কুষ্টিয়ায় এমপি হানিফের মৃত্যুদণ্ড আরও ৩ নেতার আমৃত্যু কারাদণ্ড
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই মামলায় কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান, জেলা সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী এবং কুষ্টিয়া শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতাকে আমৃত্যু কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এ ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
রায়ে ট্রাইব্যুনাল দণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামির স্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেন। বাজেয়াপ্ত এই সম্পত্তি জুলাই ফাউন্ডেশন বা অন্য কোনো উপযুক্ত মাধ্যমের সাহায্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারের মাঝে ক্ষতিপূরণ হিসেবে বণ্টন করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মামলার চার আসামির সবাই বর্তমানে পলাতক থাকায় তাদের অনুপস্থিতিতেই বিচারকার্য সম্পন্ন হয়। আইনগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী আসামিদের পক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রীয় খরচে স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী নিয়োগ করা হয়েছিল।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আসামিদের বিরুদ্ধে প্রধানত তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছিল। উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সমর্থন, আন্দোলন দমনে ছাত্রলীগই যথেষ্ট—শীর্ষ নেতৃত্বের এমন অবস্থানের নীতিগত বৈঠকে উপস্থিত থেকে সমর্থন জ্ঞাপন। হত্যার ষড়যন্ত্র ও সিদ্ধান্ত, জুলাইয়ের ২৯ তারিখে কুষ্টিয়ায় অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে সশস্ত্র হামলা ও হত্যার সিদ্ধান্ত-ষড়যন্ত্রে অংশ নেওয়া। হত্যার উসকানি ও নির্দেশ, কুষ্টিয়ায় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালিয়ে ছয়জনকে হত্যা ও বহু মানুষকে আহত করার ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ নির্দেশনা দেওয়া।
মামলার নথিসূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে এক প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার সময় জেলা সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী বলেন, আমাদের নেতা হানিফের নির্দেশ রয়েছে আন্দোলন যেকোনোভাবে দমন করার। যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় প্রসিকিউশন এই বক্তব্যের সচিত্র ও অডিও প্রমাণ তুলে ধরে। প্রসিকিউশনের যুক্তি ছিল— শীর্ষ নেতাদের এসব উসকানিমূলক বক্তব্য, প্রকাশ্য নির্দেশনা ও সাংগঠনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রত্যক্ষ প্রভাবেই কুষ্টিয়ায় আন্দোলনকারীদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা ও ছয়জনের মৃত্যু ঘটে।
জুলাই-আগস্টের ঘটনার পর হানিফসহ চারজনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়। গত বছরের ৬ অক্টোবর প্রসিকিউশন আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করে এবং ২ নভেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে বিচার শুরু হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১৯ জন সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্য প্রদান করেন। গত ১০ জুন প্রথম দফায় যুক্তিতর্ক শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। পরবর্তীতে প্রসিকিউশন অতিরিক্ত তথ্য-প্রমাণ দাখিল করলে পুনরায় শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। গত ৫ অক্টোবর প্রসিকিউশনের পক্ষে প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম এবং ৭ অক্টোবর রাষ্ট্রনিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী আমির হোসেন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করলে আদালত রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন।
মতামত দিন