঞার সময়েও একটি অংশ গোপনে সুন্দরবনে প্রবেশের চেষ্টা করেছে।

স্থানীয় বনজীবীদের অভিযোগ, বৈধ জেলেদের প্রবেশ বন্ধ থাকলেও কিছু অসাধু ব্যক্তি দুর্গম নদী-খালে ঢুকে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরে। তাদের দাবি, নিষেধাজ্ঞার সময় দুর্গম নদীপথ ও অভয়ারণ্য এলাকায় নজরদারি আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

তিন মাসে প্রকৃতির স্বস্তি

মানুষের চলাচল কম থাকায় সুন্দরবনে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।

বন কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণে, নদীর তীরে হরিণের বিচরণ তুলনামূলক স্বাভাবিক ছিল। বিভিন্ন খালের চরে বাঘ ও কুমিরের উপস্থিতিও দেখা গেছে। বনের ভেতরে পাখির আনাগোনা এবং বন্যপ্রাণীর চলাচলও ছিল বেশি।

বর্ষার পানিতে সুন্দরী, কেওড়া, বাইনসহ বিভিন্ন উদ্ভিদের নতুন চারা গজানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বন বিভাগের মতে, নৌযানের শব্দ ও মানুষের চাপ কম থাকায় মাছের প্রজনন এবং বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণে অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

তবে পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে এসব সুফল আরও নির্ভুলভাবে যাচাই করতে দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক জরিপ প্রয়োজন। বিশেষ করে মাছের মজুত ও বন্যপ্রাণীর সংখ্যা কতটা বেড়েছে, তা নিয়মিত তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা দরকার।

‘বন বাঁচুক, আমাদেরও বাঁচতে হবে’

সুন্দরবন বন্ধ রাখার প্রয়োজনীয়তা মেনে নিলেও বনজীবীদের বড় প্রশ্ন—এই তিন মাস তারা কীভাবে সংসার চালাবেন?

শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী এলাকার বনজীবী মানিক মোড়ল জানান, বন বন্ধ থাকায় কয়েক মাস কোনো আয় থাকে না। সংসারের খরচ, সন্তানের পড়াশোনা ও চিকিৎসার ব্যয় চালাতে ধার করতে হয়।

তার ভাষ্য, বন খোলার আগেই সেই ঋণের সঙ্গে যুক্ত হয় নৌকা, ইঞ্জিন ও জাল মেরামতের নতুন খরচ।

অন্য বনজীবী বাচ্চু গাইনের মতে, সুন্দরবন খোলার পর প্রথম দিকের আয় দিয়ে মহাজনের টাকা ও এনজিওর কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। এরপর যা থাকবে, তা দিয়েই সংসার চালাতে হবে।

তাদের দাবি, সুন্দরবন সংরক্ষণ করতে হলে নিষেধাজ্ঞা থাকুক, কিন্তু বন্ধ মৌসুমে বননির্ভর পরিবারগুলোর জন্য নিয়মিত সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

৮ হাজারের বেশি পরিবার পেল ভিজিএফ

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় তালিকাভুক্ত প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ জেলে পরিবারের মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ৮ হাজার ২৭১ পরিবারকে জুলাই ও আগস্ট মাসের জন্য পরিবারপ্রতি ৮০ কেজি করে ভিজিএফ চাল দেওয়া হয়েছে।

মোট বিতরণ করা হয়েছে ৬৬১ দশমিক ৬৮ মেট্রিক টন চাল।

তবে বনজীবীদের দাবি, সহায়তার পরিধি আরও বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল সবাই নিবন্ধিত জেলে নন।

বাওয়ালি, মৌয়ালি, নৌকার মাঝি, শ্রমিক, পর্যটন ট্রলারের চালক ও কর্মচারীসহ অনেকের আয়ও নিষেধাজ্ঞার সময় কমে যায়।

তাই তাদের জন্য খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ ও নগদ সহায়তার ব্যবস্থা করার দাবি উঠেছে।

ঋণের সঙ্গে এবার দস্যুর ভয়

বন খোলার আনন্দের মধ্যেও বনজীবীদের বড় উদ্বেগ নিরাপত্তা।

কালিঞ্চি এলাকার বনজীবী শহিদুল গাজী বলেন, ঋণ করে নৌকা ও জাল প্রস্তুত করেছেন। এখন নিরাপদে মাছ ধরতে পারলেই ঋণ পরিশোধের সুযোগ তৈরি হবে।

