*হালি ডিম, পোয়া ডাল—এভাবেই চলছে নিম্ন আয়ের সংসার।*
*উপশিরোনাম:* আয় বাড়ছে না, বাড়ছে সংসারের খরচ; হালি ডিম, পোয়া ডাল আর ১০০ টাকার কেনাকাটায় চলছে দিন। কমছে পুষ্টিকর খাবার, বাড়ছে অপুষ্টির শঙ্কা।
সংসারের খরচ মেটাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বাড়িভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন ব্যয় মেটানোর পর বাজারের জন্য হাতে থাকছে সামান্য টাকা। ফলে মাসের বাজার একসঙ্গে করার সামর্থ্য হারাচ্ছেন অনেকেই। চাল-ডাল, তেল, পেঁয়াজ কিংবা সবজি কেনার ক্ষেত্রে কেজির হিসাব ছাপিয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে ৫০, ১০০ কিংবা ২০০ টাকার বাজেট। ডিমের ডজন নেমে এসেছে হালিতে, ডালের কেজি থেকে পোয়ায়, আর মাছ-মাংসের কেনাকাটায় কমছে পরিমাণ।
নিত্যপণ্যের বাজারে এই পরিবর্তন কেবল ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার সংকটই তুলে ধরছে না, বরং বিক্রেতাদের ব্যবসাতেও ফেলছে নেতিবাচক প্রভাব। অল্প অল্প করে পণ্য বিক্রি করতে গিয়ে বাড়ছে তাঁদের শ্রম ও প্যাকেটজাত করার খরচ। অন্যদিকে, প্রয়োজনের তুলনায় কম খাবার কেনার প্রবণতায় নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর পুষ্টি পরিস্থিতি নিয়েও তৈরি হচ্ছে উদ্বেগ।
রাজধানীর মালিবাগ রেলগেট কাঁচাবাজারে কেনাকাটা করতে এসে এমন বাস্তবতার কথাই জানালেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাকর্মী জয়নুল ইসলাম। তাঁর কেনাকাটার তালিকায় রয়েছে এক হালি ডিম, এক পোয়া মসুর ডাল, আধা কেজি পেঁয়াজ আর কয়েকটি রসুন।
জয়নুলের ভাষায়, মাস শেষ হতে এখনো কয়েক দিন বাকি। এরই মধ্যে বেতনের বড় অংশ চলে গেছে বাড়িভাড়া ও সন্তানের স্কুলের খরচে। তাই একবারে প্রয়োজনীয় সব পণ্য কেনার সামর্থ্য নেই। বাধ্য হয়ে প্রতিদিনের খাবারের জন্য অল্প অল্প করে বাজার করতে হচ্ছে তাঁকে।
এমন চিত্র এখন রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে। আগে মাসের শুরুতে চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজসহ প্রয়োজনীয় পণ্য একসঙ্গে কিনে রাখতেন যাঁরা, তাঁদের অনেকেই এখন প্রতিদিনের চাহিদা অনুযায়ী কেনাকাটা করছেন। নির্দিষ্ট পরিমাণের বদলে নির্দিষ্ট টাকার পণ্য কেনার প্রবণতা বেড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত পরিবারেও।
*কেনাকাটায় কমছে পরিমাণ*
বাজার ঘুরে দেখা যায়, চাল-ডাল থেকে শুরু করে তেল, চিনি, মাছ, মাংস, ডিম ও সবজি—প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্যের কেনাকাটায় কাটছাঁট করছেন ক্রেতারা। আগে পাঁচ কেজি আলু-পেঁয়াজ কিংবা একসঙ্গে কয়েক কেজি সবজি কিনলেও এখন অনেকেই ৫০ থেকে ১০০ টাকার পণ্য নিচ্ছেন। কেউ কিনছেন ২০ টাকার কাঁচামরিচ, কেউবা প্রয়োজন মেটাচ্ছেন কয়েকটি সবজি দিয়ে।
ডিমের ক্ষেত্রেও বদলেছে ক্রেতাদের অভ্যাস। আগে যাঁরা ডজন কিংবা ৩০টি ডিম একসঙ্গে কিনতেন, তাঁদের অনেকে এখন এক হালি কিনেই ফিরছেন। মুরগির মাংসের পরিবর্তে কেউ কেউ কিনছেন পা, গিলা কিংবা কলিজার মতো তুলনামূলক কম দামের অংশ।
