*বাংলা হরফে ধরা যাচ্ছে না চাটগাঁইয়ার স্বর, সমাধানে ‘ইউরো লাতিন’।*
বাংলা বর্ণমালায় চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা চাটগাঁইয়ার সব ধ্বনি ও উচ্চারণ যথাযথভাবে প্রকাশ করা কঠিন। বিশেষ করে শব্দের সুর বা টোনের সামান্য পরিবর্তনেও যেখানে অর্থ বদলে যায়, সেখানে প্রচলিত বাংলা হরফে সেই পার্থক্য তুলে ধরতে তৈরি হয় নানা সীমাবদ্ধতা। এ সমস্যা কাটাতে লাতিন বর্ণমালার সঙ্গে বিশেষ স্বরচিহ্ন যুক্ত করে ‘ইউরো লাতিন’ নামে একটি নতুন লিখন পদ্ধতি চালু করেছেন চাটগাঁইয়া ভাষার কয়েকজন তরুণ উদ্যোক্তা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ পদ্ধতিতে লেখা একটি পোস্ট প্রথম দেখায় বিদেশি কোনো ভাষার লেখা মনে হতে পারে। অথচ সেটি চট্টগ্রামের মানুষের পরিচিত কথ্য ভাষা। সম্প্রতি চাটগাঁইয়া ভাষায় সংবাদ প্রকাশ করা কয়েকটি ফেসবুক পেজের মাধ্যমে এমন লিখন পদ্ধতি পরিচিতি পাচ্ছে।
চাটগাঁইয়ায় লেখা এসব পোস্টের একটি হলো—‘E bosórur HSC forikkér rezál ayiđđe 25-29 oktubor diŧ fare buli hōiyí bangladeş anŧoşíkké būrd komitir şobáfoŧi’। প্রমিত বাংলায় এর অর্থ, চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষার ফল ২৫ থেকে ২৯ অক্টোবরের মধ্যে প্রকাশিত হতে পারে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি।
চাটগাঁইয়ার নিজস্ব উচ্চারণ ও ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতেই এই লিখন পদ্ধতির উদ্ভাবন। তবে এটি কেবল নতুন করে লেখার কৌশল নয়; বরং মুখের ভাষাকে লিখিত মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা এবং হারিয়ে যেতে বসা শব্দ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের একটি উদ্যোগ।
*স্বতন্ত্র ভাষা, নাকি বাংলার উপভাষা?*
চাটগাঁইয়ার পরিচয় নিয়ে ভাষাবিদদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। এটি স্বতন্ত্র ভাষা, নাকি বাংলার একটি আঞ্চলিক উপভাষা—এ প্রশ্নের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।
বাংলা ও চাটগাঁইয়া উভয়ের শিকড় পূর্বাঞ্চলীয় ইন্দো-আর্য ভাষাগোষ্ঠীতে। তবে দীর্ঘ সময়ের বিবর্তনে চাটগাঁইয়া নিজস্ব ধ্বনি, ব্যাকরণ ও শব্দভান্ডার গড়ে তুলেছে। এর উচ্চারণ ও বাক্যগঠনের পার্থক্য এতটাই স্পষ্ট যে অনেক প্রমিত বাংলাভাষীর পক্ষেও চাটগাঁইয়া সহজে বোঝা সম্ভব হয় না।
ভাষাবিদ কলিন মাসিকা তাঁর ‘দ্য ইন্দো-আরিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজেস’ গ্রন্থে চাটগাঁইয়ার স্বতন্ত্র ভাষাগত বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন। ঐতিহাসিক ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের গবেষণাতেও চাটগাঁইয়াকে পূর্বাঞ্চলীয় ভাষার ঐতিহাসিক ধারার মধ্যে বিবেচনা করা হয়েছে।
তবে ভাষাটির স্বতন্ত্র মর্যাদা নির্ধারণে আরও গবেষণার প্রয়োজন বলে মনে করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সভাপতি তাসলিমা বেগম।
তাঁর মতে, চাটগাঁইয়ার সঙ্গে আরাকানি ভাষার যেমন কিছু মিল রয়েছে, তেমনি অন্য ভাষার শব্দের সঙ্গেও এর সাদৃশ্য পাওয়া যায়। তাই এটিকে স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে চূড়ান্তভাবে শ্রেণিবদ্ধ করার আগে বিস্তারিত ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণা জরুরি।
*কেন প্রয়োজন হলো আলাদা লিখন পদ্ধতি?*
চাটগাঁইয়ার লিখিত রূপ তৈরির উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ‘চিটাগোনিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ একাডেমি’। ২০২১ সালের জুনে অনলাইনে ভাষাটি নিয়ে আলোচনার সূত্র ধরে চার-পাঁচজন তরুণের উদ্যোগে একটি ফেসবুক গ্রুপ হিসেবে যাত্রা শুরু করে সংগঠনটি।
