• ২০২৬ অক্টোবর ০৬, মঙ্গলবার, ১৪৩৩ আশ্বিন ২১
  • সর্বশেষ আপডেট : ১২:১০ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

চালকের ঘাম, মালিকের জমা—লাভের আসল হিসাব কোথায় ?*

  • প্রকাশিত ০১:১০ অপরাহ্ন মঙ্গলবার, অক্টোবর ০৬, ২০২৬
চালকের ঘাম, মালিকের জমা—লাভের আসল হিসাব কোথায় ?*
Time Bangla news
ফজলে এলাহী সুমন | সাভার প্রতিনিধি | টাইম বাংলা নিউজ।

*চালকের ঘাম, মালিকের জমা—লাভের আসল হিসাব কোথায় ?* 


 *উপশিরোনাম:* চালকের দৈনিক আয় থেকে মালিকের জমা, চার্জিং ও গ্যারেজে বড় লেনদেন;স্থানীয় ‘টোকেন’ ব্যবস্থায় অস্বচ্ছ অর্থপ্রবাহের অভিযোগ। নিয়ন্ত্রণহীনতায় বাড়ছে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি।

রাজধানীর অলিগলি থেকে আবাসিক এলাকা—সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ছুটছে হাজারো ব্যাটারিচালিত রিকশা। যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি এসব যানকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বড় একটি অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। চালকের দৈনিক আয় থেকে মালিকের জমা, ব্যাটারি চার্জ, গ্যারেজ ভাড়া, মেরামত, যন্ত্রাংশ এবং কোথাও কোথাও কথিত ‘টোকেন’—বিভিন্ন খাতে ভাগ হয়ে যাচ্ছে অর্থ।

ফলে রাস্তায় যে রিকশার চাকা ঘুরছে, তার সঙ্গে ঘুরছে মালিক, চালক, গ্যারেজ ও চার্জিং ব্যবসার টাকার চাকা। কিন্তু এই অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি শ্রম দেওয়া চালকের হাতে শেষ পর্যন্ত কতটা থাকছে—সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ‘আরবান মোবিলিটি স্টাডি: রিকশা ইন ট্রানজিশন’ গবেষণায় ঢাকার ৩৮৪ জন রিকশাচালক, ৩৯২ জন যাত্রী এবং ৬৩টি গ্যারেজ মালিকের তথ্য নেওয়া হয়। এতে দেখা যায়, ব্যাটারিচালিত রিকশার ৭৯ শতাংশ চালক নিজস্ব গাড়ি চালান না। তাদের দৈনিক গড় আয় ৮৮০ টাকা। একই সঙ্গে চালকদের গড় ঋণের পরিমাণ প্রায় ৭৯ হাজার ৯২৭ টাকা।

 *চালকের ঘাম, মালিকের জমা* 

মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, অনেক চালক প্রতিদিন ৪০০ টাকা পর্যন্ত মালিককে জমা দেন। এর বাইরে ব্যাটারি চার্জে খরচ হয় প্রায় ১২০ থেকে ১৩০ টাকা। খাবার ও অন্যান্য ব্যক্তিগত ব্যয় বাদ দেওয়ার পর দিন শেষে চালকের হাতে থাকে আনুমানিক ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা।

হাজারীবাগের রিকশাচালক রেজাউল ইসলাম জানান, প্রতিদিন মালিকের জমা ও চার্জের টাকা দেওয়ার পর যা থাকে, তা দিয়েই তাকে সংসার চালাতে হয়। মাসে ২৬ দিন গাড়ি চালাতে পারলে তার হাতে প্রায় ১৮ থেকে ২১ হাজার টাকা থাকতে পারে।

তার ভাষায়, প্রতিদিন আয় এক থাকে না। বৃষ্টি, যাত্রী সংকট কিংবা গাড়ির সমস্যায় আয় কমে যায়। তারপরও বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় এই পেশাতেই থাকতে হচ্ছে।

আরেক চালক চাঁনমিয়া সরদারের হিসাবে, কোনো কোনো দিন ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত আয় হলেও মালিকের জমা, চার্জ এবং খাবারের খরচ বাদ দিলে হাতে থাকে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। তার অভিযোগ, পথে চলাচলের সময় কোথাও কোথাও অতিরিক্ত অর্থও দিতে হয়।

