• ২০২৬ অগাস্ট ২৫, মঙ্গলবার, ১৪৩৩ ভাদ্র ১০
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৩:০৮ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

এআই ক্যামেরায় বদলাচ্ছে ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা

  • প্রকাশিত ০৩:০৮ অপরাহ্ন মঙ্গলবার, অগাস্ট ২৫, ২০২৬
এআই ক্যামেরায় বদলাচ্ছে ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা
Time Bangla news
ফজলে এলাহী সুমন | সাভার প্রতিনিধি | টাইম বাংলা নিউজ

এআই ক্যামেরায় বদলাচ্ছে ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা


রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন (এআই) ক্যামেরা ও স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল চালুর প inর যানবাহন নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে লাল বাতি উপেক্ষা করে গাড়ি এগিয়ে যাওয়া, স্টপলাইন অতিক্রম, উল্টো পথে চলাচল কিংবা লেন ভাঙার ঘটনা ছিল নিত্যদিনের চিত্র, সেখানে ক্যামেরার নজরদারির কারণে চালকদের মধ্যে নিয়ম মানার প্রবণতা বাড়ছে।

রাজধানীর কাকরাইল, মৎস্য ভবন, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, বাংলামোটর ও সোনারগাঁও রোডসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এআই প্রযুক্তি চালুর পর সিগন্যাল মেনে যানবাহন থামার প্রবণতা বেড়েছে। মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকরাও আগের তুলনায় বেশি সতর্ক হয়ে চলাচল করছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থার অন্যতম বড় সুবিধা হলো ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা। সিগন্যাল অমান্য, স্টপলাইন পার হওয়া, বিপরীত পথে গাড়ি চালানো, লেন ভঙ্গ এবং অবৈধ পার্কিংয়ের মতো অপরাধ ক্যামেরার মাধ্যমে শনাক্ত হচ্ছে। পরে সংশ্লিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এতে প্রতিটি মোড়ে সার্বক্ষণিক পুলিশ সদস্যের উপস্থিতির ওপর নির্ভরতা কমছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ক্যামেরা স্থাপন করলেই রাজধানীর যানজট পুরোপুরি দূর হবে না। এআই প্রযুক্তির পাশাপাশি যানবাহনের নিবন্ধন, চালকের লাইসেন্স, লেন ব্যবস্থাপনা, সড়ক পরিকল্পনা এবং আইন প্রয়োগের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পর্যায়ক্রমে রাজধানীর সব গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়কে প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা গেলে সড়কে শৃঙ্খলা আরও বাড়তে পারে।

তবে এই ব্যবস্থার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইকসহ নিবন্ধনহীন যানবাহন। এসব যানবাহন ক্যামেরায় আইন লঙ্ঘন করতে ধরা পড়লেও বৈধ নিবন্ধন ও নম্বরপ্লেট না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্রযুক্তির আওতায় এলেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সমস্যা হচ্ছে।

এদিকে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের গুরুত্বপূর্ণ ৫০টি ট্রাফিক মোড়ে এআই-সমৃদ্ধ স্বয়ংক্রিয় সংকেতবাতি ও হাই-টেক ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ১০০ কোটি টাকা। প্রতিটি সিগন্যাল পয়েন্ট আধুনিকায়নে গড়ে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয় হবে।

প্রকল্পের আওতায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ২৮টি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ২২টি সিগন্যাল আধুনিকায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। ডিএনসিসির অংশে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫৫ কোটি টাকা এবং ডিএসসিসির জন্য প্রায় ৪৪ কোটি টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়নে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি), বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এবং দুই সিটি করপোরেশন যৌথভাবে কাজ করছে।

এর আগে রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল, বাংলামোটর, সোনারগাঁও, ফার্মগেট, বিজয় সরণি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও জাহাঙ্গীর গেটসহ সাতটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পরীক্ষামূলকভাবে এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব এলাকায় প্রযুক্তি চালুর পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে লাল বাতি জ্বলে উঠলে যানবাহন থামার প্রবণতা বেড়েছে বলে ট্রাফিক সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ডিএনসিসির আওতাধীন প্রস্তাবিত সিগন্যালগুলোর মধ্যে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, আসাদ গেট, গণভবন, মোহাম্মদপুর, কলেজ গেট, টেকনিক্যাল, মাজার রোড, মিরপুর-১, মিরপুর-১০, মিরপুর-১২, মিরপুর-৬, মিরপুর-১৪, আগারগাঁও, গুলশান-১, নিকেতন, তেজগাঁও ও হাতিরঝিল-মগবাজারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা রয়েছে।

অন্যদিকে ডিএসসিসির আওতায় আজিমপুর, নিউমার্কেট, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাঁটাবন, কাকরাইল, বিজয়নগর, দৈনিক বাংলা, বঙ্গভবন, গুলিস্তান, পল্টন, মগবাজার, মিন্টো রোড ও অফিসার্স ক্লাবসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়কে আধুনিকায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. আনিছুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিনের অভ্যাস পরিবর্তন করে নগরবাসীকে ট্রাফিক শৃঙ্খলায় আনা সহজ নয়। তবে এআইনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সাধারণ মানুষের ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। এই উদ্যোগকে মানুষ স্বাগত জানাচ্ছে।

একজন প্রাইভেটকার চালক বলেন, এআই ক্যামেরা বসানোর পর যেসব সড়কে প্রযুক্তিটি চালু হয়েছে, সেখানে চালকদের আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মামলা হওয়ার আশঙ্কায় চালকরা এখন সিগন্যাল ও অন্যান্য ট্রাফিক আইন মেনে চলার বিষয়ে বেশি সতর্ক। রাজধানীর সব গুরুত্বপূর্ণ সড়কে এ ব্যবস্থা চালু করা গেলে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকর হবে বলে তিনি মনে করেন।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, ঢাকা শহরের ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে ডিজিটাল ব্যবস্থায় নেওয়া হচ্ছে। তবে প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, চালকরা সিগন্যাল না মানলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না। প্রচলিত পদ্ধতিতে আইন ভঙ্গকারী গাড়ি থামিয়ে মামলা করলে পেছনে যানজট তৈরি হয়। তাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দিকে এগোনো প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে পথচারীদের অনিয়ন্ত্রিত চলাচলও যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। তাই এআই ক্যামেরা ও ডিজিটাল সিগন্যালের পাশাপাশি সড়কের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে।

সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, পরীক্ষামূলক পর্যায়ের সাফল্যের পর রাজধানীর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সড়কেও এআই ক্যামেরা ও স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হবে। নিবন্ধনহীন যানবাহনকে ডিজিটাল নিবন্ধনের আওতায় এনে পুরো সড়ক ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির মধ্যে আনা গেলে ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।

সর্বশেষ