**বরেন্দ্রের রুক্ষ লাল মাটিতে সবুজের বিপ্লব, ৫৫ শতাংশ জমিতে ২৭০০ গাছের বন ।*
*উপশিরোনাম:* মিয়াওয়াকি পদ্ধতিতে দেশি ও বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ সংরক্ষণের উদ্যোগ সোহেল রানার, দেখছেন কার্বন ক্রেডিটে আয়ের সম্ভাবনা।
নওগাঁ: শুষ্ক আবহাওয়া, রুক্ষ লাল মাটি আর ক্রমসংকুচিত বনাঞ্চল—বরেন্দ্র অঞ্চলে সবুজের বিস্তার বরাবরই চ্যালেঞ্জের। সেই প্রতিকূলতার মধ্যেই স্বল্প জায়গায় ঘন বন গড়ে তোলার অভিনব উদ্যোগ নিয়েছেন কৃষি উদ্যোক্তা সোহেল রানা। নওগাঁর সাপাহার উপজেলা সদরে নিজের প্রতিষ্ঠিত বরেন্দ্র এগ্রো পার্কে মিয়াওয়াকি পদ্ধতিতে গড়ে তুলেছেন দেশি ও বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদের সমন্বয়ে একটি বন। প্রায় ৫৫ শতাংশ জমিতে রোপণ করেছেন দুই হাজার ৭০০ গাছ ও লতাগুল্ম। তাঁর প্রত্যাশা, এ উদ্যোগ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে কার্বন ক্রেডিটের মাধ্যমে আয়ের সুযোগও তৈরি করবে।
সাপাহার উপজেলার গোডাউনপাড়া এলাকায় প্রায় ১৫০ বিঘা জমির ওপর গড়ে উঠেছে বরেন্দ্র এগ্রো পার্ক। এর একটি অংশে তৈরি করা হয়েছে মিয়াওয়াকি বন। উদ্যোক্তার দাবি, এখানে দেশি, ফলদ, বনজ, ঔষধি ও শোভাবর্ধক উদ্ভিদের পাশাপাশি রয়েছে এ অঞ্চলে হারিয়ে যেতে বসা পাঁচ শতাধিক প্রজাতির গাছ ও লতাগুল্ম।
সোহেল রানার ভাষ্য, উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলার মধ্যে তাঁর উদ্যোগেই প্রথম মিয়াওয়াকি পদ্ধতিতে বন গড়ে তোলা হয়েছে। প্রজাতির বৈচিত্র্য বিবেচনায় এটি দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ মিয়াওয়াকি বন হয়ে উঠবে বলে আশা করছেন তিনি।
*স্বল্প জায়গায় ঘন বন*
মিয়াওয়াকি পদ্ধতি জাপানি উদ্ভিদবিদ ও উদ্ভিদ বাস্তুবিদ্যা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আকিরা মিয়াওয়াকির উদ্ভাবিত একটি বনায়ন কৌশল। এ পদ্ধতিতে স্থানীয় পরিবেশের উপযোগী বিভিন্ন প্রজাতির গাছ ঘনভাবে রোপণ করা হয়। মাটির গুণাগুণ উন্নয়ন, জৈব উপাদান যোগ এবং উপযুক্ত প্রজাতি নির্বাচনের মাধ্যমে গাছের বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হয়।
প্রচলিত বনায়নের তুলনায় কম জায়গায় বৈচিত্র্যময় বন গড়ে তোলার সুযোগ এ পদ্ধতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যথাযথ পরিচর্যা ও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে গাছের দ্রুত বৃদ্ধি এবং পাখি, কীটপতঙ্গসহ বিভিন্ন প্রাণীর আবাস ও খাদ্যের সংস্থান তৈরিতেও ভূমিকা রাখতে পারে এমন বন।
তবে বরেন্দ্র অঞ্চলের শুষ্ক আবহাওয়া এ ধরনের বনায়নের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে জমি প্রস্তুত, মাটির গুণাগুণ উন্নয়ন, জৈব সার প্রয়োগ, চারা সংগ্রহ এবং মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে জৈব মালচিংসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নিতে হয়েছে সোহেল রানাকে।
*সাংবাদিকতা ছেড়ে কৃষি উদ্যোক্তা*
সোহেল রানা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৯ সালে পরিসংখ্যান বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ঢাকায় প্রায় ছয় বছর সাংবাদিকতা করেন। এরপর কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে নিজ জেলা নওগাঁয় ফিরে গড়ে তোলেন বরেন্দ্র এগ্রো পার্ক।
সোহেল রানা বলেন, মিয়াওয়াকি পদ্ধতিতে চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে দেশের প্রথম কৃত্রিম বন তৈরি হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলার মধ্যে তিনিই প্রথম এ উদ্যোগ নিয়েছেন বলে তাঁর দাবি। তাঁর মতে, এ ধরনের বনায়ন প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
উদ্ভিদ ও প্রকৃতিবিষয়ক গবেষক মোকারম হোসেন বলেন, দেশের বনাঞ্চল ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। বরেন্দ্র অঞ্চলের শুষ্ক পরিবেশে বন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ থাকলেও উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করে দেশি ও বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির গাছ লাগানোর মাধ্যমে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন সম্ভব।