প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল চাটগাঁইয়ার শব্দভান্ডার সংগ্রহ, বিলুপ্তির পথে থাকা শব্দ সংরক্ষণ এবং ভাষাটির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা। পাশাপাশি চাটগাঁইয়াকে অশুদ্ধ বা বিকৃত বাংলা হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বের করে আনার চেষ্টাও ছিল তাঁদের।
একাডেমির সহপ্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ রায়হানের ভাষ্য, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে চাটগাঁইয়াকে অনেক সময় নিম্নমানের ভাষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এমনকি অনেক অভিভাবকও সন্তানদের এ ভাষায় কথা বলতে উৎসাহিত করেন না। ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ভাষাটির ব্যবহার কমছে এবং অনেক স্থানীয় শব্দ হারিয়ে যাচ্ছে।
এই বাস্তবতা থেকেই ভাষাটির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণে লিখিত রূপ তৈরির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন তাঁরা।
বর্তমানে একাডেমির ফেসবুক গ্রুপে সদস্য প্রায় ২৯ হাজার এবং পেজে অনুসারী প্রায় ৫৮ হাজার। অনলাইনে কার্যক্রমের পাশাপাশি একটি ওয়েবসাইট তৈরির কাজও চলছে।
*বাংলা বর্ণমালা বাদ দিয়ে লাতিন কেন?*
ইউরো লাতিন তৈরির অন্যতম কারণ চাটগাঁইয়া ভাষার টোন বা স্বরের ওঠানামা। ভাষাটিতে উচ্চ, নিচু ও সাধারণ—এমন তিন ধরনের টোনের ব্যবহার রয়েছে। কোনো শব্দে স্বরের অবস্থান বদলে গেলে তার অর্থও পরিবর্তিত হতে পারে।
বাংলা বর্ণমালায় এই টোনের পার্থক্য যথাযথভাবে প্রকাশের সহজ ব্যবস্থা নেই। এ সীমাবদ্ধতা কাটাতে ইউরো লাতিনে স্বরবর্ণের ওপর বিশেষ চিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে, চাটগাঁইয়ায় ‘ভিক্ষুক’ ও ‘পুকুর’ বোঝাতে ব্যবহৃত দুটি শব্দ লেখা হয় ‘Fóir’ ও ‘Foír’। শব্দ দুটির স্বরচিহ্নের অবস্থান আলাদা হওয়ায় অর্থও ভিন্ন। একইভাবে আদা, অর্ধেক, তামাকপাতা ও অন্ধ বোঝাতে ব্যবহৃত শব্দগুলো লেখা হয় ‘Ađa’, ‘Ađá’, ‘Áđa’ ও ‘Añđá’।
এখানে স্বরবর্ণের ওপর অ্যাকিউট অ্যাকসেন্টসহ বিভিন্ন বিশেষ চিহ্ন ব্যবহার করে উচ্চারণের পার্থক্য বোঝানো হয়।
একাডেমির সহপ্রতিষ্ঠাতা রায়হান জানান, চাটগাঁইয়ায় বাংলার মতো মহাপ্রাণ ব্যঞ্জনধ্বনির ব্যবহার নেই। তাই লিখন পদ্ধতি তৈরির সময় এ ধরনের ধ্বনির জন্য আলাদা বর্ণ রাখার প্রয়োজন হয়নি।
তবে লাতিন বর্ণমালা বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি শুরুতেই চূড়ান্ত ছিল না। বাংলা হরফে ভাষাটির উচ্চারণ যথাযথভাবে প্রকাশ করতে না পেরে তাঁরা ফার্সি-আরবি হরফ এবং সম্পূর্ণ নতুন বর্ণমালা তৈরির বিষয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। পরে ব্যবহারিক সীমাবদ্ধতার কারণে সেসব পরিকল্পনা বাদ দেওয়া হয়।
একপর্যায়ে রোহিঙ্গা ভাষা লেখার জন্য তৈরি লাতিনভিত্তিক ‘রোহিঙ্গালিশ’ পদ্ধতি তাঁদের আগ্রহী করে তোলে। তবে সেটি সরাসরি গ্রহণ না করে চাটগাঁইয়ার ধ্বনি ও উচ্চারণের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন এনে তৈরি করা হয় ইউরো লাতিন।
*সংবাদ প্রকাশেও চাটগাঁইয়ার ব্যবহার*
ভাষাটির লিখিত রূপকে মানুষের কাছে পরিচিত করার পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমেও এর ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
‘দেয়াং’, ‘চেরাগী’ ও ‘দ্য চিটাগোনিস্ট’ নামের কয়েকটি ফেসবুক পেজ ইউরো লাতিনে চট্টগ্রামকেন্দ্রিক সংবাদ প্রকাশ করছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য স্থানীয় মানুষের কাছে তাঁদের নিজস্ব ভাষায় সংবাদ পৌঁছে দেওয়া।
