• ২০২৬ অগাস্ট ১১, মঙ্গলবার, ১৪৩৩ শ্রাবণ ২৭
  • সর্বশেষ আপডেট : ১২:০৮ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

ছেলের সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষা, মা পেলেন জিপিএ-৫; ছেলে গোল্ডেন জিপিএ-৫।

  • প্রকাশিত ১২:০৮ অপরাহ্ন মঙ্গলবার, অগাস্ট ১১, ২০২৬
ছেলের সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষা, মা পেলেন জিপিএ-৫; ছেলে গোল্ডেন জিপিএ-৫।
File
হাসিনুর রহমান হাসু। টাইম বাংলা নিউজ ডেস্ক।

ছেলের সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষা, মা পেলেন জিপিএ-৫; ছেলে গোল্ডেন জিপিএ-৫।

সংসার সামলে ১৯ বছর পর বই হাতে ফিরেছিলেন সাদিয়া, এবার ছেলের সঙ্গী হয়ে পরীক্ষার হলে—ফলাফলে দুজনের মুখেই সাফল্যের হাসি।

রাজশাহী: বয়সের ব্যবধান পেরিয়ে একই স্বপ্নে পথচলা। একজন মা, অন্যজন তাঁর সন্তান। একজন দীর্ঘ ১৯ বছর পর আবার হাতে তুলে নিয়েছিলেন বই-খাতা, অন্যজন তখন পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। সংসারের দায়িত্ব, সন্তানদের দেখভাল আর নিজের পড়াশোনা—সবকিছুকে একসঙ্গে সামলে মা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, ছেলের সঙ্গে একই বছরে এসএসসি পরীক্ষা দেবেন। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে দারুণ সাফল্যে।

মা সাদিয়া বেগম পেয়েছেন জিপিএ-৫। আর ছেলে তানভীর আহমেদ পেয়েছে গোল্ডেন জিপিএ-৫। মা-ছেলের এমন অভাবনীয় সাফল্যে এখন আনন্দে ভাসছে পুরো পরিবার। অভিনন্দনে ভাসছেন তাঁরা স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনদের কাছ থেকেও।

রাজশাহী নগরীর রাজপাড়া থানার বসিলা এলাকার বাসিন্দা সাদিয়া বেগম। প্রায় ১৯ বছর আগে বিয়ের পর থেমে গিয়েছিল তাঁর পড়াশোনা। সংসার ও পারিবারিক নানা দায়িত্বের চাপে তখন বই-খাতা তুলে রাখতে হয়েছিল। কিন্তু শিক্ষার প্রতি ভালোবাসা আর নিজের স্বপ্নকে কখনো পুরোপুরি বিদায় জানাননি তিনি।

সময়ের স্রোতে সংসার বড় হয়েছে, দুই সন্তানের মা হয়েছেন সাদিয়া। সন্তানদের পড়াশোনার খোঁজ রাখা, সংসারের কাজ সামলানো—সবই চলছিল। এর মধ্যেই একসময় মনে হলো, থেমে যাওয়া পড়াশোনাটা আবার শুরু করা যায়।

সেই ভাবনা থেকেই প্রায় দুই বছর আগে নতুন সিদ্ধান্ত নেন তিনি—ছেলের সঙ্গে একই বছরে এসএসসি পরীক্ষা দেবেন।

পরিবারের সম্মতি পাওয়ার পর শুরু হয় নতুন করে পথচলা। সংসারের কাজ শেষ করে কখনো দিনের অবসরে, আবার কখনো গভীর রাতে বই-খাতা নিয়ে বসতেন সাদিয়া। সন্তানদের পড়াশোনার খোঁজ নেওয়ার পাশাপাশি নিজের পড়াশোনার প্রস্তুতিও চালিয়ে গেছেন সমানতালে।

অবশেষে আসে কাঙ্ক্ষিত সেই দিন।

চলতি বছরের এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় রাজপাড়া আদর্শ মহিলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজ থেকে অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন সাদিয়া বেগম।

আর তাঁর ছেলে তানভীর আহমেদ রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পেয়েছে গোল্ডেন জিপিএ-৫।

সোমবার (১০ আগস্ট) ফল প্রকাশের পর বিকেলে তাঁদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় উৎসবের আমেজ। মা-ছেলের সাফল্যে পরিবারের সদস্যদের চোখেমুখে আনন্দ। স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনেরা বাড়িতে এসে তাঁদের অভিনন্দন জানাচ্ছেন।

কখনো হাল ছাড়িনি:

নিজের সাফল্যের অনুভূতি জানাতে গিয়ে আবেগাপ্লুত সাদিয়া বেগম বলেন, ‘পড়াশোনার প্রতি আমার ঝোঁক ছিল। কিন্তু বিয়ের পর নানা কারণে পড়ালেখা করতে পারিনি। তবে কখনো হাল ছাড়িনি।

