লোকাল-মেইল ট্রেন বন্ধে বিপাকে নিম্নআয়ের যাত্রীরা, বেড়েছে যাতায়াত খরচ
ভৈরব-ময়মনসিংহ রেলপথে একের পর এক লোকাল ও মেইল ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ ও নিম্নআয়ের যাত্রীরা। একসময় এ পথে ছয়টি লোকাল ও মেইল ট্রেন চলাচল করলেও বর্তমানে সবগুলোই বন্ধ। সর্বশেষ চালু থাকা ময়মনসিংহ মেইলও গত সোমবার থেকে বন্ধ রয়েছে।
কম ভাড়ায় দূরের বাজার, কর্মস্থল কিংবা নিজ বাড়িতে যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম ছিল এসব ট্রেন। ১০ থেকে ২০ টাকা ভাড়ায় বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছানোর সুযোগ থাকায় শ্রমজীবী ও স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে ট্রেনগুলো ছিল বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন তাদের অনেক বেশি খরচ করে বিকল্প পরিবহনে চলাচল করতে হচ্ছে।
ভৈরব থেকে ময়মনসিংহের রেলপথের দূরত্ব প্রায় ১১৬ কিলোমিটার। এ পথে লোকাল ট্রেনের ভাড়া ছিল ৪০ টাকা এবং মেইল ট্রেনে ৫৫ টাকা। বর্তমানে লোকাল ও মেইল ট্রেন না থাকায় যাত্রীদের নির্ভর করতে হচ্ছে আন্তনগর ট্রেনের ওপর। এতে ভাড়া গুনতে হচ্ছে ১২৭ টাকা। এর ওপর আন্তনগর ট্রেন সব স্টেশনে না থামায় প্রত্যন্ত এলাকার যাত্রীদের বাড়তি যানবাহন ব্যবহার করতে হচ্ছে।
রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, মূলত লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিনের সংকটের কারণে নাসিরাবাদ ট্রেনটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে ট্রেনটি ঠিক কবে আবার চালু হবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশ রেলওয়ের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট (পূর্ব) মোহাম্মদ সফিকুর রহমান বলেন, লোকোমোটিভ সংকটের কারণে নাসিরাবাদ ট্রেনটি বন্ধ রয়েছে। এটি সাময়িক সিদ্ধান্ত। ইঞ্জিন সংকট কমে এলে ট্রেনটি পুনরায় চালু করা হবে।
🙋 বুধবার দুপুরে ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনের ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মে ট্রেনের অপেক্ষায় ছিলেন বেশ কয়েকজন শ্রমজীবী মানুষ। তাঁদের মধ্যে ছিলেন নেত্রকোনার পূর্বধলার ওলিউর রহমান, কালু মিয়া, সুজাউদ্দিন ও কাবিল মিয়া। তাঁরা কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন এবং সাধারণত মাসে একবার বাড়িতে যাতায়াত করেন।
এক সপ্তাহ আগে নাসিরাবাদ ট্রেনে করে তাঁরা বাড়িতে এসেছিলেন। বুধবার কুমিল্লায় ফেরার সময় পূর্বধলা স্টেশনে গিয়ে জানতে পারেন, ট্রেনটি আর চলছে না। পরে বাধ্য হয়ে কয়েক দফা যানবাহন পরিবর্তন করে সড়কপথে ভৈরব স্টেশনে পৌঁছান। সেখান থেকে কর্ণফুলী ট্রেনে কুমিল্লা যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন তাঁরা।
ওলিউর রহমান বলেন, আগে কুমিল্লা থেকে ট্রেনে উঠে পূর্বধলা স্টেশনে নেমে বাড়ি যেতে পারতেন। পুরো যাত্রায় খরচ হতো তুলনামূলক কম। কিন্তু নাসিরাবাদ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাড়তি যানবাহন ব্যবহার করতে হচ্ছে এবং ব্যয়ও বেড়ে গেছে।
তিনি জানান, বাড়ি থেকে ১০ টাকা অটোরিকশা ভাড়া দিয়ে পূর্বধলায় আসেন। সেখান থেকে ৪০ টাকা সিএনজি ভাড়ায় শ্যামগঞ্জ, এরপর ৪০ টাকা দিয়ে গৌরীপুর এবং ১৫ টাকা ভাড়ায় খলতাপাড়ায় যান। পরে ১৫০ টাকা বাসভাড়া দিয়ে ভৈরব পৌঁছান। স্টেশন পর্যন্ত আসতে আরও ১৫ টাকা খরচ হয়। এরপর কুমিল্লা যেতে ট্রেনভাড়া দিতে হবে ৬০ টাকা।
দলের আরেক সদস্য কালু মিয়া বলেন, আগে এক মাস বা দেড় মাস পরপর বাড়িতে যাওয়া সম্ভব হতো। এখন নাসিরাবাদ ট্রেন বন্ধ থাকায় বাড়ি যাওয়ার খরচ এতটাই বেড়েছে যে তিন মাসের আগে বাড়িতে যাওয়ার কথা ভাবাও কঠিন।
করোনায় বন্ধ, আর চালু হয়নি অনেক ট্রেন
রেলওয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, করোনাভাইরাসের সংক্রমণের সময় দেশের বিভিন্ন রুটে অনেক ট্রেন বন্ধ করা হয়েছিল। পরে বেশ কিছু ট্রেন পুনরায় চালু হলেও ভৈরব-ময়মনসিংহ রুটের বন্ধ হয়ে যাওয়া লোকাল ট্রেনগুলো আর ফিরিয়ে আনা হয়নি।
এদিকে যাত্রীদের পাশাপাশি মালামাল পরিবহন নিয়েও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এ সমস্যা কিছুটা কমাতে বিজয় এক্সপ্রেসের সঙ্গে আপাতত একটি লাগেজ বগি সংযুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে রেলওয়ে।
নাসিরাবাদ ট্রেন কবে নাগাদ আবার চালু হবে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট (পূর্ব) মোহাম্মদ সফিকুর রহমান বলেন, লোকোমোটিভ সংকটের কারণে ট্রেনটি বন্ধ রয়েছে। সংকট কমলে এটি চালু করা হবে। তবে নির্দিষ্ট সময় জানাতে হলে আরও অপেক্ষা করতে হবে।
মতামত দিন