• ২০২৬ অক্টোবর ২৮, বুধবার, ১৪৩৩ কার্তিক ১৩
  • সর্বশেষ আপডেট : ০২:১০ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

এক আতঙ্কের শহর ‘একটা গুলির খবর শুনে নিঃশ্বাস ফেলতে না ফেলতেই আরেকটা গুলির ঘটনা’

  • প্রকাশিত ০২:১০ অপরাহ্ন বুধবার, অক্টোবর ২৮, ২০২৬
এক আতঙ্কের শহর  ‘একটা গুলির খবর শুনে নিঃশ্বাস ফেলতে না ফেলতেই আরেকটা গুলির ঘটনা’
Time Bangla news
মোঃ মিজানুর রহমান | কুমিল্লা ব্যুরো চিফ প্রতিনিধি | টাইম বাংলা নিউজ


এক আতঙ্কের শহর

‘একটা গুলির খবর শুনে নিঃশ্বাস ফেলতে না ফেলতেই আরেকটা গুলির ঘটনা’

২৮ অক্টোবর ২০২৬,সকাল ০৭:০০

খুলনা শহরের একটি এলাকা (ছবি: সংগৃহীত

খুলনা মহানগর ও জেলায় সাম্প্রতিক সময়ে গুলি করার ঘটনা অহরহ ঘটছে। একটার পর একটা গুলি হচ্ছে। সাধারণ মানুষ একটা খবর শুনে নিঃশ্বাসও নিতে পারছে না, আরেকটা গুলির ঘটনা ঘটছে। রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, শিক্ষক, স্কুলছাত্রী, নারী ও পথচারীরাও গুলির শিকার হচ্ছেন।

গত ২৬ অক্টোবর দিনগত রাতে বটিয়াঘাটায় যুবদল নেতা সোহেল, ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় বটিয়াঘাটায় সাবেক যুবদল নেতা বাদলকে গুলি করা হয়। ২৭ অক্টোবর দুপুরে নিরালায় জাপান ট্যোবাকোর সালমানকে গুলি করে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এরা হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। গত ২২ অক্টোবর খুলনায় দুটি হত্যা হয়। সকালে পূর্ব বানিয়াখামার এলাকায় তাওহিদুল ইসলাম ও সন্ধ্যায় জিন্নাহপাড়ায় গৃহবঁধূ খুশি আক্তার  দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন। দুটি হত্যাকাণ্ডই মাদক বিরোধ বলে পুলিশের ধারনা। গত ২৪ অক্টোবর গুলিবিদ্ধ হন তেরখাদার যুবদল নেতা রামিম বিশ্বাস। ২৪ অক্টোবর দিনগত রাতে খুলনার বাবু খান রোডে সন্ধানী ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক কমপ্লেক্সের সামনে ফাঁকা গুলি করার পর ক্লিনিকের ভেতরে ব্যাপক ভাঙ্গচুর করা হয়। এছাড়া ১৮ অক্টোবর মধ্যরাতে টুটপাড়া আমতলা মোড়ে শেখ জুম্মান রহমান নামের এক যুবক গুলিবিদ্ধ হন। দুর্বৃত্তরা মোটরসাইকেলে এসে গুলি করে তার মুঠোফোন ছিনিয়ে নিয়ে যায়। গত ৩ জুলাই সন্ধ্যায় খুলনা নগরের রূপসার নতুন বাজার বেড়িবাঁধ সড়ক এলাকায় দশম শ্রেণির এক ছাত্রী (১৫) গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটে। ২ জুলাই নগরের লবণচরা থানার আশীবিঘা বালুর মাঠ এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে রাতুল শেখ নামের এক তরুণ আহত হন।

খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) তথ্য অনুযায়ী, এক সময় নগরীতে ২০০টির বেশি কিশোর গ্যাং সক্রিয় ছিল। সময়ের সঙ্গে এসব গ্যাংয়ের অনেক সদস্যের বয়স বেড়েছে। তাদের একাংশ এখন বিভিন্ন অপরাধী বাহিনীতে যুক্ত। পাশাপাশি নতুন বাহিনীরও আবির্ভাব ঘটেছে।

এ বছর মহানগরীর আলোচিত হত্যাকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে সোনাডাঙ্গার দারুল আমান মহল্লায় ট্রিপল মার্ডার। গত ৩০ মে একটি ভাড়া বাসা থেকে বেবি বেগম (৫৫) এবং তার দুই নাতি শামীম ব্যাপারী (১৩) ও মুস্তাকিমের (৪) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

জেলায় রূপসায় ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গত ৫ অক্টোবর আইচগাতী ইউনিয়নের দুর্জনীমহলে বাড়ির সামনেই গুলিতে নিহত হন আক্তার ঢালী। এর প্রায় দেড় মাস আগে একই এলাকায় তার ছেলে জয় ঢালীকেও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ১৫ আগস্ট রূপসায় একই দিনে দুজন খুন হন। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদক কারবার, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এলাকায় অস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে।
গত ৯ অক্টোবর রাতে রূপসায় অভিযান শেষে নগরীতে ফেরার পথে পুলিশ পরিদর্শক শাহ আলমের মোবাইল ফোন ও টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। ঘটনার পর পুলিশ সুপার জরুরি প্রয়োজন ছাড়া একা বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে নির্দেশনা দেন। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনার জন্ম দেয়।

