*নদীপথে চিকিৎসার নতুন ঠিকানা, ভাসমান হাসপাতালে সেবা পেয়েছেন সাড়ে ৬ লাখ মানুষ।*
*উপশিরোনাম:* দুর্গম জনপদে সৌদি সহায়তায় পাঁচ ভাসমান হাসপাতালে সেবা পেয়েছেন সাড়ে ৬ লাখ মানুষ।
নদী ও সমুদ্রঘেরা দুর্গম জনপদে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে পাঁচটি ভাসমান হাসপাতাল। এসব হাসপাতালের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৬ লাখ ৩৮ হাজার ৫১২ জন রোগী চিকিৎসাসেবা পেয়েছেন। তাঁদের মোট ৯ লাখ ৬১ হাজার ৪০২ বার বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়েছে।
সৌদি আরবের অর্থায়নে ‘কিং আবদুল্লাহ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল’ প্রকল্পের আওতায় এসব সেবা দেওয়া হচ্ছে। ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেন্ডশিপ ২০২৩ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে হাসপাতালগুলোর কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
ফ্রেন্ডশিপের সিনিয়র ম্যানেজার (জনসংযোগ) জিলফুল মুরাদ শানু এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সর্বশেষ গত ২৮ অক্টোবর খুলনার পাইকগাছা উপজেলার শিবসা নদীতে একটি ভাসমান হাসপাতাল নোঙর করে। ২ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে এর চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম উদ্বোধন করেন খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। হাসপাতালটি আগামী তিন মাস সেখানে অবস্থান করে গড়ইখালীসহ আশপাশের উপকূলীয় এলাকার মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেবে।
সুন্দরবনসংলগ্ন ও নদীবেষ্টিত গড়ইখালী এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা অনুন্নত হওয়ায় সাধারণ মানুষের জন্য দূরে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়া কঠিন। বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন। এমন পরিস্থিতিতে শিবসা নদীতে ভাসমান হাসপাতালের কার্যক্রম স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়েছে।
*যেসব সেবা মিলছে*
হাসপাতালগুলোতে সাধারণ চিকিৎসার পাশাপাশি চোখের ছানি অপারেশন, ছোটখাটো অস্ত্রোপচার, মাতৃস্বাস্থ্য ও প্রসূতিসেবা, দাঁতের চিকিৎসা, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা এবং বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ করা হচ্ছে।
পাঁচটি জাহাজের মধ্যে সবচেয়ে বড়টি ৩১ মিটার দীর্ঘ। এতে সাধারণ ও চোখের অস্ত্রোপচারের জন্য দুটি আধুনিক অপারেশন থিয়েটার রয়েছে। অন্য চারটি জাহাজ ২৫ মিটার দীর্ঘ। প্রতিটি হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী ও ক্রুসহ প্রায় ৩০ জন দায়িত্ব পালন করেন।
জাহাজগুলো মেঘনা, পদ্মা ও যমুনার দুর্গম চরাঞ্চলসহ দক্ষিণাঞ্চল ও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নোঙর করে চিকিৎসাসেবা দেয়।
*সাড়ে ৬ লাখ রোগীকে সেবা*
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুনে কার্যক্রম শুরু করা কেএএপি-এমএইচবি-১ জাহাজটি বর্তমানে বরগুনার আমতলীতে অবস্থান করছে। এ হাসপাতাল থেকে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭১৬ জন রোগী মোট ২ লাখ ৩ হাজার ৭৯৯ বার সেবা পেয়েছেন।
২০২৪ সালের এপ্রিলে চালু হওয়া কেএএপি-এমএইচবি-৩ বর্তমানে পাবনার বেড়ায় অবস্থান করছে। এ হাসপাতাল থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার ১৭৬ জন রোগীকে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৭২০ বার সেবা দেওয়া হয়েছে।
একই সময়ে কার্যক্রম শুরু করা কেএএপি-এমএইচবি-৪ জাহাজের মাধ্যমে ১ লাখ ১৭ হাজার ২১৩ জন রোগী ১ লাখ ৯৩ হাজার ৭৯৪ বার সেবা পেয়েছেন। আর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে চালু হওয়া কেএএপি-এমএইচবি-৫ বর্তমানে বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে রয়েছে।
প্রকল্প ব্যবস্থাপক ফিরোজ আক্তার জানান, সৌদি সরকারের সহায়তায় পাঁচটি ভাসমান হাসপাতাল উপকূলীয় অঞ্চলে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে। এর মধ্যে বাগেরহাটের মোংলা ও খুলনার দাকোপ এলাকাতেও হাসপাতালের কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে পাইকগাছায় আগামী তিন মাস চিকিৎসাসেবা অব্যাহত থাকবে।
স্থানীয় বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, দরিদ্র মানুষের পক্ষে দূরে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়া কঠিন। ভাসমান হাসপাতাল চালু হওয়ায় তাঁরা কাছাকাছি থেকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে পারবেন।
আরেক বাসিন্দা রাজ্জাক শেখ বলেন, উপকূলীয় এলাকায় চিকিৎসকের কাছে যাওয়া ও চিকিৎসার খরচ বহন করা অনেকের জন্য কষ্টসাধ্য। হাসপাতালটির কার্যক্রমে এলাকার অসহায় মানুষ উপকৃত হবেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বলেন, দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ভাসমান হাসপাতাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নদীমাতৃক ও উপকূলীয় অঞ্চলের প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভাসমান হাসপাতালগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এসব হাসপাতাল চিকিৎসার পাশাপাশি দুর্গম এলাকার মানুষের যাতায়াত ও ব্যয়ের ভোগান্তিও কমাচ্ছে।
মতামত দিন