মিরপুর এলাকার একটি শোরুমের বিক্রয়কর্মী ইতি আক্তার জানান, আগে মাসের শুরুতে একসঙ্গে চাল, আলু, ডাল, পেঁয়াজ ও চিনিসহ প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে রাখতেন। এখন প্রতিদিনের বাজার প্রতিদিন করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, একদিনে ২৫০ গ্রাম ডাল, এক হালি ডিম আর ২০ টাকার রসুন কিনেছেন। রাতে পাতলা ডাল, ডিম ভাজি আর ভাত দিয়েই পরিবারের খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। টিসিবির পণ্যের জন্য দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার সুযোগও সব সময় হয় না। ফলে পরিচিত দোকান থেকে অল্প অল্প করে পণ্য কিনতে হচ্ছে। মাসের শেষ দিকে অনেক সময় বাকিও করতে হয়।
*মাংসের বাজারেও টাকার হিসাব*
ক্রেতাদের সীমিত বাজেটের প্রভাব পড়েছে গরুর মাংসের বাজারেও। মিরপুরের মাংস বিক্রেতা রশিদ খান জানান, আগে যাঁরা সাত কেজি মাংস কিনতেন, তাঁদের অনেকে এখন তিন থেকে চার কেজি নিচ্ছেন। আবার যাঁরা তিন-চার কেজি কিনতেন, তাঁরা নেমে এসেছেন এক কেজিতে।
এখন অনেক ক্রেতা নির্দিষ্ট ওজনের পরিবর্তে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার মাংস চান। তাঁদের বাজেট অনুযায়ী ওজন করে মাংস দিতে হচ্ছে।
রশিদ খান জানান, তাঁদের পরিবার প্রায় পাঁচ দশক ধরে মাংসের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তিনি নিজে গত ১৭ বছর ধরে দোকান পরিচালনা করছেন। তবে আগের তুলনায় বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
*কম বিক্রি, বাড়তি খাটুনি*
ক্রেতাদের ছোট ছোট পরিমাণে পণ্য কেনার প্রবণতা বিক্রেতাদের জন্যও বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। মিরপুর,বড় বাজারের মুদি ব্যবসায়ী আরজু মিয়া বলেন, আগে এক-দুই কেজি করে কয়েকজন ক্রেতার কাছে ১৫ থেকে ২০ কেজি ডাল বিক্রি করা যেত। এখন একই পরিমাণ বিক্রি করতে অনেক বেশি ক্রেতাকে সামলাতে হচ্ছে।
আগে ১০০ বা ২৫০ গ্রাম ডাল বিক্রির অনুরোধ তুলনামূলক কম থাকলেও এখন এমন ক্রেতাই বেশি। বারবার পণ্য ওজন করা, প্যাকেট তৈরি এবং হিসাব মেলাতে বাড়তি সময় ব্যয় হচ্ছে। এতে দোকানে ব্যস্ততা বাড়লেও বিক্রি সেই অনুপাতে বাড়ছে না বলে জানান তিনি।
সবজি বিক্রেতা শামছু মিয়ার অভিজ্ঞতাও একই রকম। তাঁর ভাষ্য, অনেক ক্রেতা এখন এক-দুটি পটল কিংবা একটি বেগুন কিনেই চলে যান। এভাবে অল্প অল্প করে বিক্রি করতে গিয়ে অবিক্রীত সবজি শুকিয়ে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এতে লাভ কমার পাশাপাশি লোকসানের আশঙ্কাও বাড়ে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, অল্প পরিমাণে পণ্য বিক্রি করতে গিয়ে ছোট প্যাকেট ও পলিথিনের ব্যবহার বেড়েছে। আগে একবারে এক কেজি পণ্য প্যাকেট করলেই হতো, এখন একই পরিমাণ পণ্য কয়েকজনের কাছে ভাগ করে বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে প্যাকেটের খরচ ও শ্রম—দুটিই বাড়ছে।
*অল্প কিনেও বেশি দাম দেওয়ার শঙ্কা*
কম টাকায় বাজার করার বাধ্যবাধকতা অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতাদের জন্য বাড়তি খরচের কারণ হয়ে উঠছে। খুচরা পরিমাণে পণ্য কিনতে গিয়ে কেজিপ্রতি বেশি দাম দিতে হচ্ছে অনেককে।
বাজারের একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়। কোনো দোকানে এক কেজি মসুর ডালের দাম ১৫০ টাকা হলে এক পোয়া বা ২৫০ গ্রাম ডালের দাম আনুপাতিক হিসাবে ৩৭ টাকা ৫০ পয়সা। কিন্তু সেই পরিমাণ ডাল ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি হলে কেজিপ্রতি কার্যকর দাম দাঁড়ায় ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা।
