*ইনানীর শোক না কাটতেই, কক্সবাজারে সাগরে ডুবে প্রাণ গেল আরও ৪ পর্যটকের।*
*উপশিরোনাম:* ইনানীতে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যুর চার দিনের মাথায় আরেক ট্র্যাজেডি, এখনো নিখোঁজ একজন।
কক্সবাজারের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে একের পর এক দুর্ঘটনায় বাড়ছে উদ্বেগ। ইনানীতে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের প্রাণহানির চার দিনের মাথায় এবার রামুর পেঁচারদ্বীপে সাগরের জোয়ারের পানিতে তলিয়ে চার পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আরও একজন নিখোঁজ রয়েছেন। স্থানীয়দের সহায়তায় প্রাণে বেঁচেছেন তিনজন।
বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেলে কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়কের হিমছড়ি-সংলগ্ন পেঁচারদ্বীপ জাদুঘরের কাছে রেজুখাল ও সমুদ্রের মধ্যবর্তী একটি চরে এ দুর্ঘটনা ঘটে। বৃহস্পতিবার সকালে উদ্ধার করা হয় নিহতদের একজনের মরদেহ। নিখোঁজ পর্যটকের সন্ধানে তল্লাশি চলছিল।
রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিল্লুর রহমান দুর্ঘটনা ও হতাহতের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
*নিহত ও নিখোঁজ যারা*
নিহত চার পর্যটকের মধ্যে দুজন ঢাকার এবং দুজন চট্টগ্রামের বাসিন্দা।
ঢাকার নিহত দুই পর্যটক হলেন উত্তরা দিয়াবাড়ি এলাকার মোকারম হোসেনের ছেলে আল মাহিবুল ইবনে মোকারম ওরফে রোহান (২৩) এবং দক্ষিণখান এলাকার মাহবুবুল হকের ছেলে সাইফুল হক জিসান (২৩)।
চট্টগ্রামের নিহত দুই পর্যটক হলেন বায়েজিদ শেরশাহ জামতলা এলাকার মো. এরশাদের ছেলে মো. আকাশ (২০) এবং একই এলাকার মো. কবিরের ছেলে মো. হারুন (২০)। বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার দিকে দুর্ঘটনাস্থলের কাছাকাছি সাগর বিলাস এলাকা থেকে হারুনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় নিখোঁজ রয়েছেন ঢাকার উত্তরা আজমপুর এলাকার লাবিবর রহমানের ছেলে এস এম নাফিজুর রহমান নিবিড় (২৩)।
*জোয়ারে তলিয়ে যায় বিচ্ছিন্ন চর*
স্থানীয় প্রশাসন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, পর্যটকদের দুটি দল পেঁচারদ্বীপ জাদুঘর-সংলগ্ন রেজুখাল পেরিয়ে খাল ও সমুদ্রের মাঝখানে জেগে ওঠা একটি চরে বেড়াতে যান। বিকেলে জোয়ার শুরু হলে ওই এলাকায় দ্রুত পানি বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে পানিতে তলিয়ে যায় চরটি। পরিস্থিতি বুঝে ওঠার আগেই কয়েকজন পর্যটক স্রোত ও পানির মধ্যে পড়ে যান।
এ সময় স্থানীয় লোকজন চট্টগ্রাম থেকে আসা একটি পর্যটক দলের তিন সদস্যকে উদ্ধার করেন। তাঁদের কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দুর্ঘটনার পর প্রথমে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। পরে বৃহস্পতিবার সকালে আরও একজনের মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে চারজনে দাঁড়ায়।
জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন চট্টগ্রামের বায়েজিদ এলাকার মৃত আবুল কালামের ছেলে রাকিব হাসান (১৯), একই এলাকার মৃত ছগিরের ছেলে মো. সানী (২০) এবং সেখানে বসবাসকারী নোয়াখালীর মো. হেলালের ছেলে মো. আকাশ।
*দুই দলের পর্যটক, একই বিপদ*
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সানী ও আকাশ জানান, বুধবার দুপুর ১২টার দিকে ট্রেনে তাঁরা কক্সবাজার পৌঁছান। পেঁচারদ্বীপের একটি রিসোর্টে ওঠার পর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সমুদ্রে গোসল করতে নামেন। পরে রেজুখাল পেরিয়ে চরে যান। সেখানে অন্য একটি পর্যটক দলকেও একই পথে চরে যেতে দেখেন তাঁরা।
অন্যদিকে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাত শিক্ষার্থীর একটি দল ১৮ অক্টোবর রাতে ঢাকা থেকে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে রওনা হন। পরদিন তাঁরা বান্দরবানের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে দেখেন। বুধবার দুপুরে কক্সবাজারের হিমছড়ি এলাকার ‘শোর নেস্ট বিচ ক্যাম্প’ রিসোর্টে ওঠেন তাঁরা। পরে বিকেলে পেঁচারদ্বীপ জাদুঘর-সংলগ্ন সৈকতে গোসল করতে নেমে দুর্ঘটনার শিকার হন ওই দলের সদস্যরা।
ইউএনও মো. জিল্লুর রহমান জানান, উদ্ধার হওয়া তিনজনের মরদেহের আইনগত প্রক্রিয়া শেষে বুধবার রাতে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। নিখোঁজ পর্যটকদের উদ্ধারে সাগরে তল্লাশি চালানো হচ্ছিল। বৃহস্পতিবার সকালে হারুনের মরদেহ পাওয়া গেলেও অপর নিখোঁজ পর্যটক নিবিড়ের বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
*পর্যটনকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ*
কক্সবাজারের পর্যটন এলাকায় ধারাবাহিক প্রাণহানির ঘটনা নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। গত ১৭ অক্টোবর সকালে মেরিন ড্রাইভের ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রেস্তোরাঁ অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জন নিহত হন। সেই শোক কাটতে না কাটতেই পেঁচারদ্বীপে সাগরে ডুবে চার পর্যটকের মৃত্যু হলো।
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করা, জোয়ার-ভাটার বিষয়ে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া, বিপৎসংকেত ও নির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন এবং উদ্ধারব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ করে রেজুখালের মতো জোয়ারে ডুবে যেতে পারে—এমন চর ও বিচ্ছিন্ন এলাকায় পর্যটকদের চলাচল নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি পর্যটকদেরও স্থানীয় প্রশাসন ও উদ্ধারকর্মীদের নির্দেশনা মেনে চলা এবং জোয়ারের সময় খাল পেরিয়ে বিচ্ছিন্ন চরে যাওয়া থেকে বিরত থাকা জরুরি।
পর্যটননগরী কক্সবাজারে মানুষের প্রাণহানি ঠেকাতে পর্যটনসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় প্রশাসন ও উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর সমন্বিত নিরাপত্তাব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি।
মতামত দিন