বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের পরামর্শ ভারতীয় সংসদীয় কমিটির
ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করে ঢাকার নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক নতুনভাবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে দেশটির লোকসভার পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। কমিটির মতে, গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ ভারতের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই পারস্পরিক সম্মান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক চেতনা এবং আস্থার ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
সম্প্রতি লোকসভায় উপস্থাপিত কমিটির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দুই দেশের সংসদের মধ্যে নিয়মিত প্রতিনিধিদল বিনিময় এবং সংসদীয় যোগাযোগকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, নতুন নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে তা কাটিয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত সরকারকে স্বাগত জানিয়ে ভারতের পক্ষ থেকে পাঠানো শুভেচ্ছাবার্তা এবং পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে ভারত সফরের আমন্ত্রণকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংসদীয় কমিটি মনে করছে, বর্তমান পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে দুই দেশের অমীমাংসিত বিষয়গুলো দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থ ও সংবেদনশীলতার প্রতি সম্মান দেখিয়ে সম্পর্ককে আরও গতিশীল করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। এ বিষয়ে ভারত সরকার জানিয়েছে, বাংলাদেশের অনুরোধ বিদ্যমান আইন ও প্রচলিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পর্যালোচনা করছে। পাশাপাশি নয়াদিল্লি দাবি করেছে, ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে শেখ হাসিনাকে কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংসদীয় কমিটি। অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা এবং রাজনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের সক্রিয়তা পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি বিদেশি শক্তির কার্যক্রম নিবিড়ভাবে নজরদারির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ জোরদারে ভিসা প্রক্রিয়া দ্রুত স্বাভাবিক করার সুপারিশও করা হয়েছে। কমিটির মতে, দীর্ঘদিন ভিসা জটিলতা অব্যাহত থাকলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের স্বাভাবিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে। ভারত সরকার জানিয়েছে, বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় দেড় হাজার ভিসা দেওয়া হচ্ছে, যার বড় অংশই চিকিৎসাসংক্রান্ত। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ভিসা প্রদান আরও বাড়ানো হবে।
এ ছাড়া সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে কমিটি। যেখানে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ সম্ভব নয়, সেখানে স্মার্ট সেন্সর, লেজার প্রযুক্তি ও অন্যান্য আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। ভারত সরকার জানিয়েছে, সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর প্রস্তাবিত বিভিন্ন প্রযুক্তিগত উদ্যোগ বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
সংসদীয় কমিটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পারস্পরিক আস্থা, নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং জনগণের মধ্যে সম্পর্ক জোরদারের মাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে পারে।
মতামত দিন