দেয়াংয়ের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ মুবিনুল হক চৌধুরী বলেন, তাঁদের উদ্দেশ্য শুধু নতুন একটি লিখন পদ্ধতি তৈরি করা নয়; বরং চাটগাঁইয়ার প্রকৃত উচ্চারণ ও বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে সেটিকে সহজে ব্যবহারযোগ্য করে তোলা।
‘দেয়াং’ নামটি নেওয়া হয়েছে আনোয়ারা ও কর্ণফুলী এলাকার একটি পাহাড়ের নাম থেকে। শিল্পকারখানা ও আবাসন প্রকল্পের বিস্তারে পাহাড়টির অস্তিত্ব ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। স্থানীয় ইতিহাসের স্মৃতি ধরে রাখতেই পেজটির এমন নামকরণ।
মুবিনুলের মতে, চট্টগ্রাম অঞ্চলে চাটগাঁইয়ার অন্তত ছয়টি আঞ্চলিক উচ্চারণরীতি রয়েছে। বর্তমানে তাঁদের পেজে আনোয়ারা-বাঁশখালীর উচ্চারণরীতি অনুসরণ করে সংবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে অন্য অঞ্চলের উচ্চারণরীতিও যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে কোনো একটি উচ্চারণকে পুরো চাটগাঁইয়ার মানক রূপ হিসেবে প্রতিষ্ঠার পক্ষে নন তাঁরা। তাঁদের মতে, আঞ্চলিক বৈচিত্র্যই ভাষাটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
*জনপ্রিয়তার পাশাপাশি সমালোচনাও*
নিজের মুখের ভাষায় সংবাদ পড়ার সুযোগ চাটগাঁইয়াভাষী অনেক তরুণের কাছে নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ উদ্যোগ নিয়ে আগ্রহও বাড়ছে। তবে ইউরো লাতিনের ব্যবহার নিয়ে এখনো নানা প্রশ্ন ও সমালোচনা রয়েছে।
রায়হানের অভিযোগ, চাটগাঁইয়া ভাষায় লেখালেখির কারণে তাঁদের কখনো কখনো ভারতীয় দালাল, 'র'-এর এজেন্ট কিংবা বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে আখ্যা দেওয়া হয়। এমন প্রতিক্রিয়াকে ভাষাগত বৈচিত্র্যের প্রতি অসহিষ্ণুতা হিসেবে দেখছেন তাঁরা।
তাঁর মতে, ভাষার অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বাঙালির ঐতিহাসিক সংগ্রামের পরও অন্য একটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষায় লেখার উদ্যোগকে হেনস্তার শিকার হতে হওয়া দুঃখজনক।
*শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করবে মানুষ?*
ইউরো লাতিনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা। বিশেষ স্বরচিহ্ন ও টোনের ব্যবহার প্রমিত বাংলা হরফে অভ্যস্ত পাঠকদের কাছে শুরুতে কঠিন মনে হতে পারে। পাশাপাশি চাটগাঁইয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের উচ্চারণগত পার্থক্যও লিখিত রূপের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নিতে হবে।
এখন পর্যন্ত সীমিতসংখ্যক অনলাইন পেজে এই পদ্ধতির ব্যবহার শুরু হয়েছে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠী কতটা সহজে এটি শিখবে বা দৈনন্দিন লেখালেখিতে গ্রহণ করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে উদ্যোগটি চাটগাঁইয়ার লিখিত রূপ, শব্দভান্ডার ও সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ভাষাটির স্বতন্ত্র মর্যাদা নিয়ে বিতর্ক চললেও এর নিজস্ব ধ্বনি, উচ্চারণ ও শব্দের বৈচিত্র্য যে সংরক্ষণের দাবি রাখে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত ইউরো লাতিন প্রতিষ্ঠা পাবে কি না, তা নির্ভর করবে এর ব্যবহারিক সুবিধা এবং চাটগাঁইয়াভাষী মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ওপর। কারণ, কোনো ভাষার লিখিত রূপের স্থায়িত্ব কেবল উদ্ভাবকদের প্রচেষ্টায় নয়, সেই ভাষায় কথা বলা মানুষের গ্রহণযোগ্যতার মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হয়।
তথ্যসূত্র: Business Standard.
মতামত দিন