সুন্দরবনে নানা ভাই বাহিনীর প্রধানসহ ১২ বনদস্যুর আত্মসমর্পণ
জমা দিলেন ১৩টি আগ্নেয়াস্ত্র, বিপুল গোলাবারুদ ও ওয়াকিটকি
সুন্দরবনের সক্রিয় বনদস্যু ‘নানা ভাই বাহিনী’র প্রধান জাহাঙ্গীর মোড়ল ওরফে রহমতসহ ১২ সদস্য বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। এ সময় তাঁরা ১৩টি আগ্নেয়াস্ত্র, বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ, ম্যাগাজিন ও ওয়াকিটকি জমা দেন।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বাগেরহাটের মোংলায় কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন সদর দপ্তরে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ ও অস্ত্র জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। কোস্ট গার্ডের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে।
ধানসিদ্ধির চর এলাকায় আত্মসমর্পণ
কোস্ট গার্ডের বক্তব্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৬টার দিকে সুন্দরবনের ধানসিদ্ধির চর এলাকায় নানা ভাই বাহিনীর প্রধানসহ ১২ সক্রিয় সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। পরে ১০ সেপ্টেম্বর মোংলায় আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ গ্রহণ করা হয়।
কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে নানা ভাই বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর মোড়ল ওরফে রহমত রয়েছেন।
যে অস্ত্র ও সরঞ্জাম জমা দেওয়া হয়েছে
আত্মসমর্পণের সময় জমা দেওয়া অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে—
- ১টি এইট শুটার
- ১টি সিক্স শুটার
- ১টি ফোর শুটার
- ১টি সাইড হ্যামার
- ১টি বোল্ট অ্যাকশন পিস্তল
- ২টি এমথ্রি গ্যাস গান
- ২টি ৭.৬৫ মিলিমিটার পিস্তল
- ২টি ওয়ান শুটার
- ২টি এয়ারগান
এ ছাড়া জমা দেওয়া হয়েছে ২১২ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, ২৯ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ, ৭.৬৫ মিলিমিটার পিস্তলের ২০ রাউন্ড গুলি, ৮ মিলিমিটারের ৫ রাউন্ড তাজা গোলা, ৪১৩ রাউন্ড এয়ারগানের গুলি, ৪টি পিস্তলের ম্যাগাজিন, ২টি এয়ারগানের ম্যাগাজিন এবং চার্জারসহ ৬টি ওয়াকিটকি।
আত্মসমর্পণকারীদের পরিচয়
আত্মসমর্পণকারীরা হলেন—নানা ভাই বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর মোড়ল ওরফে রহমত (৩৬), সাইফুল্লাহ মোড়ল (৩৯), এখলাছুর রহমান (৩৮), রবিউল ইসলাম (৩৫), মফিজুল ইসলাম (৩৫), আজিম উদ্দিন গাজী (৩৭), আব্দুর রহমান শেখ (৩৬), শফিকুল ইসলাম (৫৩), মিন্টু গাজী (৩৯), আজিজুল গাজী (৩৫), শাহজাহান মালী (৩৫) ও আজিজুর রহমান (৪৫)।
কোস্ট গার্ড সূত্রে জানা গেছে, আত্মসমর্পণকারীদের বাড়ি বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন এলাকায়।
জেলে ও বাওয়ালীদের জিম্মি করে মুক্তিপণের অভিযোগ
কোস্ট গার্ড ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আত্মসমর্পণকারী সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনে ডাকাতি এবং জেলে ও বাওয়ালীদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে থাকা মামলার সংখ্যা বা নির্দিষ্ট আইনি ধারার তথ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
সুন্দরবনে দস্যু দমনে ধারাবাহিক অভিযান
কোস্ট গার্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সুন্দরবনে দস্যু দমনে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার ফলে সক্রিয় বনদস্যুরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। এর আগে ছোট সুমন, বড় জাহাঙ্গীর ও ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনীর মোট ৩৭ সদস্য কোস্ট গার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন বলে জানানো হয়েছে।
কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে সুন্দরবনের সক্রিয় বনদস্যুদের আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। কর্মকর্তারা জানান, আত্মসমর্পণকারীদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
বিশ্লেষণ
সুন্দরবন বাংলাদেশের উপকূলীয় অর্থনীতি, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় জীবিকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ অঞ্চলে বনদস্যুতা ও মুক্তিপণের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের নিরাপত্তার জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। নানা ভাই বাহিনীর প্রধানসহ ১২ সদস্যের আত্মসমর্পণ এবং বিপুল অস্ত্র জমা দেওয়ার ঘটনা সুন্দরবনে অপরাধী চক্রের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চাপ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
তবে আত্মসমর্পণের পরও সুন্দরবনে নিরাপত্তা স্থায়ীভাবে নিশ্চিত করতে নিয়মিত টহল, অপরাধী চক্রের অর্থ ও অস্ত্রের উৎস শনাক্তকরণ, বনজীবীদের নিরাপত্তা এবং আত্মসমর্পণকারীদের আইনি প্রক্রিয়া ও পুনর্বাসন—সবগুলো বিষয় সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া জরুরি। আত্মসমর্পণকারীদের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হলে এ উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে সুন্দরবনের নিরাপত্তা ও স্থানীয় মানুষের আস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মতামত দিন