তবে নদীপথে দস্যুদের চাঁদাবাজি, নৌকা আটকে দেওয়া কিংবা অপহরণের আশঙ্কা থাকলে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করেন তিনি।

কয়েকজন বনজীবীর অভিযোগ, আগের মৌসুমে সুন্দরবনের কিছু নদীপথে দস্যুদের চাঁদা দেওয়ার চাপ ছিল। কোথাও কোথাও নির্দিষ্ট সংকেত বা টাকার নোটের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করার ব্যবস্থার কথাও তারা জানিয়েছেন।

তাদের দাবি, নতুন মৌসুমে দুর্গম নদীপথে বন বিভাগ, কোস্ট গার্ড ও নৌ পুলিশের সমন্বিত টহল বাড়াতে হবে।

পর্যটনেও ফিরছে ব্যস্ততা

সুন্দরবনের দুয়ার খোলার সঙ্গে সঙ্গে পর্যটন ব্যবসায়ও ফিরেছে প্রাণচাঞ্চল্য।

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা পর্যটকবাহী ট্রলার ও নৌযানগুলো পরিষ্কার করা হচ্ছে। ইঞ্জিন পরীক্ষা, কাঠামো মেরামত, রং করা এবং নিরাপত্তাসামগ্রী প্রস্তুতের কাজ চলছে।

সাতক্ষীরা রেঞ্জের কলাগাছিয়া, দোবেকি, কটকা, কচিখালী, হিরণ পয়েন্ট, দুবলার চর ও নীলকমলসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে আবারও দর্শনার্থীদের আনাগোনা শুরু হবে।

পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্তদের মতে, সুন্দরবন খুললে ট্রলার মালিকদের পাশাপাশি চালক, সহকারী, বাবুর্চি, গাইড, দোকানি ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আয়ও বাড়বে।

পর্যটন বাড়ুক, চাপ যেন না বাড়ে

সুন্দরবনে পর্যটন বাড়লেও পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি না করার বিষয়ে সতর্ক থাকার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষ করে নৌযানের সংখ্যা, শব্দদূষণ, প্লাস্টিক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বন্যপ্রাণীর কাছাকাছি পর্যটকদের আচরণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

কারণ তিন মাস মানুষের চাপ থেকে সুন্দরবন কিছুটা স্বস্তি পেলেও অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন ও অতিরিক্ত নৌযান চলাচলে সেই পরিবেশ আবার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

নজরদারি জোরদারের কথা বন বিভাগের

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান জানিয়েছেন, ১ সেপ্টেম্বর থেকে বৈধ পাস ও পারমিটের মাধ্যমে জেলে-বাওয়ালি ও পর্যটকবাহী নৌযানকে সুন্দরবনে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হবে।

তিনি জানান, বনের জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি অবৈধ মাছ ধরা, বিষ প্রয়োগ, বন্যপ্রাণী শিকার ও অননুমোদিত প্রবেশ ঠেকাতে নজরদারি অব্যাহত থাকবে।

দস্যু দমন ও অপরাধ প্রতিরোধে প্রয়োজন অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গেও সমন্বয় করা হবে।

বন বিভাগের দাবি, নিষেধাজ্ঞার সময় স্মার্ট প্যাট্রোলিং, বিশেষ অভিযান ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির কারণে বন অপরাধ আগের তুলনায় নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে।

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

সুন্দরবনের দুয়ার খুলেছে। নদীতে ফিরছে জেলে-বাওয়ালির নৌকা, পর্যটকদের জন্য খুলছে বনভ্রমণের সুযোগ। অর্থনীতিতেও ফিরতে পারে নতুন গতি।

তবে সুন্দরবন রক্ষার পাশাপাশি বননির্ভর মানুষের জীবিকা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

শুধু তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বন সংরক্ষণ নয়—প্রয়োজন বনজীবীদের জন্য কার্যকর বিকল্প জীবিকা, বন্ধ মৌসুমে সহায়তা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ।

একদিকে সুন্দরবনের মাছ, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা; অন্যদিকে সেই বনকে ঘিরে বেঁচে থাকা হাজারো পরিবারের জীবন-জীবিকা—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে পারলেই দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে সুন্দরবন সংরক্ষণ।

১ সেপ্টেম্বর তাই শুধু সুন্দরবনের দুয়ার খোলার দিন নয়; উপকূলের বহু পরিবারের জন্য এটি নতুন করে জীবিকার পথে ফেরার দিন।

সর্বশেষ