ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে নতুন দিগন্ত: উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে দিলে ইউনিটপ্রতি ১০.৫০ টাকা
বিশেষ প্রতিবেদক| ঢাকা | ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার। নতুন ব্যবস্থায় কোনো গ্রাহক নিজের প্রয়োজন মেটানোর পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করলে প্রতি ইউনিটের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা হারে মূল্য পাবেন।
বিদ্যুৎ বিভাগ গত ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। একই দিন থেকে নতুন প্রণোদনা ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে। একাধিক জাতীয় ও অর্থনৈতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং সরকারি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ডাটাবেজে পাওয়া তথ্য যাচাই করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
৮ টাকার বিদ্যুৎ, বিক্রি হবে ১০.৫০ টাকায়
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে সর্বোচ্চ ব্যয় ধরা হয়েছে প্রতি ইউনিট ৮ টাকা। এর সঙ্গে ২০ শতাংশ মুনাফা এবং ১১.২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম যোগ করে গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা ৫০ পয়সা প্রতি ইউনিটে।
অর্থাৎ, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী গ্রাহক শুধু নিজের বিদ্যুৎ বিল কমাবেন না; উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে দিয়ে একটি নির্ধারিত আয়ের সুযোগও পাবেন।
আর কোনো গ্রাহক যদি নির্ধারিত ৮ টাকা ইউনিটের চেয়েও কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারেন, তাহলে সেই সাশ্রয়কে তার অতিরিক্ত লাভ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
কারা পাবেন এই সুবিধা?
প্রণোদনা পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা হলো ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭।
নেট মিটারিং নির্দেশিকা-২০২৫ অনুসরণ করে যারা ওই সময়ের মধ্যে ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করবেন, তারা নিজের ব্যবহার শেষে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করলে এই বিশেষ প্রণোদনার আওতায় আসবেন।
তবে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এর পর স্থাপন করা নতুন সিস্টেম এই বিশেষ ১০.৫০ টাকা প্রণোদনার আওতায় থাকবে না।
কতদিন পাওয়া যাবে?
এই বিশেষ ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—যোগ্য গ্রাহকরা ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০৩০ পর্যন্ত গ্রিডে সরবরাহ করা উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের জন্য প্রতি ইউনিট ১০.৫০ টাকা হারে মূল্য পাবেন। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিস্টেম স্থাপন করতে পারলে প্রায় তিন বছর এই বিশেষ ক্রয়মূল্যের সুবিধা পাওয়া যাবে।
টাকা কীভাবে পাওয়া যাবে?
প্রণোদনার অর্থ নগদে দেওয়া হবে না। বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো গ্রাহকের তথ্য এবং গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের পরিমাণ সংরক্ষণ করবে। এরপর নির্ধারিত অর্থ ব্যাংক হিসাব বা অনুমোদিত মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে পরিশোধের ব্যবস্থা থাকবে। কিছু প্রতিবেদনে পরিশোধের সময়কাল প্রতি তিন মাস অন্তর বলা হয়েছে।
যন্ত্রপাতির মান নিয়েও কঠোরতা
সরকার শুধু সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে উৎসাহ দিচ্ছে না, ব্যবহৃত সরঞ্জামের মান নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়েছে।
সোলার প্যানেল, ব্যাটারি, ইনভার্টার, মিটারসহ সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামকে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI) এবং টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (SREDA) নির্ধারিত কারিগরি মানদণ্ড পূরণ করতে হবে।
বাংলাদেশে কেন গুরুত্বপূর্ণ এই উদ্যোগ?
সরকারের নতুন উদ্যোগটি এমন সময়ে এসেছে যখন দেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।
SREDA-এর জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি ডাটাবেজের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত নেট-মিটারিংভিত্তিক ছাদ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সংখ্যা ৫,০৬৭টি এবং মোট সক্ষমতা প্রায় ৩৬৫.৬৩২ MWp।
অর্থাৎ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ এখন আর কেবল পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নয়; এটি দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার একটি ক্রমবর্ধমান অংশে পরিণত হচ্ছে।
বিশেষ করে কারখানা, গার্মেন্টস, গুদাম, বাণিজ্যিক ভবন, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বড় আবাসিক ভবনের বিশাল ছাদ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা সম্ভব।
সম্প্রতি সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের একটি গবেষণাতেও বাংলাদেশের শিল্পকারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুতের বড় সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। গবেষণায় ৩,৩২০টি RMG ও টেক্সটাইল কারখানার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ছাদভিত্তিক সৌর সক্ষমতা প্রায় ১,৭৬৮ MWp হিসেবে হিসাব করা হয়েছে
সাধারণ মানুষের জন্য এর অর্থ কী?