তিনি মনে করেন, যেসব ফাঁকা জায়গায় আগে ঝোপঝাড় ও দেশি গাছপালা ছিল, সেগুলোকে বনায়নের আওতায় আনা যেতে পারে। এতে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর জন্য খাদ্যের সংস্থান বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও সহায়তা মিলবে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞ মনজুর হোসেন বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে বৃষ্টিপাত তুলনামূলক কম হওয়ায় মিয়াওয়াকি পদ্ধতিতে বন গড়ে তোলা কিছুটা কঠিন। তবে পরিকল্পিত উদ্যোগ ও যথাযথ পরিচর্যার মাধ্যমে এ পদ্ধতিতে বনায়ন করা সম্ভব।
তাঁর মতে, এ ধরনের বন কার্বন শোষণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে শুষ্কতা কমানো কিংবা স্থানীয় পরিবেশে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার বিষয়টি নির্ভর করবে বনের বিস্তৃতি, গাছের প্রজাতি, পরিচর্যা ও পরিবেশগত অবস্থার ওপর।
*কার্বন ক্রেডিটে আয়ের সম্ভাবনা*
পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি মিয়াওয়াকি বনকে ঘিরে কার্বন ক্রেডিটের মাধ্যমে আয়ের সম্ভাবনাও দেখছেন উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। গাছ বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে নিজেদের বৃদ্ধি ও জৈব পদার্থ তৈরিতে ব্যবহার করে। ফলে পরিকল্পিত বনায়ন জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে পারে।
কার্বন ক্রেডিট নিয়ে কাজ করছে সাসটেইনেবল এগ্রিকালচার ফাউন্ডেশন (সাফ)। প্রতিষ্ঠানটি উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে জানা গেছে।
সংস্থাটির প্রকল্প ব্যবস্থাপক ফরহানুল হক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও কৃষকদের বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরিতে কৃত্রিম বনভিত্তিক কার্বন ক্রেডিট প্রকল্প সম্ভাবনাময় হতে পারে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের কৃষিনির্ভর এলাকায় এ ধরনের উদ্যোগ টেকসই কৃষি উন্নয়ন ও জলবায়ু অর্থায়নে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সোহেল রানাও মনে করেন, তাঁর গড়ে তোলা বন ভবিষ্যতে কার্বন ক্রেডিটের মাধ্যমে আয়ের ক্ষেত্র হতে পারে। তবে এ জন্য গাছের কার্বন শোষণের পরিমাণ নির্ভরযোগ্য পদ্ধতিতে পরিমাপ, স্বীকৃত মানদণ্ডে যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট বাজারের নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। শুধু গাছ লাগালেই কার্বন ক্রেডিট বিক্রি করে আয় নিশ্চিত হয় না।
*বন হবে উন্মুক্ত শিক্ষাকেন্দ্র*
বরেন্দ্র এগ্রো পার্কের মিয়াওয়াকি বনকে শুধু বনায়ন প্রকল্প হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না সোহেল রানা। তাঁর পরিকল্পনা, এটিকে দেশি ও বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ সম্পর্কে জানার একটি উন্মুক্ত শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত করা।
এ লক্ষ্যে ছুটির দিনে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বনে নিয়ে এসে গাছপালা ও জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে পরিচিত করানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের কৃষি উদ্যোক্তা ও প্রান্তিক কৃষকদের মিয়াওয়াকি পদ্ধতিতে বন তৈরির বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ারও উদ্যোগ নিতে চান তিনি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, যথাযথ পরিচর্যা, বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিশ্চিত করা গেলে বরেন্দ্র অঞ্চলে এ ধরনের উদ্যোগ বনায়নের নতুন দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে স্থানীয় পরিবেশের উপযোগী গাছ নির্বাচন, পানির ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদে বন টিকিয়ে রাখার সক্ষমতার ওপর।
বরেন্দ্রের লাল মাটিতে সোহেল রানার এ উদ্যোগ তাই কেবল গাছ লাগানোর প্রকল্প নয়; দেশি উদ্ভিদ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং পরিবেশবান্ধব কৃষির সম্ভাবনা অনুসন্ধানেরও একটি প্রচেষ্টা।
মতামত দিন