গত ১২ অক্টোবর লবণচরার টুটপাড়ায় চাঁদা না পেয়ে একটি বাড়িতে হামলা ও ফাঁকা গুলি ছোড়ার অভিযোগ ওঠে। ৭ অক্টোবর দৌলতপুরে সরকারি বিএল কলেজের দ্বিতীয় গেট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন মহিদুল ইসলাম। ১৭ অক্টোবর রাতে পশ্চিম টুটপাড়ার আমতলা মোড়ে এক যুবককে গুলি করে তার মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। ১২ অক্টোবর সোনাডাঙ্গায় গৃহকর্ত্রীকে অচেতন করে সাড়ে পাঁচ ভরির বেশি স্বর্ণালংকার লুটের ঘটনাও ঘটে।

এছাড়া ৭ অক্টোবর দৌলতপুরের মহেশ্বরপাশায় এক অনুষ্ঠানে জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল সন্ত্রাস, মাদক ও অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ না দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। এর কয়েক ঘণ্টা পর সদর সাবরেজিস্ট্রি অফিস থেকে অস্ত্রের মুখে তুলে নেওয়া হয় সাবরেজিস্ট্রার তন্ময় কুমার মণ্ডলকে। প্রায় ৪০ মিনিট পর তিনি নিজ দপ্তরে ফিরে আসেন। তাকে তুলে নেওয়ার কারণ নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও সাংবাদিকদের কাছে তিনি বলেন, ‘এমনি কথা ছিল, তাই গিয়েছিলাম।’

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) খুলনা জেলা সাধারণ সম্পাদক কুদরত-এ-খুদা বলেন, পুলিশের দায়িত্ব পালনে ঘাটতির কারণেই আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। খুলনা এক সময় শান্ত শহর ছিল। এখন একের পর এক হত্যা ও গুলির ঘটছে, তা কল্পনাও করা যাচ্ছে না। একটা খবর শুনে নিঃশ্বাস ফেলা যায় না, আরেকটা ঘটনা ঘটে চলেছে। যা ভাবাই কঠিন।

মহানগরীর খানজাহান আলী রোডের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক আব্দুল হাকিম বলেন, ২১ সেপ্টেম্বর একটি নম্বর থেকে ফোন আসে। অপরপ্রান্তের ব্যক্তিটি বলেন, আমি গ্রেনেড বাবুর লোক। এই মাসে এক লাখ টাকা দিবি। না হলে ব্যবসা বন্ধ রাখবি। বিষয়টি নিয়ে আমি আর থানায় যাইনি। 

১৫ আগস্ট রাত ৯টার দিকে আক্তার ঢালীর ছেলে জয় ঢালীকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়। পুলিশ জানায়, গ্রেনেড বাবু গ্রুপের লোকজন তাকে হত্যা করেছে। এ ঘটনায় নিহতের মা নাসিমা বেগম মামলা করেন। ওই মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। মামলা না তোলায় ছেলে হত্যার ৫০ দিন পর জয় ঢালীর বাবা আক্তার ঢালীকে হত্যা করা হয়।

রূপসা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাবেদ হোসেন বলেন, সামান্য ঘটনায়ই খুনাখুনি বাড়ছে। রূপসা উপজেলা সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য। পথ চলতে অনিরাপদ বোধ করছি। পুলিশ সেভাবে কাজ করছে না। ফলে মানুষের মধ্যে আস্থা নষ্ট হচ্ছে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আবু সাঈদ বলেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর পড়ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দূরদর্শী ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।

খুলনার আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আইজিপি আলী হোসেন ফকির বলেন, কিছু অপরাধী খুন হচ্ছে, আবার কিছু অপরাধী খুন করছে। এতে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। আইন প্রয়োগ করতে গেলে পুলিশকে কখনো বল প্রয়োগের দাবি শুনতে হয়, আবার বল প্রয়োগ করলে পুলিশকে ফ্যাসিস্ট বলা হয়। বল প্রয়োগ না করলে পুলিশকে দুর্বল বলা হয়। তিনি বলেন, “সুতরাং এগুলো আমরা দেখতে চাই না। সবাই মিলে একটি কার্যকরী পুলিশ বাহিনীর মাধ্যমে সমাজের শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য, দুর্নীতিমুক্ত করার জন্য কাজ করতে হবে।”

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে আরেক প্রশ্নের জবাবে আইজিপি বলেন, “২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সমাজের অবস্থা কেমন ছিল, তা বিবেচনায় নিতে হবে। তখন পুলিশ ছিল না এবং বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলেছে।”

আইজিপি বলেন, “এখন পুলিশ মনোবল নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সব জায়গায় পুলিশের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সব সমস্যার তো রাতারাতি পরিবর্তন হবে না। অবস্থার তো এখন উন্নতি হয়েছে।”


সর্বশেষ