এই ঘটনাটি শুধু একজন কর কর্মকর্তার চাকরি হারানোর খবর নয়। এর ভেতরে আছে কর প্রশাসনের নথি, রাষ্ট্রের রাজস্ব এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের একটি গুরুতর প্রশ্ন। সাম্প্রতিক প্রজ্ঞাপন ও প্রতিবেদন মিলিয়ে ফেসবুকের জন্য এভাবে লেখা যেতে পারে।
১৪৬ কোটি টাকার কর হয়ে গেল শূন্য, আরেক মামলায় ৭৩ কোটি নেমে এলো ১,২৯৯ টাকায়!
একজন কর কর্মকর্তা বদলি হয়ে এলেন একটি সার্কেলে। তার সামনে ছিল দুটি পুরোনো আয়কর মামলা। আগের কর্মকর্তা দুটি মামলায় মোট ১৪৬ কোটি ৫৭ লাখ ৪৬ হাজার ৫৫৩ টাকা কর নির্ধারণ করেছিলেন।
এরপর বদলে গেল হিসাব।
২০২০-২১ করবর্ষে নির্ধারিত ৭২ কোটি ৯৬ লাখ ৬ হাজার ৮৬২ টাকার কর নেমে এলো শূন্য টাকায়।
আর ২০২১-২২ করবর্ষে নির্ধারিত ৭৩ কোটি ৬১ লাখ ৩০ হাজার ৯৯০ টাকা নেমে এলো মাত্র ১ হাজার ২৯৯ টাকায়।
অর্থাৎ দুই মামলায় রাষ্ট্রের রাজস্ব দাবির প্রায় ১৪৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা কার্যত উধাও হয়ে গেল। বিষয়টি নিয়ে তদন্তের পর এবার উপকর-কমিশনার লিংকন রায়কে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
ঘটনাটি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে কারণ অভিযোগটি শুধু ভুল হিসাবের নয়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, আগের কর্মকর্তার নিষ্পত্তি করা মামলায় নতুন আদেশপত্র ও কর নির্ধারণ আদেশ তৈরি করা হয়েছিল। তদন্তকারী কর্মকর্তার প্রতিবেদনে অভিযোগের প্রমাণও পাওয়া যায়। পরে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শ এবং রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর বরখাস্তের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়।
মামলাগুলোর করদাতা প্রতিষ্ঠান ধামসুর ইকোনমিক জোন লিমিটেড। এটি বেস্ট হোল্ডিংস লিমিটেডের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং ময়মনসিংহের ভালুকায় অবস্থিত অর্থনৈতিক অঞ্চলটির ৫১ শতাংশ শেয়ারের মালিক বেস্ট হোল্ডিংস।
কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়।
একই সময়ে সামনে এসেছে আরেক কর কর্মকর্তার ঘটনা। সহকারী কর কমিশনার জান্নাতুল ফেরদৌস মিতুর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, ৩৮ লাখ টাকার বিনিময়ে একজন করদাতার আয়কর নথির পুরোনো রেকর্ড পরিবর্তন, নতুন রেকর্ড সংযোজন এবং গুরুত্বপূর্ণ নথি করদাতার প্রতিনিধির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। পরে বিভাগীয় তদন্তে তার বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণ’-এর অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলেও ‘দুর্নীতিপরায়ণ’-এর অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি। ফলে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে তাকে স্বপদে বহাল করা হয়েছে এবং আগামী আট বছরের জন্য তার পদোন্নতি স্থগিত করা হয়েছে। তথ্যসূত্র যুগান্তর।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, রাষ্ট্রের রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব যাদের হাতে, তাদের একজনের সিদ্ধান্তে কীভাবে ১৪৬ কোটি টাকার কর প্রায় শূন্যে নেমে আসে?
আর যদি কোনো কর্মকর্তা ঘুষ বা অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে করের হিসাব বদলে দিতে পারেন, তাহলে ক্ষতিটা শুধু সরকারি কোষাগারের নয়। এর প্রভাব পড়ে সাধারণ করদাতার ওপরও। সৎভাবে কর দেওয়া মানুষ তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করেন, কেউ যদি প্রভাব বা অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে নিজের করের বোঝা কমিয়ে নিতে পারে, তাহলে নিয়ম মেনে চলার মূল্য কোথায়?
আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। এই ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে আদালতের চূড়ান্ত রায়ের আগেই অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়। তবে সরকারি নথি ও বিভাগীয় তদন্তে যে অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে, তা অবশ্যই কঠোরভাবে খতিয়ে দেখা দরকার।
কারণ ১৪৬ কোটি টাকা কোনো ছোট অঙ্ক নয়।
এটি হাজার হাজার মানুষের করের টাকা।
এটি রাষ্ট্রের হাসপাতাল, শিক্ষা, অবকাঠামো ও জনসেবার অর্থ।
আর সেই অর্থ রক্ষার দায়িত্বে থাকা কোনো কর্মকর্তা যদি ক্ষমতার অপব্যবহার করেন, তাহলে শাস্তি শুধু চাকরি হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি রাষ্ট্রের ক্ষতিও প্রকৃত অর্থে উদ্ধার করা হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
রাষ্ট্রের রাজস্বের পাহারাদার যদি পাহারার বদলে দরজা খুলে দেন, তাহলে সেই দরজা দিয়ে শুধু টাকা নয়, মানুষের আস্থাও বেরিয়ে যায়।
মতামত দিন