ভোরের ঢাকায় ছিনতাইয়ের আতঙ্ক, প্রাণহানিতে বাড়ছে উদ্বেগ
ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবন যখন দিনের আলোয় ফিরতে শুরু করে, তার আগের কয়েক ঘণ্টাই যেন হয়ে উঠছে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। মধ্যরাত পেরিয়ে ভোর পর্যন্ত অনেক সড়ক থাকে তুলনামূলক ফাঁকা। গণপরিবহন ও দোকানপাটের সংখ্যা কম থাকায় এই সময়টিকে কাজে লাগিয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে ছিনতাইকারী চক্র। কখনো পথচারী, কখনো রিকশাযাত্রী—হঠাৎ হামলা কিংবা ব্যাগ টান দিয়ে কেড়ে নেওয়ার ঘটনায় ঘটছে গুরুতর আহত ও প্রাণহানির মতো ঘটনা।
সর্বশেষ গত ২৯ আগস্ট ভোর সাড়ে ৬টার দিকে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজার সামনে এমনই এক ঘটনায় প্রাণ হারান বগুড়ার বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রনজিনা পারভীন। রিকশায় করে হাসপাতালে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলে থাকা ছিনতাইকারীরা তার হাতের ব্যাগ ধরে টান দেয়। হ্যাঁচকা টানে চলন্ত রিকশা থেকে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ভোরের সময়ে এমন ঘটনা রাজধানীতে নতুন নয়। গত কয়েক বছর ধরে ভোররাত থেকে সকাল পর্যন্ত বিভিন্ন সড়কে ছিনতাই, ছুরিকাঘাত ও হামলার ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় প্রাণহানির পাশাপাশি গুরুতর আহত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
*ভোরের সড়কেই প্রাণ গেছে অনেকের*
চলতি বছরের জুনে ঈদের ছুটি শেষে ঢাকায় ফেরার পর রিকশায় যাত্রার সময় ছিনতাইকারীর টানে পড়ে গুরুতর আহত হন এক নারী। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
এর আগে ২০২৩ সালের ১ জুলাই ভোর সোয়া ৪টার দিকে রাজধানীর ফার্মগেটে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন পুলিশ কনস্টেবল মনিরুজ্জামান তালুকদার।
২০২৪ সালের ২৪ অক্টোবর ভোরে ঢাকার কেরানীগঞ্জে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন অটোরিকশাচালক মো. নয়ন (২৫)। ছিনতাইকারীরা তাকে আঘাত করে অটোরিকশাটি নিয়ে পালিয়ে যায়।
এ ছাড়া ২০২৪ সালে ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ভোরে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে বের হওয়া শ্রমিক ও পেশাজীবীদের ওপর হামলার অভিযোগও পাওয়া যায়।
২০২৫ সালে যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী এলাকায় এক পুলিশ সদস্য ছিনতাইকারীদের হামলার শিকার হন। একই বছর মোহাম্মদপুরে ছিনতাইয়ের চেষ্টাকালে স্থানীয়দের গণপিটুনিতে হানিফ নামে এক ব্যক্তি নিহত হন।
*কেন ভোরেই ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য?*
পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্টদের মতে, ভোররাত থেকে সকাল পর্যন্ত সময়টি ছিনতাইকারীদের জন্য তুলনামূলক সুবিধাজনক হয়ে ওঠে কয়েকটি কারণে।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর অনেক সড়ক ফাঁকা হয়ে যায়। ২০২৩ সালে পুলিশ কনস্টেবল মনিরুজ্জামান হত্যার পরও ঢাকা মহানগর পুলিশ জানিয়েছিল, রাত ২টার পর নগরীর অনেক সড়কে মানুষের চলাচল কমে যাওয়ায় ছিনতাইকারীরা এ সময়টিকে বেছে নেয়।
ভোরে বাস, ট্রেন কিংবা লঞ্চে করে ঢাকায় আসা যাত্রীদের চলাচলও অনেকটা অনুমানযোগ্য। নির্দিষ্ট পরিবহনকেন্দ্র থেকে নির্দিষ্ট পথে যাতায়াত করায় তাদের গতিবিধি সহজেই অনুসরণ করতে পারে অপরাধীরা।
এ সময় অধিকাংশ দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। ফলে সড়কে প্রত্যক্ষদর্শীর সংখ্যাও কম থাকে। ছিনতাইয়ের পর দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করার সুযোগ পায় অপরাধীরা।
*এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে* মোটরসাইকেল ব্যবহার করে দ্রুত হামলা ও পালিয়ে যাওয়ার কৌশল। চলন্ত রিকশা বা মোটরসাইকেল থেকে ব্যাগ টেনে নেওয়ার পর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তারা সড়ক থেকে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে।
*কোথায় বেশি ঝুঁকি?*
রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঝুঁকি নির্দিষ্ট একটি এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়। পুলিশের বিভিন্ন সময়ের তথ্য ও চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, মগবাজার, মালিবাগ রেলগেট, কাকরাইল, মতিঝিল, গুলিস্তান, ফুলবাড়িয়া, কমলাপুর, বাবুবাজার, রাজারবাগ, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, ওয়ারী, গেন্ডারিয়া, জুরাইন রেলগেট, মিরপুর-১ থেকে টেকনিক্যাল মোড়, মিরপুর-৬-এর শিয়ালবাড়ী মোড়, কালশী, বাড্ডা, ভাটারা, বসিলা, জাতীয় সংসদ ভবনের সামনের সড়ক, হাতিরঝিল ও বিমানবন্দর-সংলগ্ন এলাকা।