 *মালিকের বিনিয়োগ কত দিনে ফেরে?* 

ঢাকায় একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা কিনতে প্রায় ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া যায়। গাড়ির ধরন ও চুক্তি অনুযায়ী চালকের কাছ থেকে দৈনিক ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত জমা নেওয়া হয়।

কামরাঙ্গীরচরের রিকশামালিক দেলোয়ার বেপারির পাঁচটি গাড়ি রয়েছে। তিনি জানান, তার প্রতিটি গাড়ি থেকে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ টাকা করে জমা আসে। ২৬ দিন জমা পাওয়া গেলে মাসে একটি গাড়ি থেকে আয় হয় ১০ হাজার ৪০০ টাকা। তবে এটিকে পুরোপুরি লাভ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

টায়ার, মোটর, ব্রেক, লাইট, ব্যাটারি ও অন্যান্য যন্ত্রাংশের পেছনে নিয়মিত খরচ করতে হয়। গাড়ি নষ্ট থাকলে জমাও বন্ধ থাকে। ফলে কাগজে-কলমে যে সময়ে বিনিয়োগ উঠে আসার কথা, বাস্তবে সময় লাগে আরও বেশি।

হাজারীবাগের মালিক মিজান বেপারির হিসাবে, একটি ভালো মানের গাড়িতে মোটর, ব্যাটারি ও কন্ট্রোলারসহ প্রায় ২ লাখ টাকা বিনিয়োগ হয়। প্রতিদিন ৫০০ টাকা জমা পাওয়া গেলে মাসে ২৬ দিনে ১৩ হাজার টাকা আসে। তবে ব্যাটারি পরিবর্তন, দুর্ঘটনা, মেরামত ও গাড়ি বন্ধ থাকার সময়ের ক্ষতি বাদ দিলে প্রকৃত মুনাফা অনেক কমে যায়।

 *চার্জিং পয়েন্টেও বড় লেনদেন* 

ব্যাটারিচালিত রিকশার অর্থনীতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলো চার্জিং ও গ্যারেজ ব্যবসা। হাজারীবাগের একটি গ্যারেজে প্রায় ৮০ থেকে ১০০টি রিকশা রাখার তথ্য দিয়েছেন গ্যারেজ মালিক মো. আরিফ হোসেন।

তার হিসাবে, ৮০টি গাড়ি প্রতিদিন ১২০ টাকা করে চার্জ নিলে দৈনিক লেনদেন দাঁড়ায় প্রায় ৯ হাজার ৬০০ টাকা। মাসে তা প্রায় ২ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। তবে এই অর্থের পুরোটাই গ্যারেজ মালিকের লাভ নয়। বিদ্যুৎ বিল, জায়গার ভাড়া, কর্মচারীর বেতন ও মেরামতসহ নানা খরচ রয়েছে।

কামরাঙ্গীরচরের গ্যারেজ মালিক শাহাবুদ্দিন শাবুর কাছেও রয়েছে একই ধরনের হিসাব। তার গ্যারেজে প্রায় ৬০ থেকে ৭০টি রিকশা থাকে। প্রতিটি গাড়ি দিনে একবার চার্জ নিলে মাসে কয়েক লাখ টাকার লেনদেন হয়। তবে বিদ্যুতের খরচ ও অন্যান্য ব্যয় বাদ দিলে প্রকৃত আয় অনেক কমে যায়।

 *টোকেনের নামে কার পকেটে যায় টাকা?* 

ব্যাটারিচালিত রিকশার অর্থনীতির সবচেয়ে অস্বচ্ছ অংশগুলোর একটি হলো কথিত টোকেন ব্যবস্থা। চালক ও গ্যারেজ মালিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু এলাকায় মাসে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। বিনিময়ে দেওয়া হয় টোকেন বা কার্ড।

মোহাম্মদপুরের চালক বশির মিয়ার অভিযোগ, নির্দিষ্ট টাকা না দিলে এলাকায় রিকশা চালাতে সমস্যায় পড়তে হয়। তবে এই অর্থ সরকারি কোনো ফি কি না, কার কাছে যায় কিংবা এর কোনো আনুষ্ঠানিক হিসাব আছে কি না—তা তারা জানেন না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই এলাকার এক গ্যারেজ মালিক জানান, অনেক সময় চালকদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে স্থানীয়ভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে দিতে হয়। তবে এ ব্যবস্থার লিখিত অনুমোদন বা সরকারি হিসাব তারা দেখেননি বলে দাবি করেন।

