• ২০২৬ অক্টোবর ২৬, সোমবার, ১৪৩৩ কার্তিক ১১
  • সর্বশেষ আপডেট : ০২:১০ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

ঝুঁকিতে প্রাণ-প্রকৃতি:

  • প্রকাশিত ০২:১০ অপরাহ্ন সোমবার, অক্টোবর ২৬, ২০২৬
ঝুঁকিতে প্রাণ-প্রকৃতি:
Time Bangla news
ফজলে এলাহী সুমন | সাভার প্রতিনিধি | টাইম বাংলা নিউজ।

ঝুঁকিতে প্রাণ-প্রকৃতি: পর্ব–১

*নদী-সমুদ্রের প্লাস্টিকে বিপন্ন সুন্দরবন।* 

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের সৈকত, নদী-খাল ও বনের গভীর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে প্লাস্টিক বর্জ্য। উজানের নদী, বঙ্গোপসাগর এবং বনসংলগ্ন জনপদ—এই তিন উৎস থেকে আসা বর্জ্য জমে দূষিত হচ্ছে বনের পরিবেশ। কোথাও ম্যানগ্রোভের শ্বাসমূলের চারপাশে আটকে আছে প্লাস্টিক, কোথাও সৈকত ও চরে জমেছে বর্জ্যের স্তূপ। এতে হুমকির মুখে পড়ছে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্র।

সুন্দরবনের কটকা, কচিখালি, জামতলা, ডিমের চর ও আন্ধার মানিকসহ বিভিন্ন এলাকায় প্লাস্টিক দূষণের চিত্র উদ্বেগজনক। এসব এলাকায় পড়ে থাকতে দেখা যায় পলিথিন, প্রসাধনসামগ্রীর প্যাকেট, প্লাস্টিকের বোতল, স্যান্ডেল, ককশিট, কীটনাশকের খালি বোতল, মাছ ধরার নাইলনের জাল ও জালের সঙ্গে ব্যবহৃত ভাসমান ড্রাম। ডিমের চরের প্রায় চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সাগরতীরের উঁচু অংশে জমেছে কয়েক টন প্লাস্টিকসামগ্রী।

কটকা ও কচিখালি এলাকায় বিভিন্ন সময়ে বর্জ্য অপসারণ করা হলেও সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকায় এখনো রয়ে গেছে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক। প্রয়োজনের তুলনায় জনবল ও বাজেট কম থাকায় এসব বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণে হিমশিম খাচ্ছে বন বিভাগ।

 *যেভাবে বনে পৌঁছাচ্ছে বর্জ্য* 

বন বিভাগের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সুন্দরবনে প্লাস্টিক দূষণের প্রধান উৎস উজানের নদী ও বঙ্গোপসাগর। পাশাপাশি বনসংলগ্ন বাজার, মৎস্য আড়ত, নৌঘাট, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং বসতবাড়ি থেকেও বর্জ্য বনের নদী-খালে প্রবেশ করছে।

খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকার বর্জ্য পশুর, শিবসা, শেলা, বলেশ্বর, কপোতাক্ষ, ভোলা ও খোলপেটুয়াসহ বিভিন্ন নদী-খাল দিয়ে সুন্দরবনে পৌঁছায়। জোয়ার-ভাটার প্রবাহে এসব বর্জ্য বনের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, ঢাকা, বরিশালসহ বিভিন্ন শহরের বর্জ্য পদ্মা, যমুনা ও মেঘনা নদী হয়ে বঙ্গোপসাগরে পৌঁছায়। সমুদ্রের ঢেউ ও স্রোতের সঙ্গে এসব বর্জ্যের একটি অংশ সুন্দরবনের সৈকত ও চরে জমা হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সমুদ্রগামী জেলে, পর্যটক ও নৌযানের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক বোতল, নাইলনের জাল, ড্রাম ও ককশিটের মতো সামগ্রী।

 *মাইক্রোপ্লাস্টিকেও দূষিত পানি-মাটি* 

সুন্দরবনে প্রতিবছর কী পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হয়, তার নির্ভরযোগ্য সরকারি হিসাব নেই। তবে বিভিন্ন গবেষণায় সুন্দরবনসংলগ্ন সমুদ্রাঞ্চলে প্লাস্টিক দূষণের ব্যাপকতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

২০১৭ সালে এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় মডেলভিত্তিক হিসাবে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকা থেকে বছরে প্রায় ৭২ হাজার ৮৪৫ টন মাইক্রোপ্লাস্টিক সুন্দরবনসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে পৌঁছানোর তথ্য দেওয়া হয়। ২০২১ সালে ফ্রন্টিয়ার্স ইন মেরিন সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত সুন্দরবনবিষয়ক গবেষণাতেও এ তথ্য উল্লেখ করা হয়।

এ ছাড়া খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে সুন্দরবনের ছয়টি স্থানের নমুনা পরীক্ষা করে প্রতি লিটার পানিতে গড়ে ২ দশমিক ২২টি এবং প্রতি কেজি মাটিতে ৭৩৪টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্লাস্টিক বর্জ্য ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও বীজের অঙ্কুরোদ্গম ব্যাহত করতে পারে। পাশাপাশি জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ও প্রজননপ্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে মাইক্রোপ্লাস্টিক। খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে এসব ক্ষুদ্র কণা মানুষের শরীরেও প্রবেশের আশঙ্কা রয়েছে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, উজানের নদী ও সমুদ্র থেকে প্লাস্টিক অপসারণ করা গেলে দূষণ ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। তাঁর মতে, প্লাস্টিক দূষণ গাছের বৃদ্ধি, বীজের অঙ্কুরোদ্গম ও জলজ প্রাণীর প্রজননে বিরূপ প্রভাব ফেলে।

 *নেই বর্জ্যের হিসাব, দুর্বল সমন্বিত উদ্যোগ* 

সুন্দরবনে বছরে কত পরিমাণ প্লাস্টিক প্রবেশ করছে এবং বন বিভাগ কতটা অপসারণ করতে পারছে, তার পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান নেই। একই সঙ্গে উপকূলীয় শহর, বন্দর ও জনপদে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা দূষণ নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলছে।

পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সুন্দরবনে প্লাস্টিক নেওয়া ও ফেলা নিষিদ্ধ। এ বিষয়ে বনপ্রহরীরা নিয়মিত টহল ও তল্লাশি চালান। তবে নদী ও সমুদ্র থেকে ভেসে আসা বর্জ্য ঠেকানো কঠিন। এ সমস্যা মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শুধু সুন্দরবনের ভেতরে বর্জ্য সংগ্রহ করে এ দূষণ বন্ধ করা সম্ভব নয়। নদী ও সমুদ্রে প্লাস্টিক ফেলা নিয়ন্ত্রণ, উপকূলীয় জনপদে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যানগ্রোভ বন ক্রমেই প্লাস্টিক দূষণের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিতে পড়বে।


সর্বশেষ