ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে নরসিংদী জুড়ে ৪০টি চোরাই তেলের আখড়া: প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সম্পদ, নেপথ্যে শক্তিশালী সিন্ডিকেট
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নরসিংদী অংশ এখন চোরাই জ্বালানি তেল কারবারিদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। মহাসড়কের কারারচর, কুন্দারপাড়া, গাবতলী, মরজাল, বারৈচা এবং পাঁচদোনা-ডাঙ্গা সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা প্রকাশ্যে চলছে চোরাই ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের রমরমা বাণিজ্য। মহাসড়কের অদূরে গড়ে ওঠা অন্তত ৪০টি অবৈধ দোকানে প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার সরকারি ও বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের তেল কেনাবেচা হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, অফিশিয়াল পিকআপ ও তেলের ট্যাংকারের অসাধু চালকরা মহাসড়কের এসব চিহ্নিত পয়েন্টে গাড়ি থামিয়ে জোগান দিচ্ছে চোরাই তেলের। এমনকি সরকারি গাড়ি এবং 'পদ্মা', 'মেঘনা' ও 'যমুনা' তেল কোম্পানির ট্যাংকার থেকেও অবাধে তেল নামানো হয়। এসবের পাশাপাশি প্রাণ-আরএফএল, সিমেন্ট ও প্রক্রিয়াজাত পণ্য পরিবহনকারী বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কাভার্ডভ্যান ও ট্রাকের চালকরা নিয়মিতভাবে এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত।
ডিজেল, পেট্রোল কিংবা অকটেনের মতো দাহ্য পদার্থ বিক্রির জন্য বিস্ফোরক অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও বৈধ লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলক হলেও এই ৪০টি দোকানের একটিরও কোনো আইনি বৈধতা নেই। দোকানীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চালকদের কাছ থেকে তারা বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে অর্থাৎ প্রতি লিটার ডিজেল ৯০ টাকা এবং পেট্রোল ও অকটেন ১০০ টাকা দরে কিনে নেয়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দেশের সাম্প্রতিক বিভিন্ন সহিংসতা ও আন্দোলনের সময় যখন জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট চলছিল, তখন অপরাধীরা এসব চোরাই দোকান থেকেই আলাদা পাত্রে জ্বালানি তেল কিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে জ্বালাও-পোড়াও ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছিল। সরকারের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও উন্মুক্ত পাত্রে দাহ্য পদার্থের এই অবাধ বেচাকেনা যেকোনো সময় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করছে।
মহাসড়কের কারারচর এলাকার এক তেল কারবারি আল-আমিনের কাছে ব্যবসার আইনি বৈধতা সম্পর্কে জানতে চাইলে সে স্বীকার করে, "আমাদের কোনো বিস্ফোরক লাইসেন্স নেই, ব্যবসা সম্পূর্ণ অবৈধ।" লাইসেন্স ছাড়া কীভাবে এ ব্যবসা চলছে—এমন প্রশ্নের জবাবে কয়েকজন কারবারি দম্ভোক্তি করে জানান, তাদের নিজস্ব সমিতি রয়েছে। সমিতির মাধ্যমে স্থানীয় নামধারী কিছু দালাল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভুয়া-আসল পরিচয়ে আসা ব্যক্তিবর্গকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের মাসোহারা (মান্থলি) দেওয়া হয়।
তারা আরও দাবি করেন, গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ করে তাদের কোনো ক্ষতি করা যাবে না; কারণ ওপর থেকে নিচ—সব পর্যায় 'ম্যানেজ' করেই এই অবৈধ রাজ্য গড়ে তোলা হয়েছে।
এদিকে, মহাসড়কে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্বে নিয়োজিত শিবপুর ও ইটাখোলা হাইওয়ে পুলিশের রহস্যজনক নীরবতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সাধারণ চালকরা। একাধিকবার সংবাদপত্র, টিভি ও অনলাইন পোর্টালে এই চোরাই চক্র নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলেও প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। সরকারি সম্পদ চুরি ও মহাসড়কে দাহ্য পদার্থের অবৈধ কেনাবেচা বন্ধে অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন সচেতন মহল।
মতামত দিন