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয়ভাবে টোকেনের মাধ্যমে টাকা নেওয়ার বিষয়টি তাদেরও নজরে এসেছে। নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে বিষয়টি যাচাই করা হবে। অনুমোদন ছাড়া অর্থ আদায়ের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে পুলিশ।

 *‘এই খাত বন্ধ করলে বিকল্প কর্মসংস্থানও লাগবে’* 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ শাহাদাত হোসাইন সিদ্দিকীর মতে, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা ও গ্রামীণ শ্রমবাজারের পরিবর্তনের কারণে অনেকে শহরে এসে রিকশা বা অটোরিকশা চালানোর মতো কাজে যুক্ত হচ্ছেন।

তার মতে, ব্যাটারিচালিত রিকশাকে শুধু যানবাহন হিসেবে দেখলে এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়। মালিকানা, দৈনিক জমা, চার্জিং, গ্যারেজ, মেরামত ও ব্যাটারি—সব মিলিয়ে এখানে একটি বিস্তৃত অর্থনৈতিক চক্র তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, এই খাত সীমিত বা বন্ধ করার উদ্যোগ নিলে এর সঙ্গে যুক্ত মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থানের বিষয়টিও একই সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। পাশাপাশি নিবন্ধন, মালিকানা, চলাচল এবং চার্জিং ব্যবস্থা আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনা প্রয়োজন।

 *চাহিদার ভিত্তিতে গাড়ির সংখ্যা নির্ধারণের পরামর্শ* 

পরিবহন পরিকল্পনাবিদ আবদুল্লাহ আল ফাহাদের মতে, কম বিনিয়োগে তুলনামূলক দ্রুত অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ থাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় বিনিয়োগ বাড়ছে। এর সঙ্গে চালক, মালিক, গ্যারেজ ও চার্জিং ব্যবসাকে ঘিরে গড়ে উঠছে বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।

তবে তিনি মনে করেন, কোনো এলাকায় যাত্রী চাহিদার তুলনায় বেশি অটোরিকশা থাকলে যানজট ও বিশৃঙ্খলা বাড়বে। আবার প্রয়োজনের তুলনায় কম থাকলে যাত্রী পরিবহনে সংকট তৈরি হবে। তাই অঞ্চলভিত্তিক সমীক্ষার মাধ্যমে কতটি অটোরিকশা প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা জরুরি।

তার পরামর্শ, বর্তমানে রাস্তায় চলাচলকারী গাড়িগুলোকে আগে নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে। নতুন গাড়ি অনুমোদনের ক্ষেত্রেও যাত্রী চাহিদা, সড়কের সক্ষমতা ও এলাকার পরিবহন প্রয়োজন বিবেচনায় নিতে হবে।

 *অদৃশ্য অর্থনীতিকে আনতে হবে দৃশ্যমান কাঠামোয়* 

ব্যাটারিচালিত রিকশার একটি দিনের আয়কে বাইরে থেকে দেখলে তা চালকের উপার্জন বলেই মনে হয়। কিন্তু সেই অর্থের একটি অংশ যায় মালিকের জমায়, একটি অংশ চার্জিংয়ে, আরেকটি অংশ গ্যারেজ ও মেরামতে। কোথাও আবার টোকেনের নামে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

অর্থাৎ একটি রিকশার চাকা ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে বহু হাত বদল হচ্ছে টাকা। এই অর্থপ্রবাহের কতটা বৈধ, কতটা অনানুষ্ঠানিক এবং কোথায় রাষ্ট্রের রাজস্ব হারাচ্ছে—তা নির্ধারণের জন্য পূর্ণাঙ্গ হিসাব ও নজরদারি প্রয়োজন।

 *বিশেষজ্ঞদের মতে, চালকের জীবিকা রক্ষা, মালিকের বিনিয়োগ, গ্যারেজ-চার্জিং ব্যবসা এবং রাষ্ট্রের রাজস্ব—সব পক্ষকে বিবেচনায় রেখে একটি স্বচ্ছ নিয়ন্ত্রিত কাঠামো তৈরি করা গেলে এই অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় আনা সম্ভব।*

সর্বশেষ