• ২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৮, শুক্রবার, ১৪৩৩ আশ্বিন ৩
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৭:০৯ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

পাঠ্যবই ছাপাতে দর ফাঁস, সমঝোতার দরপত্র, বাড়তি ব্যয় ২৫২ কোটি টাকা

  • প্রকাশিত ০৭:০৯ অপরাহ্ন শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬
পাঠ্যবই ছাপাতে দর ফাঁস, সমঝোতার দরপত্র, বাড়তি ব্যয় ২৫২ কোটি টাকা
Time Bangla news
মোঃ মিজানুর রহমান | কুমিল্লা বুরো চিফ প্রতিনিধি | টাইম বাংলা নিউজ


প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫: ১২

বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপানোর ঠিকাদারি কাজের একটি বড় অংশ ভাগাভাগি করার অভিযোগ উঠেছে। ঠিকাদারেরা সরকারের প্রাক্কলিত দর আগেই জেনে গিয়েছিলেন এবং সে অনুযায়ী তাঁরা কিছুটা কম–বেশি করে দর দাখিল করে কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন।

মাঝপথে প্রাক্কলিত দর বাড়ানোর ঘটনাও ঘটেছে। শুরুতে সরকার একটি প্রাক্কলিত দর ঠিক করেছিল, তা ফাঁস হয়ে যায় এবং ফাঁস হওয়া দর দেখে ঠিকাদারেরা তা বৃদ্ধির জন্য চাপ দেন।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সেটি মেনে নিয়ে প্রাক্কলিত দর বাড়িয়ে দেয়। পরে ঠিকাদারেরা সমঝোতা করে দরপত্র দাখিল করে কাজ ভাগাভাগি করেন।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রাক্কলিত মূল্য বৃদ্ধি ও কাজ ভাগাভাগির ফলে শুধু মাধ্যমিকের বই ছাপাতে বাড়তি ব্যয় হবে ২৫২ কোটি টাকা।

দর ফাঁস হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন এনসিটিবির একজন সদস্য। অন্যদিকে সরকারি খাতে ক্রয়বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাক্কলিত দর ঠিকাদারদের জানার কথা নয়। মাঝপথে দর বাড়ানো নিয়ম অনুযায়ী হয়নি; আর প্রতিযোগিতা কম হলে সরকারের কাজের ব্যয় বেড়ে যায় এবং গুণগত মান খারাপ হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রাক্কলিত মূল্য বৃদ্ধি ও কাজ ভাগাভাগির ফলে শুধু মাধ্যমিকের বই ছাপাতে বাড়তি ব্যয় হবে ২৫২ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান প্রথম আলোকে বলেন, এবার অনিয়মের কারণে সরকারের খরচ অনেক বাড়বে। তিনি আরও বলেন, ‘মনে হয়েছে, এবার আমার কাজ করার মতো সুষ্ঠু পরিবেশ নেই, তাই অংশ নিইনি।’

৩১ কোটি বই ছাপানো হবে,

সরকার প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে পাঠ্যবই দেয়। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বই ছাপানোর ক্ষেত্রে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠত। কোনো কোনো বছর বইয়ের মান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

২০২৭ সালের জন্য ছাপানো হবে প্রায় ৩১ কোটি বই। মাধ্যমিকের বইয়ের সংখ্যা ২২ কোটির বেশি, বাকিগুলো প্রাথমিকের। বই ছাপার এ কাজে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। সরকারের লক্ষ্য, বছরের শুরুতেই সব শিক্ষার্থীর হাতে বই তুলে দেওয়া। এ জন্য নভেম্বরের মধ্যে জেলা ও উপজেলায় বই পাঠানোর চেষ্টা চলছে।

এবার বই ছাপার প্রক্রিয়া শুরু হয় এনসিটিবির সাবেক চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হক পাটোয়ারীর সময়ে। শুরুতে বাজার যাচাই করে প্রাথমিক স্তরের বইয়ের জন্য প্রতি ফর্মা কাগজের দাপ্তরিক প্রাক্কলিত গড় দর ধরা হয়েছিল ৩ টাকা ২৬ পয়সা। মাধ্যমিক স্তরের জন্য ধরা হয়েছিল ২ টাকা ৮৫ পয়সা।

মনে হয়েছে, এবার আমার কাজ করার মতো সুষ্ঠু পরিবেশ নেই, তাই অংশ নিইনি।

বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান

এই দর অনুযায়ী প্রাথমিক স্তরের বই ছাপার দরপত্র ৩ ও ৪ জুন ইলেকট্রনিক দরপত্রব্যবস্থায় (ইজিপি) ‘লাইভ’ (অনলাইনে আবেদনের সুযোগ দেওয়া) করা হয়। ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বইয়ের দরপত্র ‘লাইভ’ করা হয় ৭ ও ৯ জুন।