নতুন নীতির ফলে একটি বাড়ি, প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চাইলে তিনভাবে লাভবান হতে পারে—
প্রথমত: নিজের উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কেনার প্রয়োজন কমবে।
দ্বিতীয়ত: দিনের বেলায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাবে।
তৃতীয়ত: যোগ্য সিস্টেমের ক্ষেত্রে সেই উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের জন্য প্রতি ইউনিট ১০.৫০ টাকা পাওয়া যাবে।
ফলে সৌরবিদ্যুৎ এখন শুধু বিদ্যুৎ বিল কমানোর প্রযুক্তি নয়; সঠিকভাবে পরিকল্পনা করলে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত বিনিয়োগ ও অতিরিক্ত আয়ের উৎস হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
তবে বাস্তবে কোনো প্রকল্প কতটা লাভজনক হবে তা নির্ভর করবে সিস্টেমের আকার, প্যানেলের দক্ষতা, ব্যাটারির দাম ও আয়ু, ছাদের ব্যবহারযোগ্য জায়গা, সূর্যালোক, রক্ষণাবেক্ষণ এবং অর্থায়ন খরচের ওপর
ব্যবসার জন্য নতুন সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাটি দেখা যেতে পারে OPEX/RESCO মডেলে। অর্থাৎ ভবন বা কারখানার মালিক নিজে পুরো বিনিয়োগ না করে তৃতীয় কোনো প্রতিষ্ঠান সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন ও পরিচালনা করতে পারে এবং উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রির মাধ্যমে বিনিয়োগের রিটার্ন অর্জন করতে পারে।
বাংলাদেশে ইতোমধ্যে নেট-মিটারিংয়ের আওতায় হাজার হাজার সিস্টেম চালু রয়েছে। SREDA-এর ডাটাবেজে এসব প্রকল্পের তথ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
এর ফলে আগামী সময়ে Solar EPC, rooftop solar investment, battery storage, maintenance, monitoring এবং renewable-energy financing খাতে নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে বিনিয়োগকারীদের জন্য সতর্কতা
১০.৫০ টাকা ইউনিটের ঘোষণা দেখে সরাসরি কোনো সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগ করার আগে কয়েকটি বিষয় যাচাই করা জরুরি।
সিস্টেমটি ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এর মধ্যে স্থাপনের যোগ্য কি না।
নেট মিটারিংয়ের সব শর্ত পূরণ হচ্ছে কি না।
প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারি নির্ধারিত মানের কি না।
প্রকৃত উৎপাদন সক্ষমতা কত।
ব্যাটারির replacement cost কত।
ছাদের structural capacity যথেষ্ট কি না।
বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার অনুমোদন ও মিটারিং প্রক্রিয়া কীভাবে হবে।
EPC প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা ও পূর্ববর্তী প্রকল্প যাচাই করা হয়েছে কি না।
নেট মিটারিং নির্দেশিকা-২০২৫-এ গ্রাহকের যোগ্যতা, মিটার, গ্রিড সংযোগ এবং বিদ্যুৎ হিসাব সংক্রান্ত বিস্তারিত বিধান রয়েছে।
সরকারের জন্যও বড় সুযোগ
এই নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বাংলাদেশের হাজার হাজার ভবনের অব্যবহৃত ছাদকে সম্ভাব্য বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে রূপান্তর করা।
একটি বড় কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিবর্তে অসংখ্য বাড়ি, কারখানা ও প্রতিষ্ঠানের ছাদে ছোট ছোট সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা তৈরি হলে distributed generation বাড়বে। এতে দিনের বেলায় স্থানীয়ভাবে বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো, জ্বালানি আমদানির ওপর চাপ কমানো এবং জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের অংশ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
মূল তথ্য এক নজরে
বিষয় সরকারি নতুন ব্যবস্থার তথ্য
প্রকল্প ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ
উৎপাদন ব্যয়ের সর্বোচ্চ হিসাব ৮ টাকা/ইউনিট
নির্ধারিত ক্রয়মূল্য ১০.৫০ টাকা/ইউনিট
মুনাফা ২০%
প্রিমিয়াম ১১.২৫%
সিস্টেম স্থাপনের শেষ সময় ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭
প্রণোদনা পাওয়ার শেষ সময় ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০৩০
শর্ত নিজের ব্যবহার শেষে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ
অর্থ প্রদান ব্যাংক/মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল চ্যানেল
যন্ত্রপাতি BSTI ও SREDA-এর কারিগরি মানদণ্ড অনুযায়ী
সারকথা: সরকারের নতুন উদ্যোগটি বাংলাদেশের rooftop solar বাজারে একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। বিশেষ করে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এর সময়সীমা সামনে থাকায় আগামী কয়েক মাসে বাড়ি, কারখানা, বাণিজ্যিক ভবন ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যাটারিসহ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের আগ্রহ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ, EPC এবং তৃতীয় পক্ষের অর্থায়নভিত্তিক ব্যবসার নতুন বাজারও তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সূত্র: বিদ্যুৎ বিভাগ/সরকারি প্রজ্ঞাপন, SREDA National Database, এবং The Daily Star, Financial Express, bdnews24, NTV, Ittefaq, Kaler Kantho ও অন্যান্য প্রতিবেদন।
মতামত দিন