অর্থাৎ হাতে নগদ টাকা কম থাকায় অল্প পণ্য কিনতে হচ্ছে, আবার ছোট পরিমাণে কেনার কারণে একই পণ্যের জন্য তুলনামূলক বেশি অর্থ ব্যয় করার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। তবে সব দোকান বা পণ্যের ক্ষেত্রে এমন মূল্যপার্থক্য রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে বাজারভিত্তিক তুলনামূলক যাচাই প্রয়োজন।
*সরকারি সহায়তা কতটা কার্যকর?*
নিত্যপণ্যের মূল্যচাপ সামাল দিতে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) ও খোলা বাজারে পণ্য বিক্রির (ওএমএস) মতো কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করছেন অনেক নিম্ন আয়ের মানুষ। তবে এসব পণ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘ সারি, সীমিত সরবরাহ এবং সময়ের সংকট তাঁদের জন্য বাড়তি ভোগান্তি তৈরি করছে।
অন্যদিকে, বাজার তদারকি ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে অভিযান পরিচালিত হলেও সাধারণ ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতার সংকট কাটাতে শুধু জরিমানা যথেষ্ট নয়। নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্যপণ্যের প্রাপ্যতা বাড়ানোও জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মানুষের আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান কমানোর দিকেও নজর দিতে হবে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা ও কার্যকারিতা বাড়ানো গেলে খাদ্যনিরাপত্তার চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব।
*পুষ্টির থালা ছোট হচ্ছে*
বাজারে কেনাকাটার পরিমাণ কমে যাওয়ার সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রভাব পড়তে পারে পরিবারের খাদ্যাভ্যাসে। সীমিত আয়ের কারণে মাছ, মাংস, ডিম, দুধ কিংবা পর্যাপ্ত ডাল কেনা সম্ভব না হলে অনেক পরিবারকে ভাত, আলু ও অন্যান্য শর্করানির্ভর খাবারের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়।
এতে খাদ্যের বৈচিত্র্য কমে যাওয়ার পাশাপাশি প্রোটিন, আয়রন, ক্যালসিয়াম ও জিংকের মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের ঘাটতির ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে শিশু, কিশোর-কিশোরী, গর্ভবতী নারী ও বয়স্ক ব্যক্তিরা এ ধরনের ঘাটতিতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
পুষ্টিবিদ মিলি আক্তারের মতে, দীর্ঘদিন প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি থাকলে শিশুদের স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি, মেধার বিকাশ ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। খাবারের পরিমাণ কোনোভাবে ঠিক থাকলেও পুষ্টিমান কমে গেলে তা একধরনের নীরব অপুষ্টির পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে বাজারে ছোট পরিমাণে পণ্য কেনার প্রবণতা এখন কেবল কেনাকাটার ধরন বদলে যাওয়ার বিষয় নয়; এটি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, পারিবারিক খাদ্যাভ্যাস এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর বাড়তে থাকা চাপেরও প্রতিফলন। ক্রেতার হাতে টাকা কম থাকায় বাজারের ব্যাগ ছোট হচ্ছে, আর সেই সঙ্গে সংকুচিত হচ্ছে পরিবারের খাবারের তালিকাও। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব পড়তে পারে জনস্বাস্থ্য ও সামগ্রিক জীবনমানের ওপর।
মতামত দিন