তিনি বলেন, ‘বছর দুয়েক আগে সিদ্ধান্ত নিলাম, ছেলের সঙ্গে আমিও পরীক্ষা দেব। পরিবারের সম্মতিতে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। সেই সিদ্ধান্ত থেকেই চলতি বছর ছেলের সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিই।’

সাদিয়ার কাছে নিজের জিপিএ-৫-এর আনন্দের সঙ্গে ছেলের ফলাফল যোগ হয়েছে বাড়তি এক প্রাপ্তি হয়ে।

তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হলো, সংসার সামলিয়ে এবং দুই ছেলের পড়ালেখার খোঁজখবর রাখার পাশাপাশি নিজেও পড়ালেখা করে জিপিএ-৫ পেয়েছি। একই সঙ্গে ছেলে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে। মা-ছেলের এমন সাফল্যে আমরা পুরো পরিবার আনন্দিত।’

মায়ের সঙ্গে পরীক্ষা দেওয়ার সৌভাগ্য কজনের হয়?

মায়ের সঙ্গে একই পরীক্ষায় অংশ নেওয়া তানভীরের কাছেও ছিল অন্যরকম এক অভিজ্ঞতা। একই সময়ে মা ও ছেলের পরীক্ষার প্রস্তুতি যেন তাঁদের সম্পর্ককেও আরও গভীর করে তুলেছিল।

তানভীর বলে, ‘আমি সবচেয়ে সৌভাগ্যবান যে, এবার আমার মায়ের সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে দুজনই জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছি। কারণ মায়ের সঙ্গে পরীক্ষা দেওয়ার সৌভাগ্য কজনের হয়? আমি সেই সৌভাগ্যবান।

মায়ের পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের প্রস্তুতির কথাও জানায় তানভীর।

সে বলে, ‘মা সবসময় আমার পড়ালেখার খোঁজখবর রাখতেন। পাশাপাশি নিজেও পড়তেন। রাত জেগে আমার পাশে বসে থাকতেন, আর আমি পড়ালেখা করতাম।’

নিজের অর্জন বাবা-মাকে উৎসর্গ করে তানভীর বলে, ‘আমার এই কৃতিত্ব আমার বাবা-মাকে উৎসর্গ করছি।

ভবিষ্যতে ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখে তানভীর। নিজের লক্ষ্য পূরণে দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছে সে।

চার বছর ধরে পড়িয়েছেন গৃহশিক্ষক:

মা-ছেলের এই সাফল্যের নেপথ্যে থাকা মানুষদের একজন তাঁদের গৃহশিক্ষক আরিফুল ইসলাম। দীর্ঘদিন ধরে কাছ থেকে তাঁদের পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত তিনি।

আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আমি চার বছর ধরে তানভীরকে ইংরেজি পড়াই। পাশাপাশি তার মাকেও পড়াশোনায় সহযোগিতা করছিলাম।

মা-ছেলের ফলাফলে উচ্ছ্বসিত এই শিক্ষক বলেন, ‘মা-ছেলে দুজনের এমন সাফল্যে আমি অনেক খুশি। নিজে এমন একটি ঘটনার সাক্ষী হতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি।’

থেমে যাওয়া স্বপ্নও যে আবার শুরু করা যায়:

সাদিয়া বেগমের গল্প শুধু একটি ভালো ফলাফলের গল্প নয়। এটি প্রমাণ করে, জীবনের কোনো এক পর্যায়ে পড়াশোনা থেমে গেলেও স্বপ্ন থেমে যায় না। সংসারের দায়িত্ব মানুষকে ব্যস্ত রাখতে পারে, কিন্তু ইচ্ছাশক্তি থাকলে নিজের স্বপ্নের কাছে আবারও ফিরে যাওয়া সম্ভব।

আর তানভীরের সাফল্যের গল্পে যোগ হয়েছে মায়ের অনুপ্রেরণার এক অনন্য অধ্যায়। একই বছরে একই পরীক্ষায় অংশ নিয়ে মা পেয়েছেন জিপিএ-৫, ছেলে পেয়েছে গোল্ডেন জিপিএ-৫।

একই বাড়ি থেকে দুটি ফলাফল, দুটি সাফল্য—কিন্তু আনন্দ একটাই। মা-ছেলের এই অর্জন তাই শুধু একটি পরিবারের গর্ব নয়, বরং স্বপ্ন দেখার এবং সেই স্বপ্ন পূরণে বয়স-সময়-ব্যস্ততার সব বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার এক অনুপ্রেরণার গল্প।

সর্বশেষ