এনসিটিবি ও মুদ্রণশিল্পের মালিকদের সূত্রে জানা গেছে, কাগজের যে দর প্রাক্কলন করা হয়েছিল, তা এ পর্যায়ে এসে ফাঁস হয়ে যায়।

প্রাক্কলিত দর ফাঁসের বিষয়টি স্বীকার করেন এনসিটিবির সদস্য আবু নাসের। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বই ছাপার কাজে সাত-আটটি কমিটি রয়েছে। কোনো পর্যায় থেকে তথ্য বাইরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়ে থাকতে পারে। এটা এনসিটিবির দুর্বলতা বলেও স্বীকার করেন তিনি।

এনসিটিবি ও মুদ্রণশিল্পের মালিকদের সূত্রে জানা গেছে, কাগজের যে দর প্রাক্কলন করা হয়েছিল, তা এ পর্যায়ে এসে ফাঁস হয়ে যায়।

কাগজের প্রাক্কলিত দর ছিল গতবারের কাছাকাছি। ঠিকাদারেরা দেখলেন, এই দরে দরপত্র জমা দিয়ে কাজ পেলে মুনাফা কম হবে; তবে সরকারের সাশ্রয় হবে। এ পর্যায়ে ছাপাখানার মালিকদের একটি অংশ একজোট হয়ে প্রাক্কলিত দর বাড়ানোর জন্য আবেদন করেন।

দেশের সরকারি ক্রয়ে প্রাক্কলিত দর ঠিক করা হয় সংশ্লিষ্ট সংস্থার কমিটির মাধ্যমে। কোনো ঠিকাদার প্রাক্কলিত দরের চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি দর দাখিল করলে তিনি প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়ে যান। এ কারণে প্রাক্কলিত দর জানতে পারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ঠিকাদারেরা সাধারণত সরকারি কর্মকর্তাদের বড় অঙ্কের ঘুষ দিয়ে প্রাক্কলিত দর জানার ব্যবস্থা করেন।

এনসিটিবির ৪২৩তম বোর্ড সভার নথিতে বলা হয়েছে, মুদ্রণশিল্পের ৭৫ জন মালিক প্রাক্কলিত দর বাড়ানোর আবেদন করেছিলেন। তাঁদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাক্কলিত দর পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেয় বোর্ড। তবে এই প্রাক্কলিত দর ঠিকাদারদের জানার কথা নয়।

২০২৭ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপাতে কাগজের পরিমাণ ধরা হয়েছে ২৫ লাখ রিম (এক হাজার ফর্মায় এক রিম)। হিসাব করে দেখা যায়, কাগজের প্রাক্কলিত দর বাড়ানোর ফলে সরকারের প্রায় ২৫০ কোটি টাকার বেশি খরচ বাড়তে পারে।

সূত্রের দাবি, অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এনসিটিবির চেয়ারম্যান পদে মাহবুবুল হক পাটোয়ারীর জায়গায় গত ৮ জুন নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁর নাম মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর দরপত্রের প্রক্রিয়া চলাকালেই প্রাক্কলিত দর পুনর্নির্ধারণ করা হয়।

ফখরুল মাওলা ১১ সেপ্টেম্বর মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, কাগজ, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পরিবহন খরচ বাড়ায় এবার প্রাক্কলিত দর বাড়ানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আইন ভঙ্গ হয়নি। তিনি আরও বলেন, সমঝোতা করে দরপত্রে অংশ নিলে প্রতিযোগিতা কমতে পারে। তবে এটি পুরোপুরি এনসিটিবির নিয়ন্ত্রণে নয়।

এনসিটিবির সদস্য আবু নাসেরও দাবি করেন, দরপত্র ‘লাইভ’ হওয়ার পর দর পুনর্নির্ধারণ আইনের লঙ্ঘন নয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানত।

মন্ত্রণালয় আসলেই জানত কি না, তা জানতে শিক্ষাসচিব আবদুল খালেকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ৮ সেপ্টেম্বর কার্যালয়ে গেলে প্রশ্ন শোনার পর তিনি আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

দরপত্রের প্রক্রিয়ার মধ্যে এভাবে প্রাক্কলিত দর বাড়ানো যায় কি না, জানতে চাইলে সরকারি ক্রয় বিষয়ের বিশেষজ্ঞ ও সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের (সিপিটিইউ) সাবেক মহাপরিচালক ফারুক হোসেন   বলেন


সর্বশেষ