• ২০২৬ অক্টোবর ০৩, শনিবার, ১৪৩৩ আশ্বিন ১৮
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৪:১০ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

*নবায়ন নয়, নতুন গঙ্গা চুক্তি।*

  • প্রকাশিত ০৯:১০ অপরাহ্ন শনিবার, অক্টোবর ০৩, ২০২৬
*নবায়ন নয়, নতুন গঙ্গা চুক্তি।*
Time Bangla news
ফজলে এলাহী সুমন | সাভার প্রতিনিধি | টাইম বাংলা নিউজ।

*নবায়ন নয়, নতুন গঙ্গা চুক্তি।* 


 *উপশিরোনাম:* শুষ্ক মৌসুমে পানির নিশ্চয়তা চায় ঢাকা | ঘাটতি হলে দায় ভাগাভাগির কাঠামো নিয়েও আলোচনা ।

গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নতুন করে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ১২ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা। এর আগে পুরনো চুক্তি কেবল নবায়নের পরিবর্তে নতুন বাস্তবতার আলোকে একটি কার্যকর চুক্তি চায় বাংলাদেশ। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে ন্যূনতম পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে আইনি গ্যারান্টি চাচ্ছে ঢাকা।

১৯৯৬ সালের চুক্তিতে ফারাক্কায় গঙ্গার প্রবাহের ওপর ভিত্তি করে নির্দিষ্ট সূত্রে দুই দেশের মধ্যে পানি ভাগ করার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু পানির প্রবাহ অত্যন্ত কমে গেলে বাংলাদেশের জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি নিশ্চিত করার সরাসরি বাধ্যবাধকতা নেই। এ জায়গাতেই নতুন চুক্তিতে পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে বাংলাদেশ।

 *ন্যূনতম পানির নিশ্চয়তা চায় ঢাকা* 

বাংলাদেশের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন চুক্তিতে এমন একটি ব্যবস্থা প্রয়োজন, যাতে গঙ্গার প্রবাহ কমে গেলেও বাংলাদেশের জন্য ন্যূনতম পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে। ১৯৭৭ সালের ফারাক্কা চুক্তিতে থাকা গ্যারান্টি ব্যবস্থার বিষয়টিও এ আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।

বাংলাদেশের পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এর আগে নতুন চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন। সরকারের যুক্তি, ভাটির দেশ হিসেবে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার প্রবাহের পূর্বানুমেয়তা বাংলাদেশের কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

 *পানি কমলে প্রভাব পড়বে বিস্তৃত অঞ্চলে* 

গঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের পর পদ্মা নামে প্রবাহিত হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে এ নদীর পানি কমে গেলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এর বহুমুখী প্রভাব পড়ে। নদীর নাব্যতা কমা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনে চাপ এবং সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।

তাই বাংলাদেশের কাছে শুধু কত কিউসেক পানি পাওয়া যাবে, সেটিই মূল বিষয় নয়। পানি পাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা এবং সংকটের সময় দুই দেশ কীভাবে ঘাটতি মোকাবিলা করবে, সেটিও নতুন চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।

 *জলবায়ু পরিবর্তনেও বদলেছে হিসাব* 

১৯৯৬ সালের চুক্তির সময়কার নদীর প্রবাহ, বৃষ্টিপাত ও পানির প্রাপ্যতার হিসাব এখন আগের মতো নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টিপাতের ধরন, খরা ও নদীর প্রবাহে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ফলে কয়েক দশক আগের তথ্যের ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যতের পানি বণ্টন নির্ধারণ করলে নতুন সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ কারণে ভবিষ্যৎ চুক্তিতে নিয়মিত তথ্য হালনাগাদ, যৌথভাবে পানিপ্রবাহ পরিমাপ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

 *ফারাক্কার পাশাপাশি হার্ডিঞ্জ ব্রিজের তথ্য* 

পানি বণ্টনের হিসাবের ক্ষেত্রে ফারাক্কা ব্যারাজের প্রবাহ পরিমাপ গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাংলাদেশে প্রবেশের পর পদ্মায় প্রকৃতপক্ষে কত পানি পৌঁছাচ্ছে, সেটিও যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে। এ কারণে ফারাক্কা ও বাংলাদেশের হার্ডিঞ্জ ব্রিজে পানিপ্রবাহের তথ্য সংগ্রহ এবং দুই দেশের মধ্যে তথ্য বিনিময়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

২০২৬ সালের মে মাসে দুই দেশের কারিগরি বিশেষজ্ঞরা ফারাক্কা পরিদর্শন করে পানিপ্রবাহসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করেন। পরবর্তী সময়ে যৌথ নদী কমিশনের কারিগরি পর্যায়ে এসব তথ্য পর্যালোচনা করা হয়।

 *ভারতের অভ্যন্তরীণ সমীকরণও গুরুত্বপূর্ণ* 

গঙ্গার পানি বণ্টন শুধু বাংলাদেশ ও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের দ্বিপক্ষীয় বিষয় নয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের স্বার্থও এর সঙ্গে জড়িত। পশ্চিমবঙ্গের পক্ষ থেকে পানীয় জল, কৃষি, শিল্প, হুগলি নদীর নাব্যতা ও কলকাতা বন্দরের স্বার্থের বিষয়গুলো সামনে আনা হয়েছে।

বিহারেও গঙ্গার পানি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আপত্তি ও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে নতুন চুক্তির ক্ষেত্রে নয়াদিল্লিকে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও আন্তঃরাজ্য বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে।

 *শুধু গ্যারান্টি ক্লজই যথেষ্ট নয়* 

নতুন চুক্তিতে ন্যূনতম পানিপ্রবাহের নিশ্চয়তা থাকলেও নদীতে প্রকৃত পানি না থাকলে সেই নিশ্চয়তা বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। তাই পানি কমে গেলে উভয় দেশ কীভাবে ঘাটতি ভাগ করবে, কোন পর্যায়ে জরুরি আলোচনা শুরু হবে এবং তথ্য নিয়ে মতবিরোধ হলে কীভাবে তা নিষ্পত্তি হবে—এসব বিষয়ও চুক্তিতে স্পষ্ট করার প্রয়োজন রয়েছে।

বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের আলোচনায় তাই *ন্যূনতম প্রবাহ, যৌথভাবে পানির তথ্য যাচাই, তথ্যের স্বচ্ছতা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা* গুরুত্ব পেতে পারে।

চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসায় এখন আলোচনার মূল চ্যালেঞ্জ হলো কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ নতুন সমঝোতায় পৌঁছানো। শেষ পর্যন্ত নতুন চুক্তির কাঠামো কেমন হবে এবং শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের পানির নিশ্চয়তা কতটা কার্যকর হবে—সেদিকেই নজর থাকবে।

সর্বশেষ