তবে এসব স্থানকে সবসময় ভোরের ছিনতাইয়ের নির্দিষ্ট হটস্পট বলা যায় না। সামগ্রিকভাবে ছিনতাইপ্রবণ এলাকার মধ্যে যেসব স্থানে ভোরে যাত্রী ও কর্মজীবী মানুষের চলাচল বেশি, রাস্তা তুলনামূলক নির্জন এবং দ্রুত পালানোর সুযোগ রয়েছে—সেসব স্থান এ সময়ে বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এ হিসাবে ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, কমলাপুর, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, গুলিস্তান, মতিঝিল, ওয়ারী, মিরপুর, বাড্ডা ও ভাটারা এলাকায় ভোরের সময়ে বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে।
ডিএমপির তথ্যভিত্তিক এক বিশ্লেষণে তেজগাঁও বিভাগে ৫১টি ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। মতিঝিলে ৩২টি, মিরপুরে ২৭টি, রমনায় ২৫টি এবং গুলশানে ২১টি হটস্পটের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
*দুই বছরে ৭০৩ মামলা, গ্রেপ্তার ১,৮৩৭*
ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা ও গ্রেপ্তারের পরিসংখ্যানও নগরীর পরিস্থিতির একটি চিত্র তুলে ধরে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রাজধানীতে ছিনতাই-সংক্রান্ত ৫৩১টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১ হাজার ৪৩৫ জনকে। ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত মামলা হয়েছে ১৭২টি এবং গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪০২ জনকে।
অর্থাৎ দুই বছরে মোট ৭০৩টি মামলা হয়েছে এবং এসব ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ১ হাজার ৮৩৭ জন।
বিভাগভিত্তিক তথ্যেও ছিনতাইয়ের ব্যাপকতা স্পষ্ট। ২০২৫ সালে রমনা বিভাগে ৪১টি মামলায় ১৪৪ জন, লালবাগে ২৭টি মামলায় ৫৩ জন, ওয়ারীতে ৯৩টি মামলায় ২১৭ জন এবং মতিঝিলে ১০১টি মামলায় ১৪৪ জন গ্রেপ্তার হন।
তেজগাঁও বিভাগে ২০২৫ সালে ১৪৬টি মামলায় ৫১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। মিরপুরে ৫৫টি মামলায় ২১৯ জন, গুলশানে ২৭টি মামলায় ৭৩ জন এবং উত্তরা বিভাগে ৪১টি মামলায় ৭৫ জন গ্রেপ্তার হন।
২০২৬ সালের হিসাবেও বিভিন্ন বিভাগে মামলা ও গ্রেপ্তার অব্যাহত রয়েছে। তেজগাঁও বিভাগে এ সময়ে ৩৪টি মামলায় ১৩৮ জন, ওয়ারীতে ৩৮টি মামলায় ৯৮ জন এবং মিরপুরে ১৬টি মামলায় ৪০ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন।
*রাত থেকে সকাল—বিশেষ নজরদারিতে পুলিশ*
ভোরের ছিনতাই ঠেকাতে সম্প্রতি রাজধানীতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। মধ্যরাত থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মোহাম্মদ ওসমান গনি জানান, ছিনতাই প্রতিরোধে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ৮৯টি চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। প্রতিটি চেকপোস্টে একজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে আটজন করে পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন।
একই সময়ে প্রতিটি থানার অধীনে চার থেকে পাঁচটি মোবাইল পেট্রোল টিম মাঠে রয়েছে। প্রতিটি টিমে একজন কর্মকর্তাসহ সাতজন করে সদস্য কাজ করছেন।
ডিএমপির হিসাবে শুধু এসব বিশেষ চেকপোস্ট ও মোবাইল পেট্রোল টিমেই প্রায় ২ হাজার ১১২ থেকে ২ হাজার ৪৬২ জন পুলিশ সদস্য মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করছেন। এর বাইরে নিয়মিত টহল, পিকেট, ফুড পেট্রোলসহ অন্যান্য দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরাও মাঠে রয়েছেন।
ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন বলেন, রাজধানীর নিরাপত্তায় দিন-রাত বিভিন্ন ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা চালু থাকে। বিভিন্ন এলাকায় চেকপোস্টের পাশাপাশি ফুড পেট্রোল, মোবাইল পার্টি ও পিকেট পার্টি দায়িত্ব পালন করে।
তার ভাষ্য, মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট ডিসি, এডিসি ও এসিরা নিয়মিত তদারক করেন। কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে মামলা নেওয়ার পাশাপাশি জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়।
*নিরাপদ ভোরের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ*
পরিসংখ্যান ও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বলছে, দিনের অন্য সময়ের তুলনায় ভোররাত থেকে সকাল পর্যন্ত নগরীর কিছু অংশে অপরাধের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে পরিবহনকেন্দ্র, নির্জন সড়ক এবং কর্মস্থলমুখী মানুষের চলাচলের পথগুলোতে নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
শুধু চেকপোস্ট কিংবা টহল বাড়ালেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার, তাদের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনের ওপর নজরদারি, সিসিটিভি কার্যকর রাখা এবং অপরাধপ্রবণ স্থানগুলোতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা—সবকিছুকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগাতে হবে।
কারণ ঢাকার সকাল শুরু হওয়ার আগের কয়েক ঘণ্টা যেন নগরবাসীর জন্য আতঙ্কের সময় না হয়ে ওঠে—এটাই এখন বড় প্রশ্ন।
মতামত দিন