• ২০২৬ অক্টোবর ১৯, সোমবার, ১৪৩৩ কার্তিক ৪
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৭:১০ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

ব্যাংকে পরিবারতন্ত্রের অবসান নেই, বদলাচ্ছে শুধু মুখ।*

  • প্রকাশিত ০৭:১০ অপরাহ্ন সোমবার, অক্টোবর ১৯, ২০২৬
ব্যাংকে পরিবারতন্ত্রের অবসান নেই, বদলাচ্ছে শুধু মুখ।*
Time Bangla news
ফজলে এলাহী সুমন | সাভার প্রতিনিধি | টাইম বাংলা নিউজ।

*ব্যাংকে পরিবারতন্ত্রের অবসান নেই, বদলাচ্ছে শুধু মুখ।* 


 *উপশিরোনাম:* পরিচালকের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ, ঋণখেলাপিদের প্রতিও নমনীয়তা; সংস্কারের বদলে মালিকদের স্বার্থ রক্ষার অভিযোগ। 

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে পরিবারতন্ত্র ও প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের আধিপত্য নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের অবসান হচ্ছে না। সরকার পরিবর্তনের পরও ব্যাংক পরিচালনায় পরিবারের নিয়ন্ত্রণ সীমিত করা এবং ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্নে দৃশ্যমান পরিবর্তনের বদলে পুরোনো প্রবণতা বজায় থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের সদস্যদের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ সেই বিতর্ককে আবার সামনে এনেছে।

ব্যাংক খাতে পরিবারতন্ত্রের বিস্তারের পেছনে অতীতের নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রয়াত ব্যাংকার খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের বর্ণনা অনুযায়ী, একসময় একটি বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের পাঁচজন সদস্য ছিলেন। অথচ তৎকালীন আইন অনুযায়ী, একটি পরিবার থেকে সর্বোচ্চ দুজনের পরিচালক হওয়ার সুযোগ ছিল। নিয়ম বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে অতিরিক্ত তিনজন পরিচালককে পদত্যাগ করতে বললেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেছিলেন।

পরবর্তী সময়ে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করে একই পরিবার থেকে চারজন পরিচালক রাখার সুযোগ তৈরি করা হয়। পাশাপাশি পরিচালকদের টানা নয় বছর দায়িত্ব পালনের বিধানও করা হয়। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সংসদে সংশোধনী বিল উত্থাপনের সময় বলেছিলেন, এর মাধ্যমে বেসরকারি ব্যাংকের মালিক ও উদ্যোক্তাদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হবে।

সমালোচকদের মতে, এই পরিবর্তন ব্যাংকের পরিচালনায় মালিক পরিবারের প্রভাব বাড়ানোর পথ প্রশস্ত করে। ফলে পেশাদার ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহি ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিবর্তে কয়েকটি পরিবারের হাতে ব্যাংক পরিচালনার ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

২০২৩ সালে আবারও আইন সংশোধন করা হয়। সংশোধিত বিধান অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি একই ব্যাংকের পরিচালক পদে টানা সর্বোচ্চ ১২ বছর থাকতে পারবেন। এরপর তিন বছরের বিরতি দিয়ে আবার পরিচালক হওয়ার সুযোগ রাখা হয়। এসব পরিবর্তন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে দীর্ঘমেয়াদি পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ ও স্বার্থের সংঘাত নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করে।

ব্যাংক খাতের সংকটের পেছনে সুশাসনের ঘাটতি, ঋণ বিতরণে অনিয়ম, খেলাপি ঋণ এবং প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনায় পরিবারের আধিপত্য বজায় থাকায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ।


আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষে এখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায়। অর্থনীতির দুরবস্থা কাটিয়ে উঠতে ব্যাংক খাতে কাঠামোগত সংস্কারকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে পরিবারতন্ত্র কমানোর ক্ষেত্রে আগের সরকারের নীতির বিপরীতে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।


অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের সদস্যসংখ্যা সর্বোচ্চ দুজনে সীমিত রাখার সংস্কার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট আলোচনায় উঠে আসে। কিন্তু বর্তমান সরকারের সময়ে সেই অবস্থান থেকে সরে এসে একই পরিবারের তিনজনকে পরিচালক হওয়ার সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ঋণখেলাপি পরিচালকদের বিষয়ে কঠোরতা বজায় রাখার প্রশ্নেও নমনীয়তার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।


এ ধরনের পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে ব্যাংক পরিচালনায় মালিক পরিবারের প্রভাব কমানোর পরিবর্তে তা আরও শক্তিশালী হতে পারে। এতে ব্যাংকের স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক স্বার্থ প্রাধান্য পাওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। একই সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদের স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রচেষ্টাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।


ব্যাংক খাতে প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের বিষয়ে অতীতের সিদ্ধান্তগুলোও উদ্বেগের কারণ। ২০১৯ সালের আগস্টে বাংলাদেশ ব্যাংক ১১ জন বড় ঋণগ্রহীতার ঋণ পুনঃতফসিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এসব ঋণগ্রহীতার ঋণ এর আগেও পুনর্গঠন করা হয়েছিল। খেলাপিদের বিরুদ্ধে দেউলিয়াবিষয়ক আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়ায় ঋণ আদায়ে কঠোর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।


বিশ্লেষকদের মতে, বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে ব্যাংক খাতে অনিয়মের ঝুঁকি বাড়ে এবং নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারীদের মধ্যেও নেতিবাচক বার্তা যায়। ঋণ পরিশোধ না করেও প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হলে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়ে।


বাংলাদেশের আর্থিক খাতে প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এক প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলে মনে হয়।


ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই পর্যবেক্ষণ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সরকার পরিবর্তনের পরও যদি পরিচালনা পর্ষদে পরিবারের আধিপত্য, ঋণখেলাপিদের প্রতি নমনীয়তা এবং দুর্বল জবাবদিহির প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।


ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে শুধু আইন সংশোধন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন তার কার্যকর প্রয়োগ, স্বাধীন তদারকি, ঋণ আদায়ে কঠোরতা এবং পরিচালকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। অন্যথায় পরিবারতন্ত্রের কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে শুধু ব্যক্তি বা পরিবারের সদস্য পরিবর্তনের মধ্যেই সংস্কার সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা থাকবে।



সূত্র: প্রথম আলো।

সর্বশেষ