• ২০২৬ অক্টোবর ১৭, শনিবার, ১৪৩৩ কার্তিক ২
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৬:১০ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

চলনবিলে অতিথি পাখির মরণফাঁদ, নির্বিচারে চলছে শিকার’।*

  • প্রকাশিত ১০:১০ অপরাহ্ন শনিবার, অক্টোবর ১৭, ২০২৬
চলনবিলে অতিথি পাখির মরণফাঁদ, নির্বিচারে চলছে শিকার’।*
Time Bangla news
ফজলে এলাহী সুমন | সাভার প্রতিনিধি | টাইম বাংলা নিউজ।

*চলনবিলে অতিথি পাখির মরণফাঁদ, নির্বিচারে চলছে শিকার’।* 

খাদ্যের খোঁজে জলাভূমিতে পাখির আগমন, শিকারিদের পাতা ফাঁদে প্রাণহানি; আইনের প্রয়োগ ও নজরদারি বাড়ানোর দাবি

শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে সঙ্গে অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠছে উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ চলনবিল। বর্ষার পানি কমে যাওয়ায় বিল, খাল ও জলাশয়ে মাছের প্রাচুর্য পাখিদের আকৃষ্ট করছে। কিন্তু প্রকৃতির এই সৌন্দর্যকে পুঁজি করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে পাখি শিকারিরা। নানা কৌশলে পাতা ফাঁদ, বিষটোপ ও জালে প্রতিদিন আটকা পড়ছে অসংখ্য দেশি-বিদেশি পাখি। শিকার করা পাখি প্রকাশ্যে হাটবাজারে বিক্রি হলেও তা বন্ধে নিয়মিত নজরদারি ও আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

পরিবেশবাদীদের তথ্যমতে, চলনবিলের বিভিন্ন জলাশয়ে পুঁটি, খলসে ও অন্যান্য ছোট মাছের উপস্থিতি বেড়েছে। খাবারের সন্ধানে এসব এলাকায় আসছে সাদা বক, বালিহাঁস, মাছরাঙা, সারস ও পানকৌড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। এক বিল থেকে অন্য বিলে উড়ে বেড়ানো এসব পাখির জন্য নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা ছিল জলাভূমিগুলো। কিন্তু শিকারিদের তৎপরতায় সেই আবাসই হয়ে উঠছে বিপজ্জনক।

 *ফাঁদ পেতে চলে শিকার* 

চলনবিল এলাকায় পাখি শিকারের অন্যতম প্রচলিত কৌশল হলো বাঁশ, কলাপাতা, খেজুরের ডাল ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে বিশেষ ধরনের আড়াল তৈরি করা। প্রায় ৬ থেকে ৭ ফুট উঁচু এসব ফাঁদের সামনে রাখা হয় পোষা বক। আকাশে উড়ে যাওয়া বকের ঝাঁককে আকৃষ্ট করতে পোষা পাখিটিকে ব্যবহার করেন শিকারিরা। ঝাঁকটি ফাঁদের ওপর বা আশপাশে বসলে আড়ালে থাকা শিকারিরা পাখিগুলো ধরে খাঁচায় বন্দি করেন।

এ ছাড়া বড়শিতে মাছ গেঁথে পাখি ধরার পাশাপাশি ধানখেতে আড়াআড়িভাবে জাল পাতা এবং বিষটোপ ব্যবহার করেও পাখি শিকারের অভিযোগ রয়েছে। এতে লক্ষ্যবস্তু পাখির পাশাপাশি অন্যান্য পাখিও বিপদের মুখে পড়ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কিছু শিকারি রাতের অন্ধকারে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেও পাখি হত্যা করেন। শিকার করা পাখির একাংশ নিজেদের খাবারের জন্য রাখা হলেও বাকিগুলো বস্তায় ভরে বিক্রি করা হয়। প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তির কাছে পাখি পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

 *হাটবাজারে প্রকাশ্যে বিক্রি* 

সরেজমিনে সোমবার বেলা ১১টার দিকে শিকারিদের জালে ধরা প্রায় দুই শতাধিক কোয়েল পাখি বিক্রির জন্য হাটে নেওয়ার দৃশ্য দেখা যায়। শিকারিদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাতের শেষ ভাগ থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত এসব পাখি ধরা হয়েছিল। অনেকে আবার হাটবাজারে ঘুরে ঘুরেও পাখি বিক্রি করেন।

স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি বক ১২০ থেকে ১৫০ টাকা, প্রতিটি বালিহাঁস ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং চাকলা পাখি প্রতি জোড়া ১৯০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শিকারি জানান, ভোরে দলবেঁধে বিল ও ফসলের মাঠে গিয়ে তাঁরা পাখি ধরেন। কোনো দিন ১০টি, আবার কোনো দিন শতাধিক পাখিও শিকার হয়। তাঁদের দাবি, এসব পাখির ক্রেতা রয়েছে এবং বিক্রিও তুলনামূলক সহজ। তবে তাঁদের অনেকে পাখি শিকার যে আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ, সে বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন নন বলে জানান।

 *উদ্ধার অভিযানে পরিবেশবাদীরা* 

পাখি শিকার প্রতিরোধে চলনবিলের কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কাজ করছে। শিকারিদের পাতা ফাঁদ শনাক্ত করা, পাখি উদ্ধার, জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং উদ্ধার করা পাখি মুক্ত আকাশে অবমুক্ত করার মতো কার্যক্রম চালাচ্ছেন সংগঠনগুলোর সদস্যরা।

সম্প্রতি নাটোরের সিংড়ায় বক ব্যবহার করে পাখি শিকারের ঘটনায় তিনজনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কারাদণ্ড ও জরিমানা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অভিযানে সহায়তা করেন চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সদস্যরা।

এ সময় চলনবিলের আগমুরশন, বামিহাল, কাকিয়ান ও পূর্বভেংড়ী বিল এলাকা থেকে বক শিকারের কাজে ব্যবহৃত পোষা ও শিকার করা অর্ধশতাধিক বক উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি ধানখেতে পাখি ধরার জন্য তৈরি ১০টি ‘কিল্লা ঘর’ বা ফাঁদ ধ্বংস করা হয়। পরে উদ্ধার করা পাখিগুলো সিংড়ার সহকারী কমিশনারের (ভূমি) উপস্থিতিতে অবমুক্ত করা হয়।

চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, চলনবিলের ধানখেতগুলোতে নিয়মিত ফাঁদ পেতে পাখি শিকার করা হচ্ছে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে খবর পেয়ে প্রশাসনের সহযোগিতায় পাখি উদ্ধার করে মুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে স্থানীয়দের মধ্যে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরতে লিফলেট বিতরণ ও মাইকিং করা হয়েছে।

 *প্রয়োজন কার্যকর নজরদারি* 

চলনবিলের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিচ্ছিন্ন উদ্ধার অভিযান যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাখি শিকারের স্থানগুলো চিহ্নিত করে নিয়মিত অভিযান, অবৈধভাবে পাখি বিক্রি বন্ধ, শিকারিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং স্থানীয় মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

প্রতিবছর অতিথি পাখির আগমন চলনবিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করে। সেই সম্পদ রক্ষায় প্রশাসন, পরিবেশবাদী সংগঠন ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া না গেলে খাদ্যের সন্ধানে আসা পাখিদের নিরাপদ আশ্রয় ক্রমেই সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


সূত্র: ইফা।

সর্বশেষ