• ২০২৬ অক্টোবর ২৮, বুধবার, ১৪৩৩ কার্তিক ১৩
  • সর্বশেষ আপডেট : ০১:১০ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

**৮০ বছর ধরে অবারিত মানবতার দুয়ার, ভাসানীর মুসাফিরখানায় বিনা মূল্যে থাকা-খাওয়া।*

  • প্রকাশিত ০১:১০ অপরাহ্ন বুধবার, অক্টোবর ২৮, ২০২৬
**৮০ বছর ধরে অবারিত মানবতার দুয়ার, ভাসানীর মুসাফিরখানায় বিনা মূল্যে থাকা-খাওয়া।*
Time Bangla news
ফজলে এলাহী সুমন | সাভার প্রতিনিধি | টাইম বাংলা নিউজ।

**৮০ বছর ধরে অবারিত মানবতার দুয়ার, ভাসানীর মুসাফিরখানায় বিনা মূল্যে থাকা-খাওয়া।* 

অতিথি আপ্যায়নে নেই ধর্ম-বর্ণ কিংবা সামর্থ্যের ভেদাভেদ। দূরদূরান্ত থেকে আসা পথিক, অসচ্ছল মানুষ ও ভক্ত-অনুসারীদের জন্য এখানে খোলা রয়েছে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা। অর্থের অভাবে কাউকে যেন অভুক্ত থাকতে না হয়—এমন মানবিক প্রত্যয়ে প্রায় আট দশক ধরে সেবা দিয়ে যাচ্ছে টাঙ্গাইলের সন্তোষে অবস্থিত মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক মুসাফিরখানা।

১৯৪৬ সালে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার সন্তোষে নিজ হাতে এই সেবাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন মওলানা ভাসানী। কৃষক, শ্রমিক ও নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ে আজীবন সংগ্রাম করা এই নেতার মানবিক দর্শনের প্রতিফলন যেন আজও বহন করছে প্রতিষ্ঠানটি। সময়ের পরিবর্তন ঘটেছে, বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা; কিন্তু মুসাফিরখানার বিনা মূল্যে সেবা দেওয়ার ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

 *ভিনদেশি অতিথিদেরও আস্থার ঠিকানা* 

মওলানা ভাসানীর প্রতি শ্রদ্ধা এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত মুসাফিরখানার সেবার কথা শুনে দেশ-বিদেশ থেকে মানুষ ছুটে আসেন সন্তোষে। সম্প্রতি ভারতের আসামের লক্ষ্মীপুরের গোয়ালপাড়া থেকে তিন ব্যবসায়ী সেখানে আসেন। পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে ভাসানীর জীবন ও আদর্শের কথা শুনে বড় হয়েছেন তাঁরা।

তাঁদের একজন মনিরুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষরা ছিলেন ভাসানী হুজুরের অনুসারী। তাঁদের কাছে হুজুরের অনেক গল্প শুনেছি। আজ সন্তোষে এসে মুসাফিরখানায় যে আতিথেয়তা ও সেবা পেলাম, তা এককথায় চমৎকার।’

আরেক অতিথি সানিদুল ইসলাম জানান, সন্তোষে পৌঁছে প্রথমেই তাঁরা মওলানা ভাসানীর মাজার জিয়ারত করেন। তাঁর ভাষ্য, ছোটবেলা থেকেই মা-বাবার কাছে ভাসানীর গৌরবময় ইতিহাস শুনেছেন। মুসাফিরখানায় বিনা মূল্যে থাকা-খাওয়ার কথা আগে শুনলেও এবার সরাসরি এসে সেই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।

 *সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা, সবার জন্য খাবার* 

মুসাফিরখানায় আগত অতিথিদের দেখভাল করেন নিবেদিতপ্রাণ কর্মীরা। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষের খাবারের ব্যবস্থা তদারক করেন আমেনা বেগম। তিনি জানান, অনেকে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী বাজার করে নিয়ে আসেন, আবার কেউ আসেন একেবারেই খালি হাতে। তবে অতিথিদের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা না করে সবার জন্যই সাধ্যমতো খাবারের ব্যবস্থা করা হয়।

এই সেবামূলক কার্যক্রমের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত রয়েছেন চান মিয়া। প্রায় ৬০ বছর ধরে মুসাফিরখানার রান্নাঘরে কাজ করছেন তিনি। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন নিয়মিত দুই বেলা খাবার পরিবেশন করা হয়। এ ছাড়া প্রতি বৃহস্পতিবার এবং চান্দ্র মাসের ১১ তারিখে বিশেষ তবারক বিতরণ করা হয়। এসব উপলক্ষে দূরদূরান্ত থেকে বহু ভক্ত ও অনুসারী সেখানে সমবেত হন।

 *ভক্ত-অনুসারীদের সহযোগিতায় টিকে আছে ঐতিহ্য* 

মুসাফিরখানার কার্যক্রম কীভাবে এত বছর ধরে অব্যাহত রয়েছে, সে বিষয়ে মওলানা ভাসানীর দৌহিত্র ও ন্যাপ ভাসানীর সভাপতি হাসরত খান ভাসানী বলেন, মূলত হুজুরের মুরিদান, ভক্ত এবং এখানে আসা সাধারণ মানুষের আন্তরিক সহযোগিতায় এই উদ্যোগ সচল রয়েছে।

মওলানা ভাসানীর মানবিক নির্দেশনার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, হুজুর চাইতেন, তাঁর দরগায় কোনো দর্শনার্থী এলে অন্তত একটি রুটি যেন তাঁকে দেওয়া হয়। সেই নির্দেশনা অনুসরণ করেই আজও কাউকে না খাইয়ে ফেরত না পাঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। আল্লাহর রহমতে ভবিষ্যতেও এই সেবামূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

এদিকে মুসাফিরখানা পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এ বি এম শহীদুল ইসলাম জানান, মওলানা ভাসানীর স্মৃতি ও আদর্শ ধারণ করে তাঁর হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সংগঠনগুলোকে নতুন করে উজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিশেষ করে ঐতিহাসিক মুসাফিরখানাটির আধুনিকায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রায় ৮০ বছর ধরে মানুষের সেবায় নিয়োজিত সন্তোষের এই মুসাফিরখানা কেবল একটি আশ্রয়কেন্দ্র নয়; বরং এটি মওলানা ভাসানীর মানবিক দর্শন, অতিথিপরায়ণতা ও জনকল্যাণের এক অনন্য স্মারক।

সর্বশেষ