*মৃতপ্রায় কেপিএমে প্রাণ ফেরানোর উদ্যোগ, ফিরবে কি সোনালি দিন?*
দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, জরাজীর্ণ অবকাঠামো ও যান্ত্রিক সংকটে ধুঁকতে থাকা দেশের ঐতিহ্যবাহী শিল্পপ্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী পেপার মিলস (কেপিএম) পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একসময় এশিয়াজুড়ে পরিচিত এই কাগজকলের উৎপাদন সক্ষমতা ফিরিয়ে এনে হারানো কর্মচাঞ্চল্য পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে পুরোনো যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে পূর্ণ সক্ষমতায় ফেরানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার চন্দ্রঘোনায় অবস্থিত প্রায় ৭৫ বছরের পুরোনো এই শিল্পপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের কাগজশিল্পের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। জরাজীর্ণ অবকাঠামো ও সীমিত জনবল নিয়েও এখানে এখনো উন্নত মানের কাগজ উৎপাদিত হচ্ছে। কিন্তু যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে উৎপাদন কার্যক্রম বারবার ব্যাহত হচ্ছে।
কর্ণফুলী পেপার মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শহীদ উল্লাহ জানান, প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে সরকারের বড় পরিকল্পনা রয়েছে। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত ১০ অক্টোবর বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) চেয়ারম্যান ও সরকারের অতিরিক্ত সচিব মো. বাবুল মিঞা কারখানাটি পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শনকালে মিলের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি। এ সময় বিসিআইসি চেয়ারম্যান জানান, কর্ণফুলী পেপার মিল বন্ধ করে দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। বরং বন্ধ হয়ে থাকা শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় চালুর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পরিকল্পনা রয়েছে। কেপিএমের বর্তমান সংকট কাটিয়ে উৎপাদন কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরও জানান, প্রধানমন্ত্রীর তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের সঙ্গে সম্প্রতি সচিবালয়ে কেপিএমের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠানটির সমস্যাগুলো সম্পর্কে অবগত রয়েছেন। উৎপাদন পুরোপুরি সচল করা এবং বিদ্যমান সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করবেন বলে তিনি জানিয়েছেন। পাশাপাশি কেপিএম পরিদর্শনে আসার সম্মতিও দিয়েছেন।
*জাতীয় প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ কেপিএম*
কর্ণফুলী পেপার মিলের উৎপাদিত কাগজ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। জাতীয় নির্বাচনসহ বিভিন্ন নির্বাচনে ব্যালট পেপার তৈরি এবং শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বিতরণ করা পাঠ্যবই ছাপানোর কাজে এই প্রতিষ্ঠানের কাগজ ব্যবহৃত হয়।
সম্প্রতি কারখানাটির উৎপাদন কার্যক্রম পরিদর্শন করে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দিন বলেন, সাত দশকের বেশি পুরোনো হলেও কেপিএম এখনো সম্ভাবনাময় একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। জাতীয় প্রয়োজনে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিকে সচল রাখতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হবে বলেও জানান তিনি।
*কর্মসংস্থানের বড় ভরসা*
কেপিএমকে ঘিরে শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের জীবিকা নয়, বৃহত্তর এলাকার অসংখ্য মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও জড়িত। কারখানাটি পুরোদমে চালু হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কেপিএমের প্রশাসন বিভাগের প্রধান আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম বনাঞ্চল থেকে বাঁশ, কাঠসহ বিভিন্ন উপকরণ সরবরাহ করে অনেক মানুষ জীবিকা নির্বাহ করেন। ফলে এই কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম সচল থাকা স্থানীয় অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
শ্রমিক-কর্মচারী পরিষদের (সিবিএ) সভাপতি আবদুল রাজ্জাক বলেন, কেপিএম দেশের ঐতিহ্যবাহী একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির হারানো গৌরব ফিরে আসবে—এমন প্রত্যাশা নিয়ে শ্রমিক-কর্মচারীরা অপেক্ষা করছেন। সরকারের উদ্যোগে মিলটি আবারও স্বর্ণযুগে ফিরে যাবে বলে তাঁরা আশাবাদী।
এদিকে কেপিএমের উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখতে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কাপ্তাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রায়হানুল ইসলাম জানান, প্রতিষ্ঠানটি পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কর্ণফুলী পেপার মিল আবারও ঘুরে দাঁড়াবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
দীর্ঘদিনের সংকট কাটিয়ে কর্ণফুলী পেপার মিলকে পূর্ণ উৎপাদনে ফেরানো সম্ভব হলে তা দেশের কাগজশিল্প, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতির দিকেই তাকিয়ে আছেন শ্রমিক-কর্মচারী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী। উদ্যোগ, ফিরবে কি সোনালি দিন?’
মতামত দিন